১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর। কোনো গুলি ছোড়া ছাড়াই ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছিল বলে মনে করা হয়। বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) স্বাক্ষর করে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। এর মধ্য দিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটে।
পিসিজেএসএসের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সম্পর্ক ছিল। সংঘাতের সময় ভারত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিসরও দিয়েছিল। ফলে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়িত হলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে স্থিতিশীলতা বাড়ার পাশাপাশি সংবেদনশীল এই সীমান্ত অঞ্চলে নয়াদিল্লির প্রভাবও শক্তিশালী হতে পারত।
কিন্তু প্রায় তিন দশক পর সেই সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শান্তিচুক্তির বড় একটি অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। পিসিজেএসএস দুর্বল হয়েছে, পাহাড়ি রাজনীতি বিভক্ত হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক প্রভাব রয়ে গেছে এবং বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সহযোগিতার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
এ অবস্থায় একটি বিতর্কিত প্রশ্ন সামনে এসেছে, শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগেই কি পাকিস্তান ভারতের সম্ভাব্য এই সাফল্য ঠেকাতে কাজ শুরু করেছিল?
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এটি কোনো প্রমাণিত গোয়েন্দা তথ্য নয়, বরং একটি কৌশলগত তত্ত্ব বা বিশ্লেষণ। প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি যে পাকিস্তানি গোয়েন্দারা শান্তিচুক্তিবিরোধী পাহাড়ি নেতাদের নিয়োগ করেছিল। একইভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভেতরে সুস্পষ্ট ‘ভারতপন্থী’ ও ‘পাকিস্তানপন্থী’ গোষ্ঠী ছিল, এমন দাবিরও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
তবে রাজনৈতিক সম্পর্ক, ঘটনাপ্রবাহ ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের মধ্যে যে যোগসূত্র দেখা যায়, তা আরও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
শান্তির পথ বেছে নিয়েছিল পিসিজেএসএস
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়। পিসিজেএসএস শেষ পর্যন্ত শান্তির পথ বেছে নিয়েছিল।
সংগঠনটির সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করে। যোদ্ধারা বেসামরিক জীবনে ফিরে যায় এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখে। পিসিজেএসএসের নেতৃত্ব মনে করেছিল, আরও একটি প্রজন্মের যুদ্ধের চেয়ে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব।
শান্তিচুক্তিতে পাহাড়ি জেলা পরিষদকে শক্তিশালী করা, আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, শরণার্থীদের পুনর্বাসন এবং অস্থায়ী সামরিক ক্যাম্প প্রত্যাহারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই প্রতিশ্রুতিগুলোর ওপর ভিত্তি করেই পিসিজেএসএস সশস্ত্র সংগ্রাম শেষ করে।
ঝুঁকিটিও ছিল তাদেরই বেশি। রাষ্ট্রের হাতে ছিল সেনাবাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা। বিপরীতে পিসিজেএসএসের প্রধান সম্পদ ছিল সরকারের দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি।
চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা তাই পিসিজেএসএসের শান্তির সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করে না। বরং এটি দেখায়, শান্তিপ্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ভারতের কেন স্বার্থ ছিল শান্তিচুক্তিতে?
পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের সীমান্তবর্তী এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য সংবেদনশীল এলাকার কাছাকাছি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে সীমান্তে সশস্ত্র তৎপরতা, শরণার্থী প্রবাহ ও অস্থিতিশীলতা কমার সম্ভাবনা ছিল।
ভারতের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্বার্থ।
অন্যদিকে পাকিস্তান ভিন্ন হিসাব করতে পারে, এমন একটি তত্ত্ব সামনে এসেছে। পিসিজেএসএস ও আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে সফল সমঝোতা হলে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ একটি পাহাড়ি রাজনৈতিক অংশীদার তৈরি হতে পারত।
সেক্ষেত্রে পাকিস্তানের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করার প্রয়োজন ছিল না। শান্তিপ্রক্রিয়াকে সফল হতে না দেওয়াই যথেষ্ট হতে পারত।ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা ইউপিডিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর, শান্তিচুক্তির এক বছরেরও বেশি সময় পর।
তবে শান্তিচুক্তিবিরোধী রাজনীতি ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠার পর শুরু হয়নি।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই পাহাড়ি ছাত্ররাজনীতিতে বিভাজন তৈরি হয়েছিল। একাংশ পিসিজেএসএস ও শান্তিপ্রক্রিয়াকে সমর্থন করছিল। অন্য অংশ আলোচনার বিরোধিতা করে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলছিল।
এই সময়কালটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর অর্থ হলো, চুক্তি স্বাক্ষরের পর হতাশ হয়ে বিরোধিতা শুরু হয়নি। বরং চুক্তি যখন আলোচনার পর্যায়ে ছিল, তখনই একটি অংশের মধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হচ্ছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চুক্তিবিরোধী তরুণদের উদ্বেগ ছিল অসত্য বা সাজানো। শান্তিচুক্তিতে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না। সংবিধানগত স্বীকৃতি কিংবা ভবিষ্যতের সব ধরনের হুমকি থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার নিশ্চয়তাও এতে ছিল না।
তরুণ নেতারা আন্তরিকভাবেই মনে করতে পারেন যে পিসিজেএসএস পাহাড়িদের অধিকার রক্ষায় যথেষ্ট অর্জন করতে পারেনি।
কিন্তু আন্তরিক অসন্তোষ এবং বাইরের প্রভাব, দুটি বিষয় একই সঙ্গে অস্তিত্বশীল হতে পারে।
পাকিস্তানি প্রভাবের তত্ত্ব কোথায়?
প্রস্তাবিত তত্ত্বটি হলো, পাকিস্তানের কৌশলগত মহল শান্তিচুক্তির সম্ভাব্য ফলাফল আগেই বুঝতে পেরেছিল। তারা হয়তো উপলব্ধি করেছিল, চুক্তি সফল হলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে একটি শক্তিশালী, রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত এবং ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পাহাড়ি অংশীদার তৈরি হতে পারে।
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক মধ্যস্থতাকারী উচ্চাকাঙ্ক্ষী পাহাড়ি তরুণদের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করতে উৎসাহিত করে থাকতে পারেন।
তাদের বোঝানো হয়ে থাকতে পারে, পিসিজেএসএস ‘জুম্ম’ জনগোষ্ঠীর অধিকার বিসর্জন দিচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন একটি আন্দোলনের নেতৃত্বে উঠে আসার সুযোগও তাদের সামনে রাখা হতে পারে।
যদি এমন কিছু ঘটে থাকে, তাহলে বৃহত্তর কৌশল সম্পর্কে মাত্র একটি ছোট নেতৃত্বগোষ্ঠী ও কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর জানাই যথেষ্ট ছিল। সাধারণ কর্মীরা নিজেদের পাহাড়ি অধিকার রক্ষার আন্দোলন হিসেবেই বিষয়টিকে দেখতেন।
এর ফলে একটি স্থায়ী বিভাজন তৈরি হতে পারত।
পিসিজেএসএস অস্ত্র সমর্পণ করলেও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির পরিবর্তে বিভিন্ন পাহাড়ি সংগঠনের মধ্যে সংঘাত বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশও হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ
শান্তিচুক্তির বিরোধিতায় তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলেছিল, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের ঘনিষ্ঠ হিসেবে চিত্রিত করা হয়।
চার বছর পর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি ওই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করেছে, এমন দাবি করা যায় না। তবে চুক্তিটি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল।
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর চুক্তি বাস্তবায়নের গতি আরও কমে যায়।
এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তানের সরাসরি দৃশ্যমান উপস্থিতির প্রয়োজনও ছিল না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনই অনেকটা সেই কাজ করে দিতে পারত।
বদরুদ্দীন উমর ও অন্যান্য রাজনৈতিক যোগসূত্র
বাংলাদেশের মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটের নেতৃত্বে ছিলেন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের নথিতে উল্লেখ আছে, পিসিজেএসএস অভিযোগ করেছিল যে উমরের নেতৃত্বাধীন জোট ইউপিডিএফকে পুরোপুরি সমর্থন করেছিল।
তবে এটি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রমাণ, পাকিস্তানি নিয়োগ বা নির্দেশনার প্রমাণ নয়। প্রকাশ্য সূত্রে ওই জোটের স্থায়ী সদস্যপদ বা বর্তমান নেতৃত্ব নিয়েও স্পষ্ট তথ্য নেই। সময়ের সঙ্গে জোটটি ভেঙে যায় এবং সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন।
এখানে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।
ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সময়কাল
১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার ছিলেন কারাম এলাহি। অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির আলোচনা, স্বাক্ষর এবং ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠার আগের সময়টি তার দায়িত্বকালেই পড়ে।
কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য নথিতে পাওয়া যায় না যে তিনি ভবিষ্যৎ ইউপিডিএফ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন, কোনো অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন বা বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে তার কোনো কার্যকর যোগাযোগ ছিল।
তাই সময়ের মিলকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। এটি কেবল ঘটনাপ্রবাহের একটি প্রেক্ষাপট।
সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ঘিরে প্রশ্ন
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী সংসদ সদস্য ছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন এবং পরে খালেদা জিয়ার সরকারে সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।
ভারতবিরোধী অবস্থানের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। তার বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তানের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী নেতা।
২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায়ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নাম আলোচনায় আসে। অস্ত্রগুলো ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনরত ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) জন্য নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল।
তবে ওই ঘটনায় তাকে বিচার করা হয়নি এবং পরে কয়েকজন আসামি খালাসও পান। ফলে এটিকে তার সঙ্গে পাকিস্তানি কোনো অভিযানের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় না।
একইভাবে বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের সূত্র ধরে রাজনৈতিক সহযোগিতার দাবি করাও যথেষ্ট নয়।
তবে এসব ঘটনা থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায়, শান্তিচুক্তিবিরোধী রাজনীতির বিকাশের সময় বাংলাদেশের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিসরে ভারতবিরোধী অবস্থান সক্রিয় ছিল।
পাহাড়ি বিভাজন কার জন্য সুবিধাজনক?
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। চুক্তি নিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তা ভিন্নমত পোষণ করে থাকতে পারেন।
কেউ হয়তো মনে করেছেন, সমান নাগরিক অধিকার, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী হবে। আবার কেউ হয়তো মনে করেছেন, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাহাড়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
তাই বিষয়টিকে সরলভাবে ‘ভারতপন্থী বনাম পাকিস্তানপন্থী’ সামরিক গোষ্ঠী হিসেবে দেখার পরিবর্তে রাজনৈতিক সমঝোতাপন্থী ও কঠোর নিরাপত্তাপন্থী অবস্থান হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
তবে পাহাড়ি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিভক্তি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে।
পিসিজেএসএস ও ইউপিডিএফের সংঘাত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দাবিকে দুর্বল করে। সশস্ত্র সংঘাত সামরিক ক্যাম্প ও নিরাপত্তা তৎপরতা অব্যাহত রাখার যুক্তি তৈরি করে। বিভক্ত পাহাড়ি সংগঠনগুলো সরকারের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে আলোচনা করতে পারে না।
৮৭ দফা প্রস্তাব এবং ব্যর্থ শান্তি উদ্যোগ
ইউপিডিএফের একটি শান্তি উদ্যোগ এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
২০২২ সালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একটি ৬৬ পৃষ্ঠার প্রস্তাব সরকারের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেন। এতে আটটি অধ্যায়ে মোট ৮৭টি দাবি ছিল।
অর্থাৎ বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করা ‘৮৭ দফা দাবি’ এবং ‘৬৬ পৃষ্ঠার প্রস্তাব’ একই উদ্যোগকে নির্দেশ করে বলে মনে হয়।
ইউপিডিএফের প্রতিনিধিরা বলেছিলেন, ২০১৯ সাল থেকে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। কিন্তু সরকার জানিয়েছিল, তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ওই প্রস্তাব পায়নি।
শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটি আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনায় রূপ নেয়নি।
এটি সেনাবাহিনী শান্তি ঠেকিয়েছে, এমন প্রমাণ নয়। তবে প্রশ্ন ওঠে, একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এমন একটি প্রস্তাব এগিয়ে নিতে পারলে সেটি কেন আনুষ্ঠানিক আলোচনায় পরিণত হলো না?
সরকার, পিসিজেএসএস ও চুক্তিবিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে পাহাড়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতির যৌক্তিকতা কিছুটা কমতে পারে। বিপরীতে বিভাজন অব্যাহত থাকলে সেই যুক্তি টিকে থাকে।
শেখ হাসিনা, সামরিক বাহিনী ও আয়নাঘর
শেখ হাসিনা শান্তিচুক্তি সফল করতে আন্তরিক ছিলেন বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েই তিনি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন এবং পরবর্তী সময়েও এটিকে তার সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরেছেন।
কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা একাই যথেষ্ট ছিল না।
তার সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্যমান সামরিক, আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের সবগুলোকে অতিক্রম করতে পারেনি বা করেনি।
একই সঙ্গে শেখ হাসিনার শাসনামলকে শুধু শান্তিচুক্তির ইতিবাচক ভূমিকার মধ্য দিয়ে মূল্যায়ন করাও যথেষ্ট নয়। তার সরকারের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন, গুম ও গোপন আটককেন্দ্র পরিচালনার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন। জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদবিরোধী আন্দোলনের ফল। এটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ঘটনা বা পাকিস্তানি অভিযান হিসেবে দেখার ভিত্তি নেই।
তবে শেষ পর্যায়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়ে কারফিউ বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা অনিচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। সেনাবাহিনীর সমর্থন সরে যাওয়ার পর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
তার পতন কোনোভাবেই পাকিস্তানি প্রক্সি যুদ্ধের প্রমাণ নয়। তবে এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যায় এবং পাকিস্তানের প্রতি ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলকভাবে সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য নতুন পরিসর তৈরি হয়।
আয়নাঘরের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশ্ন
‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত গোপন আটকব্যবস্থা নিয়ে আলোচনাও এই প্রসঙ্গে আসে।
ইউপিডিএফ সংগঠক মাইকেল চাকমা ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল নিখোঁজ হন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি জীবিত অবস্থায় ফিরে এসে দীর্ঘ সময় গোপন আটকে থাকার কথা জানান।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আজমী এবং আইনজীবী মীর আহমাদ বিন কাসেম, যিনি আরমান নামেও পরিচিত, তারাও দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর মুক্তি পান।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার, মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন সাক্ষ্য এসব আটককেন্দ্রকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এসব ঘটনায় কোন কর্মকর্তা শান্তিচুক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে ছিলেন, তা প্রমাণিত হয় না। তবে ঘটনাগুলো দেখায়, মানুষকে পরিবার ও আদালতের নাগালের বাইরে নিয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময় গোপনে আটকে রাখার মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশে তৈরি হয়েছিল।
মিঠুন চাকমা হত্যাকাণ্ড
ইউপিডিএফের অন্যতম সংগঠক মিঠুন চাকমা ২০১৮ সালের ৩ জানুয়ারি খাগড়াছড়িতে গুলিতে নিহত হন।
ইউপিডিএফ এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সদ্য গঠিত ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক গোষ্ঠীকে দায়ী করেছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন অভিযোগও পাওয়া যায়।
হত্যাকাণ্ডের দায় এখনো বিতর্কিত।
তাই মিঠুন চাকমা পাকিস্তানি সম্পৃক্ততা সম্পর্কে কিছু জানতেন, এমন দাবি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। তবে তার মৃত্যু পাহাড়ি রাজনৈতিক বিভাজন কীভাবে সশস্ত্র ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছিল, তার একটি উদাহরণ।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায়, পূর্ব তিমুর ও ইসরায়েল প্রসঙ্গ
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, হিন্দু এবং বিভিন্ন ঐতিহ্যগত ধর্মবিশ্বাসের অনুসারী রয়েছেন।
তাদের আন্দোলনের মূল বিষয় ছিল ভূমি, পরিচয়, স্বায়ত্তশাসন ও অস্তিত্বের নিরাপত্তা। এটিকে ইসরায়েল বা বৃহত্তর মুসলিম ভূরাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা ঠিক হবে না।
১৯৪৭ সালের পর থেকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি, ভূমি হারানো, সামরিকীকরণ ও সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এসব ঘটনার দায় কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ওপর নয়, বরং নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নীতি ও ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের ওপর বর্তায়।
তবে চুক্তিবিরোধী পাহাড়ি সংগঠনের সঙ্গে খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের অভিযোগও তদন্তের দাবি রাখে।
স্থানীয় খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন বর্ণনায় ২০০০ ও ২০০৬ সালকে বিশেষভাবে কঠিন সময় হিসেবে উল্লেখ করা হয়। গির্জা পোড়ানো বা ভেঙে দেওয়া, ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টানদের ওপর হামলা, সামাজিকভাবে বয়কট এবং তাদের আগের ধর্মে ফিরে যেতে চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ব্রজমোহন পাড়া, তাপিতা পাড়া এবং তারাবন বেথলেহেম চার্চের মতো স্থান এসব বর্ণনায় উঠে আসে।
এসব ঘটনায় ইউপিডিএফের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে সব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
২০১০ সালের ডিসেম্বরেও আন্তর্জাতিক খ্রিষ্টান সংবাদমাধ্যমে খাগড়াছড়ির সাতটি গির্জায় বড়দিনের প্রার্থনা ঠেকানোর অভিযোগ প্রকাশিত হয়। কালাপানি বেথলেহেম চার্চ, ছোট পানছড়ি ব্যাপটিস্ট চার্চ এবং শুকনাছড়ির একটি চার্চের নাম এসব প্রতিবেদনে আসে।
খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বর্ণনায় ২০১৩ সালের ১৩ জুলাই যাজক অরুণ কান্তি চাকমাকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। জাতীয় সংবাদমাধ্যম তার হত্যার খবর নিশ্চিত করলেও হামলাকারীদের পরিচয় চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। স্থানীয় সাক্ষী ও চার্চের নথিতে ইউপিডিএফ সদস্যদের দায়ী করা হয়েছে।
এটি আদালতে প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়, বরং স্থানীয় সাক্ষ্য ও অভিযোগ। তাই বিষয়টি স্বাধীনভাবে তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
এসব ঘটনার কোনোটিই পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়। স্থানীয় ধর্মীয় বিরোধ, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা পাহাড়ি সমাজের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা থেকেও এসব ঘটনা ঘটতে পারে।
পূর্ব তিমুরের উদাহরণ কেন সামনে এসেছিল?
এই সময় পূর্ব তিমুরের উদাহরণও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বিতর্কে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
১৯৭৫ সালে ইন্দোনেশিয়া পূর্ব তিমুর দখল করে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে রায় আসে এবং ২০০২ সালে তিমুর-লেস্তে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
লেখকের ব্যক্তিগত বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময় খাগড়াছড়ি শহর এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন স্থানে পূর্ব তিমুরের প্রসঙ্গসংবলিত সাইনবোর্ড দেখা যেত। সেসবের মাধ্যমে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তর, বিদেশি সংগঠনের তৎপরতা ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনকে পূর্ব তিমুরের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদের সঙ্গে যুক্ত করার বার্তা দেওয়া হতো বলে মনে করা হয়।
এটি ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি, স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ নয়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়, ওই সাইনবোর্ডগুলো কে তৈরি করেছিল, অর্থায়ন করেছিল বা অনুমোদন দিয়েছিল? এমন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কেন খ্রিষ্টান ধর্ম ও আন্তর্জাতিক মনোযোগকে বিচ্ছিন্নতাবাদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল?
প্রশ্নগুলোর নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনো অজানা।
গাজার সঙ্গে পরবর্তী যোগসূত্র
২০১৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ফোরাম খাগড়াছড়িতে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করে।
সংগঠনগুলো ইউপিডিএফের বৃহত্তর রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তবে বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বা গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করা মানেই হামাসকে সমর্থন করা, ইসরায়েলবিরোধী ঘৃণা ছড়ানো বা পাকিস্তানের হয়ে কাজ করা নয়।
প্রশ্নটি বরং অন্য জায়গায়। এটি কি সাধারণ বামপন্থী আন্তর্জাতিক সংহতির প্রকাশ ছিল, নাকি কোনো কোনো নেতা পাহাড়ি আন্দোলনকে পাকিস্তানপন্থী ও ইসরায়েলবিরোধী বৃহত্তর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন?
এ ক্ষেত্রেও সাধারণ কর্মীরা বৃহত্তর কোনো কৌশল সম্পর্কে অবগত ছিলেন, এমন ধারণার ভিত্তি নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাকিস্তানের কাছে ভারত সামরিকভাবে পরাজিত হয়েছিল, এমন কথা বলা যায় না। সেখানে ভারত-পাকিস্তানের কোনো ঘোষিত যুদ্ধও হয়নি।
তবে রাষ্ট্রগুলো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা প্রতিযোগিতাতেও পরাজিত হতে পারে।
ভারত এমন একটি পরিবেশকে সমর্থন করেছিল, যার পরিণতিতে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি সম্ভব হয়েছিল। পিসিজেএসএস আপস মেনে অস্ত্র সমর্পণ করেছিল। নয়াদিল্লি সম্ভবত মনে করেছিল, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থিতিশীলতা আসবে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত নিরাপদ হবে।
কিন্তু বাস্তবে চুক্তি অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।
পিসিজেএসএস দুর্বল হয়েছে। পাহাড়ি রাজনীতি পরস্পরবিরোধী সংগঠনে বিভক্ত হয়েছে। সামরিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা কাঠামো টিকে আছে। একই সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পক্ষে থাকা শক্তিগুলোর প্রভাবও বেড়েছে।
যদি সত্যিই পাকিস্তানের কোনো কৌশলগত মহল এই বিভাজনকে উৎসাহিত করে থাকে, তাহলে তা খুব কম খরচে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের উদাহরণ হতে পারে।
তবে এর জন্য ইউপিডিএফের প্রতিটি কর্মীকে কোনো পরিকল্পনা সম্পর্কে জানার প্রয়োজন ছিল না। একটি ছোট নেতৃত্বগোষ্ঠী বা মধ্যস্থতাকারীই যথেষ্ট হতে পারত।
ভারতের সম্ভাব্য ভুল হতে পারে, তারা শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরকেই কৌশলগত প্রতিযোগিতার সমাপ্তি হিসেবে দেখেছিল। পিসিজেএসএসকে শান্তির পথে আনা হয়েছিল, কিন্তু সেই শান্তিকে টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি।
মক্কা চুক্তি কেন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে?
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাও পার্বত্য চট্টগ্রামের পুরোনো এই তত্ত্বকে নতুন প্রাসঙ্গিকতা দিয়েছে।
বাংলাদেশ এখনো ওই কাঠামোর সদস্য হয়নি। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহের আলোচনা রয়েছে।
বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট কোনো সামরিক কাঠামোয় যুক্ত হয়, তাহলে ভারতের জন্য প্রশ্ন উঠতে পারে, পাকিস্তানি সামরিক বা গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং যৌথ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের কৌশলগত পরিবেশে নতুন কোনো প্রভাব তৈরি হবে কি না।
তবে কোনো চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলেই পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি তৈরি হবে, এমন দাবি করার মতো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই।
তবু ১৯৯৭ সালের পর বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান কতটা বদলেছে, তা বোঝার জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ইউক্রেন নয়। বাংলাদেশও ভারতের সঙ্গে প্রচলিত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে না।
তবে একটি অসম্পূর্ণ শান্তিচুক্তি, বিভক্ত স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠন, সামরিকীকৃত ভূখণ্ড, সীমান্তের কৌশলগত গুরুত্ব এবং একাধিক বৈদেশিক শক্তির স্বার্থ একত্র হলে দীর্ঘমেয়াদে একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাত প্রক্সি প্রতিযোগিতার রূপ নিতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় স্থানীয় জনগণ।
প্রকৃত সত্য হয়তো শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজনই জানেন
প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এখনো প্রমাণ করা যায় না যে পাকিস্তান শান্তিচুক্তিবিরোধী আন্দোলন তৈরি বা পরিচালনা করেছিল। এটাও প্রমাণিত নয় যে এখানে আলোচিত সব রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ একটি সমন্বিত অভিযানের অংশ ছিল।
তবে তত্ত্বটি পুরোপুরি অযৌক্তিকও নয়।
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগেই বিরোধিতা শুরু হয়েছিল। পিসিজেএসএস শান্তির পথ বেছে নেওয়ার পর পাহাড়ি রাজনীতিতে বিভাজন গভীর হয়। সেই বিভাজন চুক্তি বাস্তবায়নের রাজনৈতিক চাপ দুর্বল করে। একই সময়ে শান্তিচুক্তিকে শেখ হাসিনাকে ‘ভারতের এজেন্ট’ হিসেবে চিত্রিত করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থানের জায়গাও তৈরি হয়েছে।
যদি সত্যিই কোনো পাকিস্তানি গোয়েন্দা বা কৌশলগত অভিযান থেকে এসব ঘটনার সূচনা হয়ে থাকে, তাহলে পুরো সত্য হয়তো জানেন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী এবং পাহাড়ি রাজনীতির শুরুতে যুক্ত থাকা অল্প কয়েকজন নেতা।
সাধারণ পাহাড়ি কর্মীদের এমন কোনো পরিকল্পনার জন্য দায়ী করা উচিত নয়, যে পরিকল্পনা সম্পর্কে তারা আদৌ জানতেন না।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কয়েকটি বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
শান্তিচুক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, চুক্তিবিরোধী আন্দোলনের উৎপত্তি ও অর্থায়ন, পাহাড়ি খ্রিষ্টানদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, গুম ও গোপন আটক এবং বিভিন্ন ব্যর্থ শান্তি উদ্যোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া দরকার।
সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সময়ের রাষ্ট্রীয় নথি ও গোপন আর্কাইভ ভবিষ্যতে উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা।
পিসিজেএসএস অস্ত্র সমর্পণ করে শান্তির পথ বেছে নিয়েছিল রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রেখে। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দায় রাষ্ট্রের।
ভারতের জন্যও এখানে শিক্ষা রয়েছে। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সুরক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং চুক্তির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
আর যদি শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয় যে পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি বিভাজনকে উৎসাহিত করেছিল, যার ফলে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তাহলে সেটি ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সবচেয়ে নীরব কৌশলগত সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কারণ সেই যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট সামরিক মানচিত্র ছিল না।
যুদ্ধক্ষেত্রটি লুকিয়ে ছিল একটি অসম্পূর্ণ শান্তিচুক্তির ভেতরে।
সূত্র:টাইমস অব ইসরায়েল