পাবনায় বিএনপি নেতাকে গুলি, মৃত্যু নিশ্চিত করতে কুপিয়ে হত্যা
পাবনার আটঘরিয়ায় আদম আলী (৬০) নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে এবং পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার…
আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬। গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমিয়ে নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনের বহির্মুখী অধিবেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের জন্য দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে।
তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক টানাপোড়েন এখনো সম্পর্কের অন্যতম বড় অস্বস্তির কারণ। এর মধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ করবেন কি না, সেটি নিয়ে কূটনৈতিক মহলে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তারেক রহমানের সফর নিয়ে ভারতের সর্বশেষ বক্তব্য
তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, আর তিনি না গেলে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অন্য কোনো প্রতিনিধি সম্মেলনে অংশ নেবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নয় ভারত সরকার।
শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, এ বিষয়ে তার কাছে নতুন কোনো তথ্য নেই।
ফলে সম্মেলনের মাত্র কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
বাংলাদেশের বক্তব্য কী
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা খুবই কম।
তিনি বলেন, বিদ্যমান নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। দুই দেশের মধ্যে আলোচনার পথ সব সময় খোলা থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার ভাষায়, সময় উপযুক্ত হলে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন। তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের কারণে এর আগে ভারত সফরের সম্ভাবনা খুবই কম।
এই বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা কয়েকটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এসব সাক্ষাৎকারে তিনি তার সম্ভাব্য দেশে ফেরা, নিজের রাজনৈতিক জীবন এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।

শেখ হাসিনার উপস্থিতি ও প্রত্যর্পণ ইস্যুর ছায়ায় ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক—একদিকে নরেন্দ্র মোদি, অন্যদিকে তারেক রহমান; মাঝখানে আটকে আছে দুই দেশের কূটনৈতিক সমীকরণ। ছবি: ওটিএন বাংলা
শেখ হাসিনার এসব বক্তব্য ঢাকায় ভালোভাবে নেওয়া হয়নি। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রকে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময়কে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ কি না জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার বিষয়ে ভারতকে কোনো তথ্য দিয়েছেন বা সহায়তা চেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবেও জয়সওয়াল জানান, তার কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।
এর আগে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। বাংলাদেশ সরকার ওই কর্মসূচির তীব্র প্রতিবাদ জানায়। অন্যদিকে ভারত ওই ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততা থেকে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তৎপরতার প্রেক্ষাপটে ভারতও দেশটিতে বড় ধরনের প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
এদিকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি আরও জোরালো করেছে ঢাকা। ২০১৩ সালের ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ সরকার। এমনকি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলেও ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
সম্প্রতি ‘দ্য হিন্দু’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ভারতে নিজের মতপ্রকাশের অধিকার এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার থাকার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা
শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্কে টানাপোড়েন চলার মধ্যেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন কিছু মাত্রা যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত উদীয়মান ত্রিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-তে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, এ জোটে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেলে ঢাকা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটিকে বৈশ্বিক মুসলিম সম্প্রদায়ের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি উদ্যোগ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও সাম্প্রতিক সময়ে আরও কৌশলগত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশ তাদের ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব আরও উন্নত করার বিষয়ে একমত হয়।
এ সময় দুই দেশ নতুন যুগে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানায়। প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, কৃষি, প্রযুক্তি ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের ব্রিকসে অংশগ্রহণ এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার প্রচেষ্টার প্রতিও চীন সমর্থন জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া চীনের কাছ থেকে জে-১০সিই যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিষয়ে আলোচনাও এগোচ্ছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি চীন হওয়ায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গুরুত্বও ক্রমেই বাড়ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর
ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতি হলে তা ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের শীর্ষ পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
নয়াদিল্লিতে তারেক রহমানের উপস্থিতি বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে। এর মাধ্যমে ঢাকা যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে আগ্রহী, সেই বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে।
অন্যদিকে ভারতের জন্যও এটি বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ। বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে, তখন নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক কোন পথে এগোবে, তা আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানের উপস্থিতি কেবল একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয় নয়। এর সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ, শেখ হাসিনা ইস্যু, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনীতিও জড়িয়ে রয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন, ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে উপস্থিত থাকবেন, নাকি বাংলাদেশ অন্য কোনো প্রতিনিধিকে পাঠাবে। সেই সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয় পক্ষই।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au