নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় ৩৪ অস্ট্রেলীয় নিখোঁজ।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনও এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯ জন অস্ট্রেলীয় নাগরিক রয়েছেন বলে জানিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এক বিবৃতিতে বলেন, নেপালে নিখোঁজ অস্ট্রেলীয়দের অবস্থান নিশ্চিত করতে দেশটির কর্মকর্তারা জরুরি ভিত্তিতে কাজ করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ারও চেষ্টা চলছে। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় দুর্যোগের ব্যাপকতা উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে বলেও জানান তিনি।
অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তিনজন মানবিক সহায়তা বিশেষজ্ঞকে নেপালে পাঠানো হবে। তারা সেখানে আগে থেকেই থাকা অস্ট্রেলীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করবেন। একই সঙ্গে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের সহায়তায় আরও জনবল পাঠাবে দেশটির পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ।
নেপালে ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নেপাল পুলিশের সদস্যরা প্রশিক্ষিত কুকুর নিয়ে কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহ উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। অনেক এলাকায় পুরো গ্রাম কাদা, পাথর ও পানির স্রোতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, সেতু ও যানবাহন।
নেপাল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৪৬৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দেশটিতে আরও ৯১০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি পর্যটক রয়েছেন। এ ছাড়া চীন জানিয়েছে, নেপালে তাদের আরও ১০০ নাগরিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, যারা ওই ৯১০ জনের তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়।
নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক রয়েছেন। ভারতীয় নাগরিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দেশটির ৯০ নাগরিকের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে তিব্বতের গিরং বন্দর এলাকাতেও ভয়াবহ ভূমিধসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে কাদাধসের ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং বৃহস্পতিবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বা ইউএসজিএস জানিয়েছে, হিমবাহ ধসে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূত্রপাত হতে পারে। হিমবাহের বরফ ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত পাহাড়ি নদীপথে নেমে এসে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ায় ভবিষ্যতে হিমবাহ-সংক্রান্ত বন্যা ও ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া সড়কগুলো খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্যোগের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল একে ‘অভ্যন্তরীণ সুনামির’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নেপালের ভেতরে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, বিধ্বস্ত সড়ক ও সেতু এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কারণে উদ্ধারকাজ আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে নিখোঁজদের সন্ধান এবং জীবিতদের উদ্ধারে নেপাল ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উদ্ধারকারী দলগুলোকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।