বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সমগ্র জাতির কাছে প্রধান নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বের সব রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন দোষে-গুণে মানুষ এই ঐতিহাসিক সত্যটি অস্বীকার করার দরকার পড়ে না। মহাভারত যে সারা বিশ্ব জুড়ে নন্দিত তার প্রধান কারণ, মহাভারতের প্রধান কথাটিই হলো বিশ্বে কোন মানুষ নেই যে সম্পূর্ণ ভালো, কোনো মানুষ নেই সম্পূর্ণ খারাপ। ফলে যুধিষ্ঠির, কর্ণ, ভীষ্ম বা দেবব্রতর মতন ত্যাগী পুরুষরা পর্যন্ত কেউ সম্পূর্ণ দোষ ত্রুটির ঊর্ধে নয়। ঠিক একই লক্ষণ দেখা যায় বিভিন্ন মহাকাব্যে। ইলিয়ড ওডিসি বা ইনিড-এ। বিশ্বের একজন নাট্যকার ব্রেশট ঠিক এই কারণেই যখন রাজনৈতিক নাটক লিখতে আরম্ভ করেছিলেন নিজের নাট্যধারার নাম দিয়েছিলেন মহাকাব্যিক। রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি মানুষকে কীভাবে উপস্থাপন করবেন তার পদ্ধতি বেছে নিলেন মহাকাব্য থেকে। মহাকাব্যের চরিত্রের মতন তাঁর নাটকের চরিত্ররা কেউই তাই পূতপবিত্র নন। ব্রেশটের গ্যালিলিও নাটকের বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর চরিত্র তার বিরাট এক উদাহরণ। মহান বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর নানা ত্রুটি ধরা পড়ে সেই নাটকে। নাট্যকার ব্রেশট মনে করতেন, মানুষকে বিচার করতে হবে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে। ব্যক্তি মানুষ সমাজব্যবস্থার বাইরে নয়, নানান সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাই মানুষের ব্যাপ্তী।
স্বাধীনতা আর মানুষের মুক্তির জন্য লড়ছে যে মানুষ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভিতরে প্রবেশ করেছে যে মানুষ আর ক্ষমতার বাইরে থাকা মানুষ কখনোই একরকম আচরণ করতে পারে না। ব্যক্তিমালিকানাধীন বর্তমান সমাজব্যবস্থার কারণেই, ক্ষমতাবান কিংবা ক্ষমতাহীন মানুষ কারো পক্ষেই সর্বাঙ্গীন ভালো মানুষ হওয়া সম্ভব নয়। ক্ষমতাবানদের পক্ষে তো নয়ই। সমাজের প্রতিটি ত্যাগী বা ইতিবাচক মানুষ নানারকম সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমাজের কিছু কিছু অগ্রগতি ঘটায়, ভিন্ন দিক দ্বান্দ্বিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ করতে বাধ্য হয়। ফরাসী বিপ্লবের পর নেপোলিয়ন তাই করেছিলেন। তিনি একই সঙ্গে ফরাসী বিপ্লবের মতাদর্শ বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, নিজের বীরত্ব দিয়ে বিপ্ললকে রক্ষা করেছিলেন। ঠিক আবার ঘটনার বাস্তবতায় বিপ্লবের বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী শাসক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বহু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া সত্ত্বেও, অবশ্যই নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে সারাবিশ্বেব জনগণের উপর ভয়াবহ দমন পীড়ন চালিয়েছিলেন। তিনি তারপর ক্ষমতা হারিয়ে নির্বাসনে চলে যেতে বাধ্য হলেন।
পুনরায় কৃষকদের সাহায্যে ফরাসী দেশের ক্ষমতা ফিরে পেলেন একশো দিনের জন্য। দম্ভ তাতে বেড়ে গেল। মানুষটা আসলে খুব কম যুদ্ধেই হেরেছিলেন। সারাবিশ্বের সামরিক বাহিনীতে আজও নেপোলিয়নের যুদ্ধ কৌশল পড়ানো হয়। তিনি শক্তিশালী নৌবাহিনী না থাকাতেই ব্রিটিশ শক্তির কাছে পরাজিত হন। দ্বিতীয়বার হেরে ছিলেন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ওয়াটার লুর যুদ্ধে। আসলে তার জনসমর্থনই কমে গিয়েছিল, নিজদেশে এবং বিদেশে। মনে করবার কারণ নেই, তাঁর শত্রুরা সবাই মহৎ মানুষ ছিলেন। তার প্রতিপক্ষ ছিলেন যেমন জনগণের একটা অংশ, একইভাবে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিল তাঁর চেয়েও নির্দয় মানুষরা। তিনি তাঁর শাসনে বহু ইতিবাচক কাজ করেছিলেন। প্রধান দুটো কাজ হলো, তিনি তাঁর দখলকৃত সব জায়গায় সামন্তদের খামখেয়ালীপূর্ণ বিচার কার্যের পরিবর্তে আদালতের বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছিলেন। চার্চের ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলেন, পোপের ক্ষমতাকে এক টুকরো কাগজে পরিণত করেছিলেন।
সকলের স্মরণে রাখা দরকার এই চার্চ আটশো বছর সমস্ত জ্ঞানচর্চা বন্ধ করে দিয়ে ইউরোপকে অন্ধকার যুগে বন্দী করে রেখেছিল। ইউরোপে তখন আসলে রাষ্ট্র বলে কিছুই ছিল না, চার্চই ছিল রাষ্ট্র। ক্রুসেডের পর নবজাগৃতি বা ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিতর দিয়ে চার্চের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আরম্ভ হয়েছিল। চার্চের বিরুদ্ধে সেই সংগ্রাম আরম্ভ করেছিল একদল পাদ্রীরাই এবং রেনেসাঁর প্রথম দুজন পথিকৃত ছিলেন পাদ্রী। পরে পাওয়া গেল একদল বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, নানাধরনের সৃষ্টিশীল কর্মের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের। চার্চের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে এরা বিদ্রোহ করেছিল ধর্মকে বাতিল করে দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্র আর চার্চের ভূমিকা আলাদা এই কথা বলার মধ্য দিয়ে চার্চের কিরুদ্ধে বিদ্রোহের আরম্ভ। গ্যালিলিও ছাড়া নিউটন সহ সব বিজ্ঞানীরাই ছিলেন ধর্মে বিশ্বাসী। কিন্তু সবাই একই সঙ্গে বিশ্বাস করতেন বাকস্বাধীনতা কিংবা চিন্তার স্বাধীনতায়। মনে করতেন ঈশ্বর আছেন, তবে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বাইবেলের ভাষ্যের চেয়েও সত্য এবং অধিক গ্রহণযোগ্য। বাইবেলের বানী ঈশ্বরের সমান হতে পারে না।
ফরসী বিপ্লবের বহু আগেই চার্চ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, ফরাসী বিপ্লবে চার্চকে প্রায় নাই করে দেওয়া হয়। নেপোলিয়ন কী করেছিলেন? শক্তিশালী রাজতান্ত্রিক দেশগুলো যখন একসঙ্গে ফরাসী দেশে আক্রমণ চালিয়ে ফরাসী বিপ্লবকে ধ্বংস করতে চায়, নেপোলিয়নের আক্রমণের সামনে সেই সব বড় বড় দেশ পিছু হটলো, বরং নেপোলিয়ন বহু দেশ দখল করে নিয়েছিলেন। বহু দেশকে তার সঙ্গে অধীনতামূলক চুক্তি করতে বাধ্য করেছিলেন। তিনি সেই সব দেশে ফরাসী বিপ্লবের বানী বহন করে নিয়ে গেলেন। ক্ষমতা আর বিজয়ের দম্ভে নিজেই হয়ে উঠলেন স্বৈরশাসক। সংসদের সব অধিকার খর্ব করে নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করলেন। নিজের ভাই বোনদের দখল করা বিভিন্ন রাজ্যের রাজা বা শাসক বানিয়ে দিলেন। ক্ষমতা তাকে অন্ধ বানিয়ে ফেলেছিল। নিজের দত্তক পুত্রকে পরবর্তী সম্রাট বানাতে চাইলেন।
দ্বিতীয়বার ক্ষমতা লাভ করে নেপোলিয়ন একশো দিনের শাসনের পর যখন গণ অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে প্রস্তুত হলেন, তখন চাইলে হয়তো তিনি রক্তপাত ঘটিয়ে আরো কিছুদিন ক্ষমতায় থাকতে পারতেন। তিনি সেই রক্তপাতের মধ্যে না গিয়ে ক্ষমতা ছাড়লেন। নিজের দেশের মানুষের রক্তে হাত রাঙাতে চাইলেন না। তিনি জানতেন, সামরিক বাহিনী এই ঘটনায় শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে থাকবে না। ক্ষমতার অন্দর মহলেও নানান রকম বিভেদের চক্র ছিল। ফরাসী দেশের বহু মানুষ যেমন শেষের দিকে এই লোকটাকে চরম ঘৃণা করতেন, কিছু সংখ্যক লোক আবার তাঁকে খুব ভালোবাসতেন। দ্বিতীয়বার ক্ষমতা ছাড়ার পর তাঁর ভাগ্যে কী ঘটবে, তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না। এই দুশ্চিন্তা থেকে তিনি ফরাসী দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু ইংরেজের কাছে আশ্রয় চাইলেন। তিনি তাদের কাছে আশ্রয় পেলেন। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত না করে তাঁকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হলো। রাজকীয় জীবন না হলেও তাঁকে মোটামুটি ভালোভাবে থাকতে দেওয়া হয়েছিল একজন প্রশাসকের অধীনে। সেইখান থেকে তাঁর পালানোর আর কোনো সুযোগ ছিল না। শত্রু দেশ ইংরেজদের আশ্রয় নেয়ার পর ফরাসী জনগণের ঘৃণা আরো প্রবল হয়েছিল নেপোলিয়নের উপর।
নির্বাসিত জীবনে একাকী অবস্থায় তাঁর পড়াশোনা করা এবং লেখালেখির সুযোগ ছিল। তিনি নিজের স্মৃতিকথা লিখতে আরম্ভ করলেন। মানুষটার মেধা আর সাহস ছিল, একথা নিঃসন্দেহে সত্য। তিনি স্মৃতিকথায় নিজের সম্পর্কে ব্যক্তিপূজা না করে নিজের মূল্যায়ন করলেন। নিজের কৃতকর্মের জন্য নানাভাবে অনুশোচনা প্রকাশ করলেন। নিজের দত্তক পুত্রের উদ্দেশ্যে লিখলেন, যদি কখনো সম্রাট হও বা ক্ষমতা লাভ করো, ক্ষমতা প্রদর্শন না করে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে চেষ্টা করো। ব্রিটিশ সরকার তাঁর এই শত্রুর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে চায়নি, কিন্তু দ্বীপের প্রশাসক নানান রকমভাবে নির্যাতন করেছেন নেপোলিয়নকে। তিনি দরকার মতন চিকিৎসা পাননি। তিনি নিজের স্মৃতিকথা লেখা শেষ করতে পেরেছিলেন। তারপর রোগে ভুগে তিনি একদিন সেই দ্বীপেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। চল্লিশ বছর পর তাঁর স্মৃতিকথা প্রকাশ পেল। ফরাসী দেশের মানুষরা যে নেপোলিয়নকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতেন, যখন তাঁর স্মৃতিকথা পাঠ করে তাঁর সমস্ত অনুশোচনার কথা জানতে পারলেন, তখন ফরাসী জনগণ তাঁর প্রাপ্য মর্যাদাটুকু তাঁকে দিতে সামান্যরকম দ্বিধা করেননি। প্যারিস শহরে তাঁর বিরাট ভাস্কর্য নির্মিত হলো।
সত্যি বলতে ইতিহাসে ব্যক্তিপূজার স্থান নেই। ব্যক্তির চরিত্রে একইসঙ্গে লোভ-লালসা, মায়া-মমতা, বিনয়-ত্যাগতিতিক্ষা আবার চরম নিষ্ঠুরতার সন্ধান মেলে। দরকার তার সবকিছুর সঠিক মূল্যায়ন। দুই-আড়াই হাজার বছর আগে যা মহাভারতে বলা হয়েছিল, মানুষ মানুষই, মানুষ সম্পূর্ণ পূজনীয় নয়। ব্যক্তিপূজার স্থান নেই আসলে মহাভারতে। কারণ মহাভারতের এক জায়গায় ভীষ্ম যেমন মহাত্যাগী, ভিন্ন জায়গায় দুঃশাসনের সঙ্গে আপসকামী। নিজের ভ্রাতা বিচিত্রবীর্যের জন্য নারী অপহরণ করে এই মহাপুরুষ। মহাভারেতের কর্ণ সর্বত্র বীর, নির্লোভ কিন্তু দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণে অংশগ্রহণ করে। পরম পূজনীয় কাউকে পাওয়া যায় না মহাভারতে। না, ইলিয়ড ওডিসেতে। না ইতিহাসের মহাশক্তিধর ব্যক্তিদের মধ্যে। গান্ধী, জিন্নাহ, নেহরু সবাই প্রশ্নবিদ্ধ। সকলেই বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা প্রদর্শন করেন, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন, নিজের স্বার্থ বা চাওয়া পাওয়াকে বড় করে দেখেন, ভীষণ রকম আত্মকেন্দ্রিক এবং আত্মপূজক হয়ে ওঠেন। তার মধ্যেই আবার নানান মহৎকর্ম, সাহসী কর্মের উদাহরণ রেখে যান।
নাট্যকার সেলিম আল দীনের “সর্প বিষয়ক গল্প” নামে একটি নাটক আছে। তিনি ১৯৭২ সালে এই নাটকটি লিখেছিলেন। এখন আর কেউ হয়তো এই নাটকটির সন্ধান রাখেন না। আজকের বাংলাদেশের এই ১৫ আগস্টের দিনে এই নাটকটা বারবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নাটকটা যাঁরা পড়েননি, নাটকের আখ্যান এবং বহু সংলাপ তাঁদেরকে বিস্মিত করবে। বহু জনেরই মনে হবে ১৯৭২ সালে বসেই যেন নাট্যকার সেলিম আল দীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৫ সালে আকস্মিক নিহত হবার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। নাটকের গল্পে রয়েছে একজন জাদরেল ক্ষমতাবান নেতার হঠাৎ সামরিক বাহিনীর দ্বারা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো এবং নিহত হওয়া। নাট্যকারের সংলাপ বলছে, যে-নেতার পিছনে বহু মানুষ হাঁটতো তার জানাজায় উপস্থিত হয়েছিল মাত্র ৬ জন লোক। নাট্যকার বলছেন, নেতাকে হত্যা করা হয় ঘুমন্ত অবস্থায়। যদিও শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছিল ঘুম থেকে উঠিয়ে, গভীর রাতে। ঘুমের মধ্যে হত্যার সঙ্গে এ ঘটনার ততটা পার্থক্য নেই। বরং বাস্তবের ঘটনাটা ছিল আরো নৃশংস এবং নির্দয়।
নাটকটি যদি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার আগে রচিত না হতো, তাহলে একে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার রূপক নাটক বা ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে গ্রহণ করা যেতো। নাটকটির সংলাপে বলা হচ্ছে, স্বৈরশাসকের পতন ও মৃত্যু ঘটেছে সামরিক বাহিনীর দ্বারা। শাসকের এই পতনে পুরো শহর থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। কোনো পূর্ব সংকেত ছাড়াই ঘটেছে ঘটনাটা। সবাই বিস্মিত, যে-শাসক এত ক্ষমতার অধিকারী ও এত জনপ্রিয় কীভাবে তার এত দ্রুত পতন ঘটলো। শুধু পতনই নয়, তার জানাজা পড়াবার মতন লোক পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। নাটকের সংলাপে আরো বলা হয়েছে, লোকটা যখন মিছিলে যেতো পেছনে হাজার হাজার লোক থাকতো অথচ জানাজা পড়তে গিয়েছিল মাত্র ছয়জন। কেউ শোক সভা পর্যন্ত করেনি। জীবিত অবস্থায় লোকটাকে অনেকেই সমীহ করতো, তার সভা-সমিতি মিছিলেও প্রচুর লোক জমায়েত হতো। প্রথম দিকে অনেকেই খুশি মনে ঘরে নেতার ছবিও টাঙ্গিয়ে ছিল। লোকটা তখন কিছু সত্য কথাও বলতো। তবে তার শাসনের শেষ দিকের লুটপাট অনেকেরই ভালো লাগতো না।
যা কিছু উপরে বলা হয়েছে, নাটকের সংলাপ ধরে ধরেই বলা হয়েছে। নাটকের অারো সংলাপে দেখা যায়, স্বৈরশাসকের মৃত্যুর পর শহরে আর কোনো মিছিল মিটিং নেই। নেতা মারা গেছে অতএব মিছিলও বন্ধ। সন্ধ্যার পর লুটতরাজের ভয়ও কমে গেছে। লোকটাকে যে মিছামিছি খুন করা হয়েছে তাও নয়। শেষ দিকে শহরের লোকজন ক্ষেপে উঠেছিল। লোকটাকে ঘুমের মধ্যে মেরে ফেলাতে অনেকের খারাপও লেগেছিল। লোকটার যতই দোষ থাক, হাজার হাজার মানুষ যার পেছনে ঘুরে বেড়ায় সেই তো নেতা। লোকটা যখন সত্যি কথা বলতো তখন সেগুলো আবার ব্যবসায়ীদের পক্ষে যেতো না। লোকটা বিদেশী মাল আমদানী বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। অথচ দেশী কারখানা চালু হবার আগেই বিদেশী মালের চালান তো বন্ধ করা যায় না। বিদেশী মাল বন্ধ করতে গিয়ে শেষে নিজেই বিদায় হলেন। নেতা মারা যাবার পর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, এবার থেকে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখুন।
নাটকটার সংলাপের দিকে লক্ষ্য করলেই নাট্যকারের একটি নির্মোহ চরিত্র ভেসে উঠবে। নাট্যকার স্বৈরাচারী নেতার প্রতি ঘৃণা বা প্রশংসা বাক্য উচ্চারণ না করে নৈর্ব্যক্তিকভাবে নেতার মূল্যায়ন করেছেন। নাটকটাকে তিনি ইতিহাসের ব্যাখ্যায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি পরের সংলাপগুলোতে বলছেন, সারা শহরে কারফিউ এবং আর্মি টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। ব্রেনগান ফিট করে আর্মির ভ্যানগুলো রাস্তায় চক্কর দিচ্ছে। মিছিল ফিছিল ঠাণ্ডা। মিছিল মিটিংয়ের কোনো গন্ধ নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য করার রাস্তা পরিষ্কার। অনেকের ধারণা নেতা বেঁচে থাকলে রাস্তায় মিলিটারী নামতে পারতো না। আবার কেউ কেউ বলেন, বুলেটের কাছে বক্তৃতা মিছিল কিসসু খাটে না। ফলে এটা চুটিয়ে ব্যবসা করার সময়। কিন্তু শহরের মধ্যে এখানে ওখানে প্রায় একটা সাপ দেখা যাচ্ছে। নাটকটিতে সবশেষে ব্যবসায়ীদের শ্রেণীচরিত্র ফুটে উঠেছে। ভিন্ন দিকে নেতার ভালো-মন্দ চরিত্র, সাধারণ মানুষের দোদুল্যমানতা নাটকে প্রকাশ পেয়েছে। নাটকটিতে কারো প্রতি পক্ষপাতিত্ব নেই।
নাট্যকার দেখাতে চান, স্বৈরাচারের পতন হয়েছে জনগণ তাতে খুশি, কারণ স্বৈরশাসক শেষের দিকে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছিল। কারণ তার শাসনকালে অরাজকতা দেখা গিয়েছিল। তিনি আবার দেশের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে যা করতে চেয়েছিলেন তা ব্যবসায়িদের পছন্দ ছিল না। রাজনৈতিক ঘটনাবলীর এক দ্বান্দ্বিক চেহারা এভাবেই নাট্যকার এ নাটকে তুলে ধরেছেন। যেহেতু নেতার শাসনে লুটপাট হয়েছিল তাই সামরিক বাহিনীর দ্বারা তার পতনে জনগণ খুশি। সেই কারণে তার জানাজায় লোক হয়নি এবং কেউই শোকসভা করেনি। কিন্তু স্বৈরশাসকের পতনের মধ্য দিয়ে যে দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়েছে তাও নয়। মানুষ স্বৈরাশাসনের পতনে খুশি হলেও, একই সঙ্গে এই ঘটনায় মিছিল সভা সমিতি করার অধিকার হারিয়েছে মানুষ। রাষ্ট্রের এক সঙ্কট দূর হয়ে সামনে নতুন সঙ্কটের লক্ষণ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। শহরের এখানে সেখানে প্রায় একটা সাপ দেখা যাচ্ছে। রূপক এই সাপের আগমন রাষ্ট্রে যে কবে বন্ধ হবে তা নাট্যকার যেমন বলে যাননি, এখন পর্যন্ত কেউ তা বলতে পারছে না। স্বৈরশাসন চলে গেলেই যে লখিন্দরের বাসর ঘরে সাপের আগমনের ভয় কেটে যাবে তা নয়। সাপ চারদিকে ওৎ পেতে আছে। স্বৈরশাসনের পতনের ভিতর দিয়ে তার খেলা শেষ হবার নয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান নেতা শেখ মুজিবের জীবনকে খণ্ডবিখণ্ড করে দেখার সুযোগ নেই। যা সেলিম আল দীন তার সর্প বিষয়ক গল্প নাটকের নেতার সম্পর্কে দর্শকদের সামনে স্পষ্ট করতে চান। সর্প বিষয়ক গল্প নাটকের নেতা মহাভারতের চরিত্রের মতন দোষ আর গুণের সমাহার। যদি শেখ মুজিবের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হয় তাঁর রাজনীতির পুরো সময়টাই মূল্যায়ন করতে হবে। তিনি হঠাৎ গজিয়ে ওঠা নেতা ছিলেন না। চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে তিনি একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত হয়েছিলেন। তিনি মুসলিম লীগ দিয়ে শুরু করেন, পরে আওয়ামী লীগে এসে সর্বোচ্চ পদে বসেন। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার কর্ণধার হন, তিনি আবার আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে গঠন করেন বাকশাল। সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় তাঁর জীবন। যিনি দীর্ঘ সময় লড়াই করেছেন ভারতের স্বাধীনতা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং পূর্ববাংলার গণতন্ত্রের জন্য, তিনি যখন প্রাণ দেন তিনি তখন একজন স্বৈরশাসক। বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতা তখন তাঁর হাতে। যিনি লড়াই করেছেন একদা গণতন্ত্রের জন্য, পরে তিনিই একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেন সংসদকে ব্যবহার করে। তিনি হন সেই রাজনৈতিক দলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তাঁর মুখের কথাই তখন আইন। কিন্তু নিজের হাতে সর্বময় ক্ষমতা নিয়েও তিনিও টিকে থাকতে পারলেন না, খুব কম বয়সে প্রাণ দিলেন। মানুষ তার দেশের এক আলোচিত চরিত্রকে হারালেন।
নিজের হাতে সর্বময় ক্ষমতা নেয়ার আগে শেখ মুজিব আরো দুটি কাজ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সবরকম ষড়যন্ত্র করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং খোন্দকার মোশতাক। তিনি স্বাধীন দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখতে মুক্তিযুদ্ধের মূল সংগঠক এবং সবচেয়ে ত্যাগী ব্যক্তিত্ব তাজউদ্দীন আহমদকে মন্ত্রীসভা থেকে সরিয়ে দেন। আওয়ামী লীগের ভিতর থেকে এর জন্য খুব প্রতিবাদ হয়নি। স্বাধীন দেশে আর ক্ষমতাবানদের কাছে তাজউদ্দীন আহমদের গুরুত্ব ছিল না। বরং গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মুজিবুর রহমান অনেক আগে থেকেই ছিলেন মর্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে। ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে যায় সেই কারণে। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী ছিলেন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সবরকম চুক্তির বিরুদ্ধে। তিনি যখন দেখলেন তাঁর দলের মন্ত্রীরা পাকিস্তানী সামরিকজান্তার অনুগ্রহ লাভ করে ক্ষমতায় থাকার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে। তিনি তখন কাগমারী সম্মেলন ডাকেন তা প্রতিহত করার জন্য।
কাগমারী সম্মেলনের কাউন্সিলে কী দেখা গেল? সকল সাধারণ সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে থাকলেও, কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রী সুহরাওয়ার্দী, মন্ত্রী আবুল মনসুর আহমদ এবং মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সহ ক্ষমতার স্বাদ পওয়া সাংসদরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির পক্ষে ভোট দিলেন। মওলানা তখন নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত দল আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে আসলেন। নতুন দল গঠন করলেন। কিন্তু পাকিস্তানের অভিজাত আর সামরিক জান্তাকে খুশি করে সরকারে থাকতে পারল না আওয়ামী লীগ। মাঝখান থেকে পাকিস্তানের সংহতির কথা বলে পূর্ব বাংলা হয়ে গেল পূর্ব পাকিস্তান। মুজিবকে এর পর বহু বছর নানাভাবে কারাগারে কাটাতে হলো। শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাগারে বসে লিখলেন ‘কারাগারের রোজনামচা’। সেই বইয়ে আছে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক সরকার আর পূর্ব পাকিস্তানের মোনায়েম খান মিলে কীভাবে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের উপর নির্যাতন চালিয়েছিল তার চিত্র।
বাংলাদেশের জনগণ যখন সংগ্রাম করে রক্ত দিয়ে শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনলেন, সংগ্রামের ঘাত প্রতিঘাতে তারপর মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। যখন তিনি রাষ্ট্রপ্রধান, বিরোধী দলের উপর তখন তিনি একই রকম নির্যাতন চাপিয়ে দিয়েছিলেন। মুজিব তখন দেশ শাসনে ব্যর্থ, সরকারি আর বেসরকারী পত্রিকার পাতায় পাতায় পাওয়া যাবে তার খবর। যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিল তখনই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগের নেতারা দ্বিধাবিভক্ত ছিলেন, শেখ মুজিব তখন পাকিস্তানের কারাগারে। স্বাধীন দেশে সেই বিভক্তির প্রথম দেখা পাওয়া গেল ছাত্র লীগের ভাঙ্গনের ভিতর দিয়ে। শেখ মুজিব তখন নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেন না, তিনি আত্মীয় পরিজনের পক্ষ নিলে পরে আওয়ামী লীগেও ভাঙ্গন ধরলো, জন্ম নিয়েছিল জাসদ। শেখ মুজিব তখন দিশেহারা, সারাদেশ জুড়ে চলছে বিশৃঙ্খলা, খাদ্যের আর নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের হাহাকার। স্বাধীন দেশে এমন হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। ভারত পাকিস্তানে স্বাধীনতার পর এমন সঙ্কট দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশে এই রকম সঙ্কট দেখা দিতেই পারে।
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন দেশের এই সঙ্কট নিরসনে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি স্বাধীনতার পর শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ নিয়ে সরকার গঠন করতে চাননি। কিন্তু আওয়ামী লীগের সুযোগ সন্ধানীরা তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে এইবার ষড়যন্ত্রে নামলেন। শেখ মুজিব দেশে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তার কান ভারী করলেন তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে। কারণ এই চক্র জানতেন, তাজউদ্দীন আর শেখ মুজিব একত্রে থাকলে তাঁরা অনিয়ম করে সুবিধা নিতে পারবেন না। দ্রুত নিজেদের অযোগ্যতার জন্য ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়বেন। বাস্তবে এই দুষ্ট চক্রই বিজয়ী হলো, সবসময় তাই হয়। এই চাটুকার স্তাবকরা শেখ মুজিবের পূজা দিতে আরম্ভ করলো। সব শাসকদের জন্য এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ বিপদ, এই স্তাবককদের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে না পারা। মুজিব তখন এক নেতা এক দেশ, এই সব প্রশংসায় ভেসে গেলেন। রাষ্ট্রের ভিতর অপশাসন ছড়িয়ে পড়তে থাকলো। পত্রপত্রিকা, এমন কি মঞ্চের নাটকে মুজিবের দুঃশাসনের চিত্র ফুটে উঠেছিল। বিভিন্ন নির্যাতনের সূত্র ধরে ডাকসু থেকে বলা হলো, শেখ মুজিবকে আর ‘জাতির পিতা’ কিংবা ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে সম্বোধন করা হবে না।
মুজিব কি নিজে এই রকম দুঃশাসন চেয়েছিলেন? তিনি কি চেয়েছিলেন পত্রপত্রিকা, নাটকে তার সরকারের দুর্নাম হোক? বা তিনি কি নিজের জনগণকে দুঃখকষ্টের মধ্যে নিপতিত করতে চেয়েছিলেন? না, তিনি তা চাননি। কিন্তু তা রুখতে বা সামলাতে পারেননি। তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল তাঁর নিজের দলের লুটপাটকারীরা। মুজিব নিজে বারবার বক্তৃতায় এদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন। কিন্তু তিনি নিজে বিরোধী দলের সমালোচনা আবার মেনে নিতে পারেননি। রাষ্ট্রের ভিতরে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা গেল, দিশেহারা মুজিব তখন জনগণকে বাঁচাতে হাত পাতলেন মুক্তিযুদ্ধের শত্রু যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। এসবই হচ্ছে শাসকদের জীবনের ট্র্যাজিডি, নিজের দেশের ভালো চাইতে এমন দেশের কাছে হাত পাতলেন যে, তাতে বিপদই বাড়লো। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে পরিচিত হলেন। মার্কিন সরকারকে খুশি করতে মন্ত্রী পরিষদ থেকে সরিয়ে দিলেন তাজউদ্দীন আহমদকে। মুজিবের বিপদ বাড়লো, তাজউদ্দীনকে সরিয়ে দিয়ে তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে গেলেন। সম্পূর্ণভাবে শত্রুদের খপ্পরে গিয়ে পড়লেন এবার। ট্র্যাজিডির দুই নায়ক হয়ে দাঁড়ালেন মুজিব আর তাজউদ্দীন, ঠিক সোহরাব রুস্তমের মতন।
মুজিব টের পাচ্ছিলেন দলের ভিতরের বিশ্বাসঘাতকতা, তার কথা কেউ শুনছে না। নিজেরাই তারা লুটপাট করে দলকে বিপদে ফেলছে, ত্যাগী নেতারা সবাই অসহায় বোধ করছেন। তিনি এবার সর্বময় ক্ষমতা নিজের হাতে নিতে চাইলেন। মনে করলেন, এর ফলে দলের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আসবে, তিনি তখন দলকে সামলাতে পারবেন। তিনি বাকশাল গঠন করে মনে করলেন সমস্যার সমাধান হবে। তিনি বুঝতে পারলেন না, ব্যবসায়ীদের কাছে তার এখন আর মূল্য নেই। সেলিম আল দীন তার নাটকে দেখিয়েছেন, নেতা মারা গেছেন, ব্যবসায়ীরা খুশি, মন খুলে এবার ব্যবসা করতে পারবে। বিদেশ থেকে যত দরকার মাল আমদানী করতে পারবে। যখন শেখ মুজিব বাকশাল গঠন করে সব ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেন, তার কিছুদিন পর তাজউদ্দীন আহমদ নাকি শেখ মুজিবকে বলেছিলেন, মুজিব ভাই, এমন সরকার বানালেন যে, আপনাকে গুলি না করে ক্ষমতা থেকে নামাবার পথ খোলা রাখেননি। সত্যি বিরাট প্রশ্ন, কারা শেখ মুজিবকে বাকশাল গঠন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন? দলের ভিতর থেকে প্রতিবাদ উঠলো না কেন? সবচেয়ে সুবিধাভোগীরা কি এটাই চেয়েছিলেন? না হলে শেখ মুজিব মারা যাবার পর দলের ভিতর থেকে বিরাট প্রতিবাদ হলো না কেন? সামরিক বাহিনীর প্রধান মুখ বন্ধ করে থাকলেন কেন? রক্ষীবাহিনীর ভূমিকা কী ছিল? বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তো তখন খুব ছোট দল ছিল না।পত্রপত্রিকায় এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি। নাটকের দলগুলো একটা বিবৃতি পর্যন্ত দেয়নি। সবাই কি তাহলে সেদিন মনে মনে এই মৃত্যুতে খুশি হয়েছিলেন?
যখন ভারত স্বাধীন হয়, গান্ধীর প্রয়োজন বড় বড় নেতাদের কাছে ফুরিয়ে গিয়েছিল। স্বাধীন দেশে যখন নেহরু প্রধানমন্ত্রী তখনি গান্ধী দিল্লিতেই আততায়ীর হাতে প্রাণ দেন। এই ঘটনার কদিন আগে গান্ধীর দেহরক্ষী সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। প্যাটেল তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী। দেশভাগের পর যখন ভয়াবহ দাঙ্গা ঠেকানো যাচ্ছিলো না, গান্ধী প্রধানমন্ত্রী নেহরু আর আজাদের সামনেই একদিন তাঁর বহুদিনের প্রিয় শিষ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলকে বকা দিলেন। প্যাটেল সঙ্গে সঙ্গে এর প্রতিবাদ করে গান্ধীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। প্যাটেল যে এমনটা দুর্ব্যবহার করবেন তাঁর এতকালের বর্ষীয়ান নেতার সঙ্গে বাকিরা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। সেদিনের ঘটনার বিস্তারিত লিখেছেন মওলানা আজাদ তাঁর ভারত স্বাধীন হলো গ্রন্থে। কংগ্রেসে গান্ধীর চেয়ে ১৪ বছরের জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন জিন্নাহ। জিন্নাহ যখন আকস্মিক ১৯২০ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করলেন, গান্ধী তখন থেকে এই কংগ্রেস দলের অবিশংবাদী নেতা, তার প্রিয় চার শিষ্য তখন নেহরু, আজাদ, প্যাটেল, রাজেন্দ্রপ্রসাদ। সবাই এঁরা গান্ধীর প্রশ্রয়ে অনেক রকম সুবিধা পেয়েছেন। সেই রকম এক শিষ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্যাটেলের দুর্ব্যবহারে গান্ধীর সামনে ইতিহাসের অনেক সত্য ধরা পড়লো।
দাঙ্গা নিয়ে গান্ধী এবং জিন্নাহ তখন দুই ভূখণ্ডে বসে নিদ্রাহীন রাত পার করছিলেন। গান্ধী তখনই চিঠি লিখে জানালেন জিন্নাহকে, ভাই জিন্নাহ, দাঙ্গা থামতে হবে। আপনি আর আমি যদি একসঙ্গে ডাক দেই তাহলে ভারতের জনগণ আমাদের কথা শুনবে না এমন হতে পারে না। আমরা দুজন একত্রে বসলেই দাঙ্গা বন্ধ হবে। সঙ্গে সঙ্গে খুশি মনে আন্তরিকভাবে সেই চিঠির জবাব দিলেন জিন্নাহ। প্যাটেল কিছুতেই গান্ধীর এই পদক্ষেপ পছন্দ করলেন না। গান্ধী তখন নেহরু আর প্যাটেলকে বললেন, ভারত ভাগ হয়েছে। পাকিস্তানের প্রাপ্য পঞ্চান্ন কোটি টাকা তাদেরকে দিয়ে দেওয়া উচিৎ। তখন জোরালো আপত্তি তুললেন প্যাটেল। নেহরু নীরবে সম্মতি জানালেন প্যাটেলকে।
দৃঢ় চিত্তের বৃদ্ধ এই গান্ধীর মনে ভয় ডর বলে কিছু ছিল না। রাজনীতিতে অজস্র ভুল করেছেন। কিন্তু কখনো মৃত্যুকে পরোয়া করেননি। জীবনের শেষে এসে তাঁর শিষ্য শাসকদের চোখে চোখ রেখে বললেন, যদি তোমরা পাকিস্তানকে তার প্রাপ্য টাকা বুঝিয়ে না দাও, তাহলে এই ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আমি লাহোর পর্যন্ত লংমার্চ করবো। প্যাটেলে সামান্য দ্বিধা না করে বললেন, গান্ধীজী, তাহলে আপনাকে একজন দেশদ্রোহী হিসেবে আমি গ্রেফতার করতে বাধ্য হবো। প্রধানমন্ত্রী নেহরু সেদিন এতটা নির্লজ্জ হতে পারেননি। তিনি প্যাটেলকে তখনই থামিয়ে দিলেন। বাস্তবে যা ঘটলো, লংমার্চে যাবার আগের দিন গান্ধী আততায়ীর হাতে খুন হলেন। তিনিই জিন্নাহকে একদা কায়েদে আযম উপাধি দিয়েছিলেন।
ভারতবর্ষের তিন স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রধান তিন নেতা গান্ধী, জিন্নাহ এবং মুজিব তিন জনের জীবনেই নেমে এসেছিল ট্র্যাজিডি। দুজন প্রাণ দিলেন নির্মমভাবে, একজন মারা গিয়েছিলেন খুব অবহেলায়। জিন্নাহ যখন কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতা, তখন তাঁকে বলা হতো হিন্দু-মুসলমান মিলনের অগ্রদূত। সরোজিনী নাইডু তাঁকে নিয়ে এমন একটি কবিতাই লিখেছিলেন। জিন্নাহর বক্তৃতা সম্পাদনা করে বই প্রকাশ করেছিলেন সরোজিনী নাইডু। চিত্তরঞ্জন দাশ, তরুণ সুভাষ বসু, মতিলাল নেহরু একসময়ে ছিলেন জিন্নাহর খুবই ভক্ত। মসলমানদের ধর্মীয় খিলাফত আন্দোলনকে জিন্নাহ সমর্থন করতে পারেননি বলে কংগ্রেসে গান্ধীর সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হয়। খিলাফতপন্থীদের মতের বিরোধিতা করে কংগ্রেস ত্যাগ করেছিলেন তিনি। যখন পাকিস্তান হলো, তিনি বললেন পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত লিখবে একজন সংখ্যালঘু। মুসলমানরা নয়। ইকবালের মত এত বড় বড় মাপের কবিদের লেখা বাদ দিয়ে তরুণ জগন্নাথ আজাদের লেখা গানকে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত করেছিলেন তিনি। জিন্নাহ মারা যাবার পর সেই জাতীয় সঙ্গীত বাতিল করে পাকিস্তানের শাসকচক্র। জগন্নাথ আজাদ তারপর চলে আসেন ভারতে, মারা যান ২০০৪ সালে কবি ইকবাল বিশেষজ্ঞ হিসেবে।
ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি বিচিত্র। মানুষ বহু বিচিত্র পথে এখানে ভ্রমণ করে, কতবার সে পথ পাল্টায়, মত পাল্টায়। মানুষ হচ্ছে তাই মানুষ, ঘটনার স্রোতে সে ভেসে বেড়ায়। নানান ঘটনার ভিতর দিয়ে নিজেকে নির্মাণ করে। ফলে ব্যক্তিপূজা বা ব্যক্তিঘৃণার চেয়ে বড় হলো সময়, চারদিকের নানান বাস্তবতা। যদি এই ব্যক্তিপূজা আর ব্যক্তিঘৃণার জায়গা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে নির্মোহভাবে ইতিহাসের চোখ দিয়ে সবকিছুকে বিচার করা যায়, তাহলেই মানুষে মানুষে চিন্তার বিভেদ কমে আসবে, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা লোপ পাবে।
অত্যন্ত তথ্য সমৃদ্ধ ও মহাভারত হয়ে সেলিম আল দীনের নাটকের ভবিষ্যত দ্রষ্টার আলেখ্য এই পোস্টকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে । অনেক ঐতিহাসিক চরিত্র নিয়ে অসাধারণ আলোক পাত হয়েছে । আমি আমাদের এই ভূখণ্ডের একজন নেতা যাঁকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয় – এই ব্যক্তির রাজনৈতিক ও রাস্ট্র নায়ক হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ডে কতটুকু ধারণ করবো বা বর্জন করবো , প্রশ্ন সেটাই । মুজিবের ব্যক্তি সত্ত্বা ও রাজনৈতিক সত্ত্বার মধ্যে প্রধান হচ্ছে সারা জীবনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড । তাঁর সমগ্র জীবনের রাজনৈতিক উত্থানের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেখানে এক ধরণের চাতুর্য্যের খেলা । এক সুযোগ সন্ধানী ক্ষমতা লাভের প্রয়াস । তা কখনো আদর্শ ভিত্তিক ছিল না । তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন আন্দোলন খেলাও ছিল – রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার জন্য । সর্বশেষ যে খেলাটা ছিল ১৯৭১ এর ৭ই মার্চের ভাষণের পর । অসহযোগ নামক আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানী বর্বর শাসক শ্রেণীকে মার্কিন নীল নকশা অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করা । অন্যদিকে আলোচনায় সমাধানের মূলো ঝুলিয়ে জনগণ অপ্রস্তুত রেখে এবং পাকিস্তানী হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের রূপরেখা না দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশ মোতাবেক পাক হানাদারের কাছে কাপুরুষের মত আত্মসমর্পণ । তাঁর এই অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্তের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন, ধনসম্পদ, নারীর সম্ভ্রম হারাতে হলো । এহেন ব্যক্তিকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে যারা তৃপ্তির ঢেকুর তোলে তাঁরা আর যাই হোক মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ নয় ।
শেখ মুজিব তাঁর শাসনামলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের – যাদের বর্বরতা ছিল হালাকুখানের চেয়েও নিষ্ঠুর নৃশংস তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা । পক্ষান্তরে যুদ্ধকালীন সময়ে এই দেশে থেকে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে যারা সশস্ত্র লড়াই করলো এবং হাজার হাজার তরুণ শহীদ হলো , তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতের শাসক শ্রেণীর তৈরি করা মুজিব বাহিনী দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা । তাতে শেখ মুজিবের তৃপ্তি না হওয়ায় রক্ষীবাহিনী নামক ফ্যাসিস্ট বাহিনী হাজার হাজার তরুণকে বিনা বিচারে দিনের পর দিন অমানুষিক টর্চার করে হত্যা করলো ।তৎকালীন সময়ে সারা বিশ্বের বুর্জোয়া মিডিয়া শেখ মুজিবকে সাধারণ মানুষের কাছে দেবতা তূল্য এক অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল । ‘৭২ সালে দেশে ফিরলে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে বিরল সংবর্ধনা দিলেন । মাত্র সাড়ে তিন বছর পর তাঁর পরিবারের সদস্যদের সহ তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনগণের তরফ থেকে কোন প্রতিবাদ তো উঠলোই না বরং ঢাকাসহ সারাদেশে আনন্দে মেতে ওঠে । সবচেয়ে বিষ্ময়কর ব্যাপার হলো তাঁর মরদেহ ৩২ নং পড়ে থাকলো – অন্যদিকে তাঁরই দলের এমপিরা খোন্দকার মোশতাকের মন্ত্রী পরিষদে শপথ গ্রহণ করে । শেখ মুজিবের এই পরিণতি এক নেতা এক দেশ শেখ মুজিবের বাঙলাদেশ নামক একদলীয় ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ । তাই এই মৃত্যুকে কোন ট্রাজেডি হিসেবে মহিমান্বিত করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না ।