বাবার সঙ্গে ছয় মাস কথা নেই, ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কায় ছেলেরা
কারাগারে থাকা পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের স্বাস্থ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর দুই ছেলে সুলাইমান খান ও কাসিম…
রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রচলিত ঘটনাক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া কিছু তথ্যের সঙ্গে পুলিশের বর্ণিত হত্যার সময়ের অসংগতি, ঘটনাস্থলে আলামত সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং দুই আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পাশাপাশি পুলিশের কয়েক কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘নর্থইস্ট নিউজ’ দাবি করেছে, ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাসহ পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
রংপুর নগরের দাসপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ২৩ বছর বয়সী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং তাঁদের ছেলে আয়ুষ চক্রবর্তীকে হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে ২২ আগস্ট রাতে। ওই রাতে বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনার পর পুলিশ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ দাবি করে, তাঁরা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। এতে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার দুজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
তবে ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশের বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এবার ‘নর্থইস্ট নিউজ’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ময়নাতদন্তের তথ্য, ঘটনাস্থলের আলামত এবং পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ পরিবারের চারজনকে হত্যার খবরে স্বজনদের আহাজারি। ছবিঃ সংগৃহীত
হত্যার সময় নিয়ে বড় প্রশ্ন
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান দাবি, চারজনকে পুলিশ যে সময়ের কাছাকাছি হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের কিছু তথ্য তার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
চারটি মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে পাকস্থলীতে খাবারের উপস্থিতির কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারজনের ক্ষেত্রেই পাকস্থলীতে ‘স্বাভাবিক গন্ধযুক্ত খাদ্য উপাদান’ পাওয়া গেছে।
এই তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে, রাতের খাবার খাওয়ার খুব বেশি সময় পর চারজনের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ পুলিশের প্রাথমিকভাবে বলা ভোরের সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
সাধারণভাবে খাবার পাকস্থলীতে কয়েক ঘণ্টা থাকে এবং পরে ধীরে ধীরে ক্ষুদ্রান্ত্রে যায়। তবে খাবার হজমের সময় নির্দিষ্ট নয়। খাবারের ধরন, পরিমাণ, ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য বিষয় এর ওপর প্রভাব ফেলে। তাই শুধু পাকস্থলীতে খাবারের উপস্থিতির ভিত্তিতে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা যায় না। তবে অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে এটি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মরদেহ উদ্ধারের সময় থেকে আনুমানিক দুই থেকে চার দিনের মধ্যে মৃত্যুর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ অনুমান মূলত মরদেহের পচনশীল অবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
পুলিশের বক্তব্যে কেন পরিবর্তন?
হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ প্রথমে বলেছিল, ভোরের দিকে গণপতি চক্রবর্তী বাড়ির ছাদে গিয়ে দেখতে পান মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ইয়াবা সেবন করছেন। এ নিয়ে বাধা দেওয়ার পর তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে গণপতিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
পরে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানায়।
গণপতির মরদেহ ছাদে পাওয়া যায়। প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় ছাদে ওঠার অসমাপ্ত সিঁড়ি ও অবতরণস্থলের কাছে। আর আয়ুষ, যাকে কোথাও কোথাও প্রিয়ম নামেও উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর শয়নকক্ষে বিছানার ওপর ছিলেন।
পরে পুলিশের বক্তব্যে সময়ের কিছু পরিবর্তন আসে। প্রথমে হত্যাকাণ্ডকে সূর্যোদয়ের কাছাকাছি সময়ের ঘটনা বলা হলেও পরে প্রায় রাত সাড়ে ৩টার সময় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানানো হয়।
এই পরিবর্তনই এখন তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাতের খাবারের পরই কি হত্যাকাণ্ড?
‘নর্থইস্ট নিউজ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারজনের পাকস্থলীতে পাওয়া খাবারের অবস্থা থেকে বোঝা যায়, খাবার পুরোপুরি হজম হওয়ার আগেই তাঁদের মৃত্যু হয়।
প্রতিবেদনটি এ তথ্যকে পুলিশের ভোররাতের হত্যাকাণ্ডের বর্ণনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখিয়েছে।
তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকস্থলীর খাবারের অবস্থা একা মৃত্যুর সময়ের নির্ভুল ঘড়ি হিসেবে কাজ করে না। তাই এ তথ্যকে কল রেকর্ড, মোবাইলের অবস্থান, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, সিসিটিভি, ফরেনসিক আলামত এবং অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
বড় ভাইয়ের সন্দেহ
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তীও পুলিশের গ্রেপ্তার করা দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
‘নর্থইস্ট নিউজ’-কে তিনি বলেন, গণপতি শারীরিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন। তাঁর ধারণা, দুজন তরুণের পক্ষে গণপতিকে একা পরাস্ত করে হত্যা করা সহজ ছিল না।
তিনি মনে করেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কোনো পক্ষ থাকতে পারে।
তবে এটি তাঁর ব্যক্তিগত বক্তব্য। এর পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
ডিআইজির বিরুদ্ধে সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি করা হয়েছে ডিআইজি পদমর্যাদার এক পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে।
‘নর্থইস্ট নিউজ’ দাবি করেছে, ওই কর্মকর্তা ২০২৬ সালের ২৩ এপ্রিল রংপুর পুলিশ কমিশনারেটে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যোগ দেন। পরে আগস্টের শুরুতে তিনি হঠাৎ বদলির চেষ্টা করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির দাবি, ১৯ আগস্ট ওই ডিআইজি এবং তাঁর অধীনস্থ অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তা রংপুর নগরের দাসপাড়ায় চক্রবর্তী পরিবারের বাড়িতে গিয়েছিলেন।
তাঁরা কখন সেখানে পৌঁছেছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রতিবেদনে ধারণা করা হয়েছে, পরিবারের রাতের খাবারের পর তাঁরা সেখানে পৌঁছান।
এই দাবির পক্ষে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে থাকা পাকস্থলীর খাবারের তথ্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পারিপার্শ্বিক সূত্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ওই ডিআইজি বা অন্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তা হত্যাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বা হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন, এমন স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।
এক নারীকে ঘিরে ব্যক্তিগত সম্পর্কের দাবি
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, রংপুরে দায়িত্ব পালনের সময় ওই ডিআইজি নগরের বাইরে বসবাসকারী এক বিবাহিত হিন্দু নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
ওই নারী নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ পরিচিত ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
‘নর্থইস্ট নিউজ’-এর অনুসন্ধানে এমন ধারণা করা হয়েছে যে, ওই নারী হয়তো ডিআইজির সম্পর্কে এমন কিছু তথ্য জানতেন, যা কর্মকর্তাটির জন্য বিব্রতকর হতে পারত। সেখান থেকে চক্রবর্তী পরিবারের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল কি না, সেটিও প্রতিবেদনে প্রশ্ন হিসেবে তোলা হয়েছে।
তবে এই অংশের দাবিগুলোর পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এগুলোকে আপাতত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অভিযোগ ও অনুমান হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
ঘটনাস্থলে ফরেনসিক পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ নিয়ে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনতলা বাড়িটিতে পর্যাপ্ত ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়নি এবং আঙুলের ছাপসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহের সুযোগ নষ্ট হয়েছে।
এ ছাড়া যেসব বস্তু দিয়ে চারজনকে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো যথাযথ ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
ঘটনাস্থলে পাওয়া কিছু বস্তু, যেমন চিবানো শসার অংশ, খেজুর এবং ইয়াবা সেবনের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অবশিষ্ট পদার্থও সন্দেহের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিবেদনটি।
তবে এসব আলামত কে সেখানে রেখেছিল, কখন রেখেছিল বা সেগুলো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, তা প্রমাণের জন্য পরীক্ষাগারভিত্তিক ফরেনসিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
ময়নাতদন্তের একটি তথ্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
চারটি মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে গলার দড়ির দাগের নিচের টিস্যুতে ক্ষত এবং ব্যাপক রক্তক্ষরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে যে ইংরেজি বাক্যটি উদ্ধৃত করা হয়েছে, তার অর্থ দাঁড়ায়, দড়ির দাগের নিচের ত্বকের নিচের টিস্যু ছিঁড়ে গিয়েছিল এবং সেখানে ব্যাপকভাবে রক্ত জমেছিল। আরও বলা হয়েছে, চলমান পানির নিচে ধোয়ার পরও সেই রক্তের দাগ দূর হয়নি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, জীবিত অবস্থায় গলায় শক্তভাবে চাপ প্রয়োগ করা হলে ওই অঞ্চলের রক্তনালি ও টিস্যুতে আঘাত এবং রক্তক্ষরণ হতে পারে। বিপরীতে মৃত্যুর পর গলায় দড়ি বা অন্য কোনো বস্তু বাঁধা হলে একই ধরনের জীবন্ত অবস্থার রক্তক্ষরণের চিহ্ন থাকার কথা নয়।
তবে এই পর্যবেক্ষণের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট ফরেনসিক চিকিৎসক ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।
পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে ফরেনসিক তথ্য মিলছে কি?
এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পুলিশের ঘটনাক্রমের সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্য মেলানো।
যদি পুলিশের দাবি অনুযায়ী আসামিরা হত্যার পরও কিছু সময় বাড়ির ভেতরে অবস্থান করে থাকেন, খাবার খেয়ে থাকেন এবং পরে বের হয়ে যান, তাহলে ওই সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ফরেনসিক আলামত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘরের দরজা-জানালা, আসবাব, বাথরুম, খাবারের পাত্র, পানির উৎসসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, চুল, ত্বকের কোষ বা অন্যান্য জৈবিক আলামত পাওয়া গেছে কি না, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া অভিযুক্তদের পোশাক, শরীর এবং তাঁদের ব্যবহৃত সামগ্রী থেকেও কোনো আলামত পাওয়া গেছে কি না, সেটিও জানা প্রয়োজন।
১৬৪ ধারার জবানবন্দি নিয়েও প্রশ্ন
পুলিশ জানিয়েছে, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বীকারোক্তি বা বক্তব্য রেকর্ড করার বিধান রয়েছে। তবে আদালতে দেওয়া কোনো স্বীকারোক্তি থাকলেও তদন্তে তার সত্যতা ও স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়েছে কি না, তা বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের বিষয়।
একই সঙ্গে জবানবন্দিতে দেওয়া তথ্য ঘটনাস্থলের বস্তুগত আলামত, ময়নাতদন্ত, ডিজিটাল তথ্য ও অন্যান্য সাক্ষ্যের সঙ্গে মেলে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণে শুধু স্বীকারোক্তির ওপর নির্ভর না করে স্বাধীন আলামতের মাধ্যমে পুরো ঘটনাক্রম যাচাই করা প্রয়োজন।
পুলিশ কমিশনারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
তৎকালীন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদের ভূমিকা নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই আসামি গ্রেপ্তারের পর প্রথম সংবাদ ব্রিফিংয়ের সময় মাবুদ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। এরপর কয়েক দিন তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। পরে ২৭ আগস্ট তিনি আবার সংবাদ সম্মেলনে এসে আসামিদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দির বিভিন্ন অংশ তুলে ধরেন।
‘নর্থইস্ট নিউজ’ তাঁর এই ভূমিকার সমালোচনা করে দাবি করেছে, তিনি আসামিদের দোষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে অতিরিক্ত আগ্রহ দেখিয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, মাবুদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এবং তদন্তের আনুষ্ঠানিক নথি ছাড়া কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি পানি দিয়ে ধুয়ে আলামত নষ্টের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। ছবি: সংগৃহীত
পুলিশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা প্রমাণিত?
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই।
একদিকে ময়নাতদন্তের তথ্য, পুলিশের বক্তব্যের পরিবর্তন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সময়ের অসংগতির মতো প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে ডিআইজিসহ পুলিশের কর্মকর্তাদের সরাসরি হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়।
ডিআইজি বা অন্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, এমন প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তাঁদের অবস্থান, ফোনের অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য, সিসিটিভি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, ঘটনাস্থলের আলামত এবং আর্থিক বা অন্যান্য যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করতে হবে।
একইভাবে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগও এসব স্বাধীন আলামতের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
সামনে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি
রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন কয়েকটি প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হত্যাকাণ্ড আসলে কখন ঘটেছিল? রাতের খাবারের কতক্ষণ পর চারজনের মৃত্যু হয়? রাতের ওই সময়ে নিহতদের মোবাইল ফোন কোথায় ছিল? কার সঙ্গে তাঁদের সর্বশেষ যোগাযোগ হয়েছিল? ঘটনাস্থলে কার কার উপস্থিতির প্রমাণ রয়েছে? আসামিদের ডিএনএ বা আঙুলের ছাপ কি ঘটনাস্থলে পাওয়া গেছে? গলায় ব্যবহৃত দড়ি বা কাপড়ের ফরেনসিক পরীক্ষা হয়েছে কি না? ময়নাতদন্তের সব নমুনার পরীক্ষার ফল কী? পুলিশের প্রাথমিক ও পরবর্তী বক্তব্য কেন বদলেছে? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, তদন্তে পুলিশের কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না।
এগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত শুধু পুলিশের বক্তব্য কিংবা কোনো একটি পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ করা কঠিন।
তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতাই এখন মূল বিষয়
রংপুরের এই চার হত্যাকাণ্ড শুধু চারটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, এটি একটি পরিবারের পুরো সদস্যদের হত্যার ঘটনা। ফলে তদন্তে সামান্য অসংগতিও জনমনে বড় প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রও এর আগে পুলিশের বক্তব্যের কয়েকটি অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং কল রেকর্ড, মোবাইল অবস্থান, সিসিটিভি, ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মামলার বিভিন্ন দিক ও আলামত যাচাই করা হচ্ছে।
ফলে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন তদন্তের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিকে স্বাধীন ও বস্তুগত প্রমাণের মাধ্যমে যাচাই করা। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য হলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। আবার অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও প্রমাণের মাধ্যমে পরিষ্কার করা দরকার।
চারজন মানুষের হত্যার মতো গুরুতর ঘটনায় প্রকৃত অপরাধী যে-ই হোক, নির্ভরযোগ্য ফরেনসিক প্রমাণ, স্বচ্ছ তদন্ত এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au