বাংলাদেশ

গেন্ডারিয়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের নেপথ্যে কী?

মাদক কারবারিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া, আধিপত্যের দ্বন্দ্ব নাকি পুরোনো অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা

  • 5:05 am - September 02, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৮৭ বার
গেন্ডারিয়ায় রক্তক্ষয়ী সংঘাত। ছবিঃ সংগৃহীত

রাত পৌনে আটটা। ঢাকার গেন্ডারিয়ার মুন্সিরটেক ও করাতিটোলা এলাকায় হঠাৎ করেই চিৎকার করতে করতে ঢুকে পড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি দল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তাদের অনেকের হাতে ছিল ধারালো দেশীয় অস্ত্র। কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও দেখা যায় বলে দাবি স্থানীয়দের।

অস্ত্রধারীরা এলাকায় ঢুকেই দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চারপাশ যখন অন্ধকারে ডুবে যায়, তখনই শুরু হয় গুলির শব্দ। একের পর এক গুলির শব্দ, চিৎকার, দৌড়াদৌড়ি আর ভাঙচুরে মুহূর্তেই মুন্সিরটেক ও করাতিটোলা এলাকা পরিণত হয় আতঙ্কের জনপদে।

প্রাণ বাঁচাতে ব্যবসায়ীরা দোকানের শাটার নামিয়ে দেন। বাসিন্দারাও যে যেদিকে পারেন নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটতে থাকেন। কিন্তু শাটার নামিয়েও রক্ষা হয়নি এক কিশোরের। বন্ধ দোকানের টিনের শাটার ভেদ করে ছোড়া গুলি এসে লাগে কিশোর সিয়ামের ডান কাঁধে।

শুধু সিয়াম নন, একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আশা নামে এক নারী ও চা-দোকানি আলমগীর। স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেনকেও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে। সংঘর্ষের পর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়।

হঠাৎ কেন এমন রক্তক্ষয়ী সংঘাত?

স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শী, আহত ব্যক্তি এবং পুলিশ সূত্রের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে এই সংঘর্ষের পেছনে তাৎক্ষণিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হলেও এর শিকড় আরও গভীরে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, গেন্ডারিয়ায় মাদক ব্যবসা, অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকার আধিপত্যকে ঘিরে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে।

তবে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন। ফলে স্থানীয়দের বিভিন্ন অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

একটি মাদকবিরোধী অভিযানের পরই উত্তেজনা

ঘটনার দিন গেন্ডারিয়ার করাতিটোলা রেললাইন এলাকা থেকে তিন যুবককে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেন। পুলিশ বলছে, আটক তিনজনের কাছ থেকে ৯৬টি ইয়াবা ও গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে আদালতে পাঠানো হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এই আটকের ঘটনাই এলাকায় নতুন করে উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটায়।

মনিরের অনুসারীরা দাবি করছেন, তিনি এলাকায় মাদকবিরোধী অবস্থান নিয়ে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় একটি অপরাধী চক্র। অন্যদিকে, স্থানীয় আরেকটি পক্ষের অভিযোগ, মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডের আড়ালে এলাকায় রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছিল।

এই দুই বক্তব্যের মাঝেই রয়েছে মূল প্রশ্নটি: তিন মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই কি সংঘর্ষের একমাত্র কারণ, নাকি এর পেছনে রয়েছে গেন্ডারিয়ার মাদক ও অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা?

‘অটো সজল’কে ঘিরে পুরোনো অপরাধচক্র

গেন্ডারিয়ার স্থানীয়দের কাছে ‘অটো সজল’ নামটি নতুন নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসমাইল হোসেন ওরফে অটো সজল দীর্ঘদিন ধরে গেন্ডারিয়া, যাত্রাবাড়ী ও পুরান ঢাকার আশপাশে মাদক ও অস্ত্রকেন্দ্রিক অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে।

গত বছরের ১৯ জুন সজলকে গ্রেপ্তারের পর তার নিয়ন্ত্রণাধীন অপরাধী নেটওয়ার্কে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে বলে স্থানীয়দের দাবি। পরে তার সহযোগী ও স্বজনদের কয়েকজনও গ্রেপ্তার হন।

সজল ও তার ঘনিষ্ঠদের অনেকে কারাগারে যাওয়ার পর এলাকায় তৈরি হয় নেতৃত্বের শূন্যতা। স্থানীয়দের একটি অংশ মনে করছে, সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আর সেই প্রতিযোগিতাই ধীরে ধীরে সংঘাতের দিকে গড়িয়েছে।

তবে সজল কারাগারে থাকার পর তার কথিত চক্র এখনো সক্রিয় কি না, কিংবা বর্তমান সংঘর্ষে তার অনুসারীদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেটি তদন্তের বিষয়।

সজলের বাবা ও চাচাকে মারধরের অভিযোগ

সংঘর্ষের আগে অটো সজলের বাবা আলম ও চাচা কসাই রাসেলকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, মনিরের অনুসারীরা তাদের মারধর করেন।

এরপরই সজলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত একটি পক্ষের সঙ্গে মনিরের সমর্থকদের বিরোধ তীব্র হয় বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

তবে কারা প্রথম হামলা করেছে এবং মারধরের ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

স্থানীয়দের একাংশের দাবি, এই মারধরের ঘটনার পর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে রাতে একটি দল এলাকায় প্রবেশ করে। তারা দোকানপাট বন্ধ করে দেয়, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করে। এরপরই গুলির ঘটনা ঘটে।

অন্ধকার করে হামলা, ভাঙা হয় সিসিটিভি

ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, সংঘর্ষ শুরুর আগে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার দাবি, তাণ্ডব শুরুর ঠিক আগে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর অন্ধকারের মধ্যে হামলাকারীরা এলাকায় ঢুকে পড়ে।

এ সময় কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঘটনাস্থলের একটি সিসিটিভি ফুটেজে ৩০ থেকে ৩৫ জনের মতো যুবককে মুন্সিরটেক এলাকায় প্রবেশ করতে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাদের কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল বলে দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের।

আরেকটি ক্যামেরার ফুটেজে সংঘর্ষের পর কয়েকজনকে দৌড়ে এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে।

যদি তদন্তে প্রমাণ হয় যে সংঘর্ষের আগে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ ও সিসিটিভি অকার্যকর করা হয়েছিল, তাহলে হামলাটি আকস্মিক সংঘর্ষের বদলে পূর্বপরিকল্পিত ছিল কি না, সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

শাটার ভেদ করে কিশোর সিয়ামের শরীরে গুলি

সংঘর্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার সাধারণ মানুষ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১০২ নম্বর ওয়ার্ডের ১১ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন কিশোর সিয়াম। যাত্রাবাড়ীর একটি হোটেলে কাজ করা সিয়াম কয়েক দিন ধরে জ্বরে ভুগছিলেন। রোববার দুপুরে তিনি ফুফু জাহানারা বেগমের বাসায় আসেন।

সন্ধ্যায় তিনি ফুফা কাদিরের চায়ের দোকানে ছিলেন। তখনই হঠাৎ বাইরে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়।

সিয়ামের ভাষ্য, বাইরে লোকজনের চিৎকার শুনে ফুফা দোকান বন্ধ করে দিতে বলেন। তাঁর দুই ফুফাতো ভাই রিমন ও আরমান দ্রুত দোকানের শাটার নামিয়ে দেন। সবাই তখন দোকানের ভেতরে অবস্থান করছিলেন।

এর কিছুক্ষণ পর শাটার ভেদ করে একটি গুলি এসে তাঁর ডান কাঁধে লাগে।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, গুলিটি এখনো তাঁর শরীরে রয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি বের করার প্রস্তুতি চলছে।

সিয়ামের মতো একজন কিশোরের ওপর এভাবে গুলি লাগার ঘটনা দেখিয়ে দেয়, সংঘর্ষটি শুধু দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। অস্ত্রের ব্যবহার ও এলোপাতাড়ি গুলিতে সাধারণ মানুষের জীবনও সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে।

মেয়েকে নিয়ে ফেরার সময় গুলিবিদ্ধ আশা

গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আশা নামের আরেক নারী। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০৩ নম্বর ওয়ার্ডের ৮ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন এই নারী জানান, তাঁর ১২ বছরের মেয়ে জান্নাত আক্তার ইশা মুন্সিরটেক এলাকায় কোচিং করত।

কোচিং শেষে মেয়েকে নিয়ে তিনি ও তাঁর মা ডলি বেগম সায়েদাবাদ রেললাইন এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ চারদিকে চিৎকার ও দৌড়াদৌড়ি শুরু হলে তাঁরা পালানোর চেষ্টা করেন।

ঠিক তখনই আশার ডান কোমরে গুলি লাগে।

আশার ভাষ্য, গুলিটি তাঁর শরীরে না লেগে তাঁর মেয়ের শরীরে লাগতে পারত। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানিয়েছেন, গুলিটি এখনো তাঁর কোমরের ভেতরে রয়েছে। অস্ত্রোপচার করে সেটি বের করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

একটি সংঘর্ষ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে নিরীহ পথচারী ও শিশুদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে, আশার ঘটনা তারই উদাহরণ।

মাথায় গুলিবিদ্ধ চা-দোকানদার

সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছেন চা-দোকানি আলমগীরও। তাঁর কপালের মাঝখানে গুলি লাগে।

আলমগীরের ছোট ভাই আরিফুর রহমান জানান, তাঁর ভাই চা ও সিগারেট বিক্রির পাশাপাশি দিনমজুরের কাজ করেন। সন্ধ্যার পর সংঘর্ষ শুরু হলে একটি গুলি সরাসরি তাঁর ভাইয়ের কপালে লাগে।

পরে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।

একই এলাকায় অল্প সময়ের মধ্যে তিনজন সাধারণ মানুষ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা সংঘর্ষের ভয়াবহতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিএনপি নেতার কার্যালয় ও বাসায় হামলার অভিযোগ

সংঘর্ষের সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেনের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের দাবি, কার্যালয়ের পাশাপাশি মনিরের বড় ভাই শাহাবুদ্দিন ওরফে বুদ্দিনের বাসাতেও হামলা চালানো হয়।

বাড়িটির নিরাপত্তাকর্মী কাশেম জানান, রাত ৮টার দিকে হঠাৎ বাড়ির দিকে ইটপাটকেল ছোড়া শুরু হয়। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে তিনি নিরাপত্তার জন্য ভেতরে চলে যান।

মনিরের কার্যালয় থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে তাঁর ভাইয়ের বাসা হওয়ায় হামলাকারীরা একই এলাকার একাধিক স্থানে হামলা চালিয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

মনিরের দাবি, মাদক কারবারিদের প্রতিশোধ

ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেন বলেন, তিনি নিজ উদ্যোগে তিন মাদক কারবারিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

তাঁর দাবি, এতে এলাকার মাদক সিন্ডিকেট ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এর জেরেই অটো সজলের অনুসারীরা তাঁর কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছে এবং এলাকায় গুলি ছুড়েছে।

মনির আরও দাবি করেন, তিনি অটো সজলের বাবা আলম, ভাগ্নে রবিন ও ইমরানসহ কয়েকজনকে চিনতে পেরেছেন।

তবে ঘটনার সময় তিনি নিজে সেখানে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য স্থানীয়দের বর্ণনার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

অন্য পক্ষের অভিযোগ কী?

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, পুরো ঘটনাকে শুধু মাদকবিরোধী তৎপরতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না।

তাদের অভিযোগ, অটো সজল ও তাঁর সহযোগীরা দীর্ঘদিন এলাকায় যে প্রভাব ধরে রেখেছিলেন, তা ভেঙে পড়ার পর নতুন করে সেই জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে, মনিরের বিরোধীদের অভিযোগ, মাদকবিরোধী তৎপরতার আড়ালে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

অর্থাৎ দুই পক্ষই নিজেদের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। একটি পক্ষ বলছে, তারা মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অন্য পক্ষ বলছে, এটি মূলত আধিপত্যের লড়াই।

এই দুই বক্তব্যের কোনটি সত্য, সেটি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পুলিশি তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দি এবং অস্ত্র ও গুলির উৎস শনাক্ত করা।

সংঘর্ষের ঘটনায় এখন পর্যন্ত যা নিশ্চিত

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তিন যুবককে মাদকসহ আটক করে থানায় দেওয়া হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আদালতে পাঠানো হয়েছে।

এরপরই এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

ঘটনায় অন্তত তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একজন কিশোর, একজন নারী ও একজন চা-দোকানি চিকিৎসাধীন। স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করার অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া বেশ কয়েকটি দোকান, কার্যালয় ও বাসাবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে গোলাগুলিতে ঠিক কতটি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, কারা গুলি চালিয়েছে, কে প্রথম হামলা করেছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সঙ্গে কারা জড়িত, সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

পুলিশের তদন্তে মূল প্রশ্নগুলো

গেন্ডারিয়ার এই সংঘর্ষের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

প্রথমত, তিন মাদক কারবারিকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সঙ্গে হামলার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না।

দ্বিতীয়ত, সজলের কথিত অনুসারীরা হামলায় অংশ নিয়েছিল কি না।

তৃতীয়ত, সংঘর্ষের আগে বিদ্যুৎ সংযোগ কেন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল এবং কারা তা করেছিল।

চতুর্থত, সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো কেন ভাঙা হয়েছিল।

পঞ্চমত, সংঘর্ষে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীদের পরিচয় কী এবং অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে।

ষষ্ঠত, মনিরের পক্ষ থেকেও কোনো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এটি কি তাৎক্ষণিক প্রতিশোধমূলক হামলা, নাকি গেন্ডারিয়ার মাদক ও অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের আধিপত্যের লড়াইয়ের নতুন অধ্যায়?

মামলা না হলে পুলিশের উদ্যোগে মামলা

গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, স্থানীয় বিএনপি নেতা মনির হোসেন তিন মাদক কারবারিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকে ৯৬টি ইয়াবা ও ৩০ থেকে ৩৫ পুরিয়া গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মামলায় তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

গোলাগুলির বিষয়ে ওসি বলেন, তিন মাদক কারবারিকে থানায় নেওয়ার পরপরই এলাকায় গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করার প্রতিক্রিয়াতেই হামলার ঘটনা ঘটতে পারে।

তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ওই তিনজন ছাড়া অন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

মামলার বিষয়ে ওসি বলেন, কোনো পক্ষ এখনো লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ না এলেও পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে বলে তিনি জানান।

আধিপত্যের লড়াই কি আরও বড় সংঘাতের ইঙ্গিত?

গেন্ডারিয়ার সাম্প্রতিক সংঘর্ষকে তাই শুধু একটি রাতের গোলাগুলির ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো চিত্রটি সামনে আসবে না।

একদিকে দীর্ঘদিনের মাদক ও অপরাধচক্রের প্রভাব, অন্যদিকে সেই প্রভাব ভেঙে পড়ার পর তৈরি হওয়া শূন্যস্থান। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, মাদকবিরোধী তৎপরতা, ব্যক্তিগত বিরোধ এবং প্রতিশোধের অভিযোগ।

এই সবকিছু মিলিয়েই পরিস্থিতি বিস্ফোরণমুখী হয়ে উঠেছিল কি না, এখন সেটিই অনুসন্ধানের বিষয়।

সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো, সংঘর্ষের লক্ষ্য যদি সত্যিই দুই পক্ষের আধিপত্যের লড়াই হয়, তাহলে এর শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবেন এলাকার সাধারণ মানুষই। দোকানের শাটার ভেদ করে কিশোরের শরীরে গুলি কিংবা মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় নারীর কোমরে গুলি লাগার ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই সামনে এনেছে।

এই শাখার আরও খবর

দেড় ঘণ্টায় সিদ্ধার্থ-মুগ্ধ আটক, ‘ম্যানুয়েল সোর্স’-এর তথ্যের উৎস কোথায়?

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে, এত অল্প…

মসজিদের ইমামের তালাবদ্ধ কক্ষে বিস্ফোরণ, উড়ে গেল টিনের বেড়া

মাদারীপুর সদর উপজেলার একটি মসজিদের ইমামের তালাবদ্ধ থাকার কক্ষে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরণের বিকট শব্দে মসজিদ এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে কক্ষটির টিনের বেড়া ও…

‘হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন ছয়জন, একজন গণপতি পরিবারের পরিচিত’

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ডে অন্তত ছয়জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হত্যার রাতে পরিবারের পরিচিত…

চলন্ত ট্রেনে নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ, মামলায় দুই পুলিশ সদস্যের নাম

ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামগামী ‘কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস’ আন্তনগর ট্রেনের ক্যান্টিনে চলন্ত অবস্থায় ৪৪ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্যান্টিনের কর্মচারী আবু বক্কর সিদ্দিককে…

স্বর্ণের দোকান থেকে হিন্দু কর্মচারীর নগ্ন মরদেহ উদ্ধার, মুখে বালিশ চাপা

মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার হাসাইল বাজারে একটি স্বর্ণের দোকান থেকে সুমন দে (৪৫) নামে এক কর্মচারীর নগ্ন মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে দোকানের শাটার খুলে…

মোদি-পুতিন বৈঠকের পর ভারতের জন্য রাশিয়ার বড় প্রতিরক্ষা প্রস্তাব

কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে মস্কো। রাশিয়া ভারতকে…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au