বাংলাদেশ

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে বাংলাদেশ

  • 4:48 pm - August 28, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৯৯ বার
মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে ভারসাম্যের পররাষ্ট্রনীতি চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে বাংলাদেশের। ছবিঃ সংগৃহীত

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশ যোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তবে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে চলতি আগস্টে মক্কায় এই প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির আদলে তৈরি চুক্তিতে বলা হয়েছে, কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠলে বাংলাদেশও সেখানে অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। তিনি বলেন, বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নেতৃত্ব, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র  জানিয়েছে, সৌদি আরব বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে কখন এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তা সূত্রটি জানায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা এ তথ্য দেন।

তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কোনো আমন্ত্রণ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। বাংলাদেশ এ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলেও তিনি জানেন না।

চলতি মাসে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এই চুক্তিতে সই করে। তিনটি দেশই সুন্নি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়তে থাকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি করা হয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বৈঠকের পর চুক্তিটি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। তুরস্ক জানিয়েছে, সৌদি আরব ও পারমাণবিক অস্ত্রধারী পাকিস্তানের সঙ্গে করা এই প্রতিরক্ষা জোট ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ যদি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়, তাহলে ভারতের পাশাপাশি চীন, ইরান, জাপান, কুয়েত, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক পরিচালনা করা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্লোল কিবরিয়া বলেন, এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সরাসরি নষ্ট হয়ে যাবে এমন নয়। তবে বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে দেশটি কোন পক্ষের সঙ্গে রয়েছে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বী ভূরাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে আসছে। এর ফলে দেশটি একদিকে ভারত ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই ভারসাম্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশের তৈরি পোশাকের বড় অংশ যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি হয়। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত লাখ লাখ বাংলাদেশির পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সামরিক জোটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হলে বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক স্বার্থগুলোও নতুন করে বিবেচনার মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কৌশলগত হিসাব তৈরি হতে পারে।

এদিকে সৌদি আরবের আমন্ত্রণের বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনো ভারত সফরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের কাছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে নয়াদিল্লির জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।

সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার পর বাংলাদেশ এর সমালোচনা করে। এর আগে ঢাকা জানিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন।

ফলে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ এখন শুধু একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয় নয়, বরং দেশের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকার শেষ পর্যন্ত এই জোটে যোগ দেওয়ার পথে এগোয় কি না, নাকি আগের মতোই সব পক্ষের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সুত্রঃ রয়টার্স

এই শাখার আরও খবর

সরকার চায় ঐক্য, একটি মহল ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি: প্রধানমন্ত্রী

দেশের সব মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্য গড়ে তুলতে চায় সরকার। তবে সরকার যখন সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, তখন একটি মহল দেশে বিভ্রান্তি ছড়ানোর…

ইশরাকের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে প্রজ্ঞাপন জারি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি। এ বিষয়ে মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে…

মসজিদে বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য খতিবের, নিরব প্রশাসন

ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকার টানপাড়ার জামতলা জামে মসজিদে জুমার বয়ানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রসাদ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে মসজিদটির অস্থায়ী খতিব…

কিম জং উনের স্বাস্থ্য নিয়ে গুঞ্জন, কী জানা যাচ্ছে?

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জল্পনা ছড়িয়েছে। সম্প্রতি তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে কোমায় আছেন বলে কিছু…

ফ্রান্সজুড়ে চলছে দাঙ্গা-লুটপাট, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ থেকে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা এবং দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে…

নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত বেড়ে ১৪, আহত ৩২

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়ায় বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ জনে দাঁড়িয়েছে। এ দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩২ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au