বন্যা ও ভূমিধসের পর বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি। নেপালের নুয়াকোট জেলায়, ২৬ আগস্ট ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
নেপাল-চীন সীমান্তে হিমবাহ ধসের পর আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো নিখোঁজ প্রায় এক হাজার মানুষ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই দুর্যোগের তাৎক্ষণিক কারণ নিয়ে অনুসন্ধান চললেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের বরফ, পাথর ও পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ায় এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৮০০ জন বিদেশি বলে জানানো হয়েছে। বুধবার হিমবালয় অঞ্চলে একটি বিশাল হিমশিলা ও পাথরের অংশ ধসে নদীতে পড়ে। এর পরপরই প্রবল স্রোতে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। এতে পাহাড়ি উপত্যকা ও জনপদগুলোতে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের সৃষ্টি হয়।
আর্থ সায়েন্সেস নিউজিল্যান্ডের ‘মাউন্টেনস টু সি’ কর্মসূচির প্রধান বিজ্ঞানী সাইমন কক্স বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উঁচু পর্বতের পাথর ও বরফের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। এর ফলে হিমবাহ ধসসহ নানা ধরনের বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
দুর্যোগের সঠিক কারণ নিয়ে চলছে অনুসন্ধান
বুধবারের বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢালে একটি বিশাল হিমশিলা ধসে পড়ে। পরে সেই ধসের বিপুল পরিমাণ বরফ, মাটি ও পাথর তিব্বতের লেন্দে খোলা নদীতে গিয়ে পড়ে। এতে নদীর পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত ও আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ভয়াবহ বন্যার সূত্রপাত হয়।
এরপর শুরু হয় ধারাবাহিক বিপর্যয়। সীমান্তের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা ও ভূমিধস ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ছয়টি বড় জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। ধ্বংস হয়েছে জিরং স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক অবকাঠামোর একটি বড় অংশ। পাশাপাশি ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি ভাটির ১০০ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় নদীর স্বাভাবিক গতিপথও প্রভাবিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে বুধবারের বিপর্যয়ের একমাত্র তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি অঞ্চলে বরফ ও পানির স্বাভাবিক ভারসাম্য পরিবর্তন এই ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সাইমন কক্সের মতে, তাপমাত্রা বাড়লে খাড়া পাহাড়ি ঢালে বরফের বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। একই সঙ্গে বাড়ে গলিত বরফের পানির প্রবাহ। বরফ জমা ও গলে যাওয়ার স্বাভাবিক চক্রের পরিবর্তন এবং বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়াও পাহাড়ের ঢালকে দুর্বল করে। ফলে হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের মতো ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরেও একাধিক বড় দুর্যোগ
হিমালয় ও এর আশপাশের অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের বেশ কয়েকটি দুর্যোগ দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালে তিব্বত-নেপাল সীমান্তের জিরং এলাকায় বন্যা, ২০২৪ সালে নেপালের থামে গ্রামে হিমবাহের হ্রদ বিস্ফোরণ এবং ২০২৩ সালে ভারতের সিকিমে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নেপাল বা তিব্বত নয়, পুরো হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে এসব দুর্যোগের তীব্রতাও আগের তুলনায় বেড়ে যাচ্ছে।
নেপালভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, পানি, ভূমি ও আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষকে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ ক্রায়োস্ফিয়ার বিশেষজ্ঞ ফারুক আজম বলেন, পাহাড়ি এলাকায় তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় পৃথিবীর বরফাবৃত অঞ্চলগুলো আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত তুষার গলে যাওয়া এবং ভূকম্পনের মতো প্রাকৃতিক ঘটনা একসঙ্গে কাজ করে হিমশিলার প্রাথমিক ধস ঘটিয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। আর সেই ধস থেকেই ভাটির দিকে একের পর এক আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে।
নেপালের হিমবাহ দ্রুত গলছে
হিমালয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে নেপালের তুষারাবৃত পাহাড়গুলো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। একই সময়ে নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় পরবর্তী দশকে ৬৫ শতাংশ দ্রুতগতিতে গলেছে বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি।
হংকংয়ের সিটি ইউনিভার্সিটির স্কুল অব এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের ডিন বেঞ্জামিন হর্টনের মতে, বুধবারের বিপর্যয় একাধিক প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবের বড় উদাহরণ।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ ক্ষয়, বরফ জমে থাকা মাটি গলে যাওয়া এবং পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার সঙ্গে যদি ভূমিকম্পের মতো ঘটনা যুক্ত হয়, তাহলে একটি বড় দুর্যোগ তৈরি হতে পারে। একক কোনো কারণে সৃষ্ট দুর্যোগের তুলনায় এ ধরনের সম্মিলিত ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে হলে শুধু বন্যা বা ভূমিধসের পূর্বাভাস দিলেই হবে না। হিমবাহ গলে যাওয়া, পাহাড়ি ঢালের পরিবর্তন, নদীর গতিপথ, অতিবৃষ্টি এবং ভূকম্পনের মতো পরস্পর সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলো একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তা না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক ও প্রাণঘাতী দুর্যোগের মাত্রা আরও বাড়তে পারে।