সাংবাদিকদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন, ন্যায়বিচার নাকি রাজনৈতিক প্রতিশোধ?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংসতার বিচারের জন্য গঠিত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা আইসিটিতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ওঠায় ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের সীমারেখা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দ্য ডিপ্লোম্যাট-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন সাংবাদিক ও লেখকের বিরুদ্ধে নিয়মিত হত্যা মামলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও মামলা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এসব ঘটনার জবাবদিহি ও বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে সক্রিয় করা হয়। তবে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালে পুনর্গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল অতীতেও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাংবাদিক ফারজানা রূপা, তার স্বামী শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্ত এবং লেখক শাহরিয়ার কবির ২০২৪ সালের আন্দোলন-সম্পর্কিত বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হন। ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদকে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিমানবন্দর থেকে পোশাকশ্রমিক ফজলুলের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রূপার বিরুদ্ধে নয়টি এবং শাকিলের বিরুদ্ধে ছয়টি হত্যা মামলা রয়েছে।
মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত ও শাহরিয়ার কবিরকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে একই ধরনের আন্দোলন-সম্পর্কিত হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও পৃথক অভিযোগ আনা হয়।
২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টার-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলাগুলো ‘তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছিল’ বলে স্বীকার করেছিলেন। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও ২০২৫ সালের ২৬ জুন এক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক আলোচনায় জানিয়েছিলেন, ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, এসব মামলা সরকার করেনি, সাধারণ নাগরিকরা করেছেন এবং যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়া গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে সরকারের অবস্থান ছিল।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপিও নির্বাচনী ইশতেহারে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা বন্ধ এবং নির্যাতিত ও নিহত সাংবাদিকদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই চার সাংবাদিক ও লেখকের ক্ষেত্রে এখনো এর সুফল দেখা যায়নি।
আসামিদের পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিকবার জামিনের আবেদন করা হয়েছে। এসব আবেদনে প্রমাণের ঘাটতি, প্রাথমিকভাবে মামলা চালানোর মতো যথেষ্ট তথ্য না থাকা এবং আসামিদের বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার বিষয় তুলে ধরা হয়। ৭৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার কবির এবং ক্যানসারে আক্রান্ত মোজাম্মেল বাবুর জামিনের আবেদনও বারবার নাকচ হয়েছে। ২০২৬ সালের ১১ মে ঢাকার হাইকোর্ট ফারজানা রূপাকে ছয়টি এবং শাকিল আহমেদকে পাঁচটি মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিলেও পরে আপিল বিভাগ সেই জামিন স্থগিত করেন।
চলতি বছরের শুরুতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত ও শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে নতুন করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর একটি মামলা একাত্তর টেলিভিশনের ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর অভিযান নিয়ে করা প্রতিবেদন ও পরবর্তী একটি তথ্যচিত্রকে কেন্দ্র করে। এতে ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু ও শাহরিয়ার কবিরকে আসামি করা হয়।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের আগস্টে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আরেকটি মামলা করা হয়। এতে ফারজানা রূপা, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তকে আসামি করা হয়। ২৫ আগস্ট ওই মামলার শুনানির সময় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এখন এসব সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দুই ধরনের আইনি প্রক্রিয়া চলছে। একদিকে নিয়মিত আদালতে হত্যা মামলার বিচার চলছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচার চলছে। এ দুই ধরনের মামলার আইনি কাঠামোও আলাদা।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটরের সাবেক উপদেষ্টা টবি ক্যাডম্যান মনে করেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। তবে সেই বিচার প্রতিশোধের উদ্দেশ্যে নয়, সত্য, ন্যায়বিচার ও পুনর্মিলনের ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন। তার মতে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সময়মতো প্রমাণ প্রকাশ, কার্যকর আইনগত সহায়তা এবং আটকাদেশের বিচারিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে কোনো ঘটনাকে বিবেচনা করতে হলে তা সাধারণত বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা সুসংগঠিত হামলার অংশ হতে হয়। এ কারণে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ, তথ্যচিত্র নির্মাণ কিংবা সংবাদ সম্মেলনে কোনো রাজনৈতিক নেতাকে কঠিন প্রশ্ন করাকে সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে নেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে এই ‘ব্যাপক বা সুসংগঠিত হামলা’র শর্ত ঐতিহাসিকভাবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের মতো কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১০-২০১১ সালের বিচারপ্রক্রিয়ার সময় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞ এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
সাংবাদিকদের বিচার প্রসঙ্গে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নজিরও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। টবি ক্যাডম্যানের মতে, সাংবাদিকতার প্রতিবেদন, মন্তব্য বা সম্পাদকীয় অবস্থান শুধু পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার কারণে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় তৈরি করে না। রুয়ান্ডার ক্ষেত্রে রেডিও টেলিভিশন লিব্রে দে মিল কোলিনের সম্প্রচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কারণ তারা হত্যার শিকার ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা ও গাড়ির নম্বর প্রচার করে তাদের খুঁজে বের করে হত্যার ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা রেখেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রেও একই ধরনের কঠোর আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করা প্রয়োজন। সাংবাদিকতার সাধারণ কাজ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি। অভিযোগের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ না থাকলে মামলা ও গ্রেপ্তার দীর্ঘায়িত হলে তা বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন পুরোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এজন্য আইন সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ, গুরুতর অপরাধে প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং অপরাধী, রাজনৈতিক সহযোগী ও সাংবাদিকদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে তারা কীভাবে এসব অভিযোগের বিচার করে তার ওপর। একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ বা সংবাদ সম্মেলনে করা প্রশ্নকে যদি ব্যাপক নৃশংসতার অপরাধের সঙ্গে একই মাত্রায় বিবেচনা করা হয়, তাহলে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্য ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে। আর যথাযথ প্রমাণ, আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড ও ন্যায়বিচারের নীতির ভিত্তিতে বিচার পরিচালিত হলে এই ট্রাইব্যুনাল সত্যিকার অর্থেই জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।
সুত্রঃ দ্য ডিপ্লোম্যাট