ভ্লাদিমির পুতিন ও ভলোদিমির জেলেনস্কি। ছবি : সংগৃহীত
ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সময়ে শান্তি প্রচেষ্টায় নতুন গতি আসার প্রত্যাশা জানিয়েছে ইউক্রেনও। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতের অবসান নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার একটি অর্থনৈতিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে পুতিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ কয়েকটি দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে প্রস্তুত। তবে শেষ পর্যন্ত সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুই দেশকেই সমস্যার সমাধানে পৌঁছাতে হবে।
পুতিন বলেন, যারা শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার চেষ্টা করছেন, তাদের সবার প্রতি রাশিয়া কৃতজ্ঞ। যুদ্ধ বন্ধে কোনো সম্ভাবনা আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার দৃষ্টিতে অবশ্যই সুযোগ রয়েছে।
এদিকে কিয়েভে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের সক্রিয়তা ফিরে আসায় শান্তি প্রচেষ্টায় নতুন গতি আসতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য না করে তিনি সাংবাদিকদের সামনে আসা খবরের দিকে নজর রাখার আহ্বান জানান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত হিসেবে বিবেচিত এই যুদ্ধ সাড়ে চার বছর ধরে চলছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে রাশিয়া ও ইউক্রেনের শীর্ষ পর্যায় থেকে একই সময়ে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য আসা বিরল ঘটনা। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে সর্বশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে ওই আলোচনার পর শান্তি প্রক্রিয়ায় বড় কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের ভূখণ্ডের গভীরে দূরপাল্লার হামলা আরও জোরদার করেছে। বাণিজ্যিক জাহাজ ও সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে হামলার ঘটনাও বেড়েছে। এতে কৃষ্ণসাগরকেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শস্য সরবরাহ ও দামের ওপরও প্রভাব পড়েছে।
পুতিন অবশ্য শান্তিচুক্তির পথে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকে একটি বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বেসামরিক বাণিজ্যিক জাহাজে ইউক্রেনের হামলা এবং বেসামরিক বিমানের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলে এগুলোকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে তুলনা করেন। তার ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে ইউক্রেন রাশিয়ার বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে এবং নিজেদের সামরিক অভিযানকে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বিমান সংস্থা ও বিমা কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনীয় ড্রোনের তৎপরতার কারণে রাশিয়ার আকাশসীমা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, ইউক্রেনের হামলার লক্ষ্য রাশিয়ার সামরিক স্থাপনা এবং কোনো বেসামরিক বিমানকে ঝুঁকির মুখে ফেলা তাদের উদ্দেশ্য নয়।
এর আগে বুধবার ইউক্রেন জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার কাছে রাশিয়ার আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়ে সদস্য দেশগুলোর জন্য সতর্কতা জারির আহ্বান জানায়। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরুর পর থেকেই নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ইউক্রেনের আকাশসীমায় আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
পুতিন আরও জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যোগাযোগ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তার দাবি, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রয়েছে এবং এর বড় একটি অংশ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। তবে ইউক্রেনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যের কারণে এসব যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির দিকে কতটা এগোচ্ছে, তা এখনই বলা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে কিয়েভে ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার পাশে উপস্থিত ছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারত যেকোনোভাবে সহায়তা করতে পারলে পাশে থাকবে।
এর আগে সোমবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, মানবতার স্বার্থে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান প্রয়োজন। যুদ্ধ বন্ধে যেকোনো উদ্যোগকে নয়াদিল্লি সমর্থন করবে বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে পুতিনের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং ইউক্রেনের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ার কথা বলা নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত, ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত মতপার্থক্য এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ফলে শান্তিচুক্তির সম্ভাবনার কথা উঠলেও বাস্তবে তা কত দ্রুত আলোচনার টেবিলে রূপ নেয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সূত্রঃ রয়টার্স