বাংলাদেশ

রংপুরের চার খুন: তদন্তের কেন্দ্রে এখন পুলিশ কর্মকর্তা মাবুদ ও সনাতন

  • 11:28 pm - September 07, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৫৩ বার
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ। ছবি : কালবেলা

রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় তদন্তের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর শুধু কে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগমী ও ১২ বছরের ছেলে আয়ুষকে হত্যা করেছে, তা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও গুরুতর একটি প্রশ্ন। ২২ আগস্ট রাতে চারজনের মরদেহ উদ্ধারের পরপরই যে পুলিশি বয়ান সামনে এসেছিল, সেটি কি পূর্ণাঙ্গ আলামত ও ফরেনসিক তথ্য হাতে পাওয়ার আগেই তৈরি হয়েছিল? আর সেই বয়ান তৈরিতে যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের সিদ্ধান্ত, যোগাযোগ ও ভূমিকা কি স্বাধীনভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন?

এই প্রশ্নের কেন্দ্রে উঠে আসছেন তৎকালীন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এবং গোয়েন্দা শাখার উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। এখন পর্যন্ত এসব প্রশ্নের কোনোটিই ওই দুই কর্মকর্তাকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রমাণ করে না। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যায় সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণও এই প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে না। বরং প্রশ্ন হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁদের নেওয়া সিদ্ধান্ত, প্রকাশ্যে দেওয়া বক্তব্য, তদন্তের গতিপথ এবং প্রাপ্ত আলামত বিশ্লেষণের পদ্ধতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন কি না।

কারণ, একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু আসামি গ্রেপ্তার বা একটি সম্ভাব্য মোটিভ দাঁড় করানোর ওপর নির্ভর করে না। পুলিশের প্রাথমিক বয়ান কীভাবে তৈরি হলো, কোন তথ্যের ভিত্তিতে তা তৈরি হলো, পরে সেই বয়ান কেন বদলাল এবং নতুন তথ্যগুলো আগের তত্ত্বকে সমর্থন না করলে সেগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে অনুসরণ করা হয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চার মরদেহ উদ্ধারের পরপরই তদন্তে যে গতি দেখা যায়, সেটিই প্রথম প্রশ্ন তৈরি করেছে।

২২ আগস্ট রাতে রংপুরের মেছুয়াপাড়া এলাকার চক্রবর্তী পরিবারের বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুই তরুণকে আটক করা হয়। পরদিনই তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের একটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরেন।

পুলিশের সেই প্রাথমিক বয়ান অনুযায়ী, সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিলেন। গণপতি তাঁদের দেখে ফেললে বিরোধের সূত্রপাত হয় এবং একপর্যায়ে তাঁকে ও পরিবারের অন্য সদস্যদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, চারজন মানুষকে হত্যার মতো একটি জটিল ঘটনায় এত দ্রুত একটি নির্দিষ্ট মোটিভ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো?

একই পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। মরদেহগুলো উদ্ধারের সময় কয়েক দিন পেরিয়ে গেছে। ঘটনাস্থলে আলামত নষ্ট বা পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ছিল না বলেই জানা যাচ্ছে। হত্যার সুনির্দিষ্ট সময়, হত্যার স্থান, হত্যার ক্রম এবং হত্যায় ব্যবহৃত পদ্ধতি নিয়ে তখনও পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক বিশ্লেষণ শেষ হয়নি।

গণপতির ১৫ লাখ টাকা কোথায় গেল, হত্যার ২২ দিন আগে উত্তোলন।

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে একাধিক সম্ভাবনা খোলা রাখা হয়। কিন্তু রংপুরের এই ঘটনায় শুরুতেই ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট কাহিনি সামনে চলে আসে। পরে অবশ্য সেই বয়ানে পরিবর্তন দেখা যায়।

২৭ আগস্ট রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার হিসেবে শেষ কর্মদিবসে সাংবাদিকদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে মাবুদ হত্যাকাণ্ডের সময় ও স্থান সম্পর্কে আগের তুলনায় ভিন্ন একটি বিবরণ দেন।

পরবর্তী বয়ানে বলা হয়, গণপতি, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা এবং মেয়ে আগমীকে বাড়ির খোলা ছাদে হত্যা করা হয়েছিল। পরে দুই নারীকে সিঁড়ির দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। অন্যদিকে ১২ বছরের আয়ুষ ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ফেলেছিল এবং এরপর তাকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়।

এই পরিবর্তনকে শুধু বক্তব্যের সামান্য সংশোধন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ এতে হত্যার স্থান, হত্যার সম্ভাব্য ক্রম এবং শিশুটিকে হত্যার কারণ সম্পর্কে পুরো চিত্রই বদলে যায়।

প্রথম বয়ানে যেখানে ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে আকস্মিক বিরোধ এবং হত্যার কথা বলা হয়েছিল, পরবর্তী বয়ানে সেখানে হত্যাকাণ্ডের ভিন্ন একটি ক্রম সামনে আসে।

আর এখানেই তদন্তের একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি হয়।

প্রথমে কি কোনো প্রমাণের ভিত্তিতে ইয়াবা তত্ত্ব তৈরি হয়েছিল, নাকি ঘটনাস্থল পুরোপুরি পুনর্গঠন করার আগেই একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যাকে তদন্তের মূল কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল? দুই পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি মাদক পরীক্ষার ফল, ডিএনএ, আঙুলের ছাপ, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, কল রেকর্ড, ঘটনাস্থলের আলামত এবং ময়নাতদন্তের ফল একে অপরকে সমর্থন করে, তাহলে পুলিশের প্রাথমিক তত্ত্ব শক্তিশালী হতে পারে।

কিন্তু যদি এসব বৈজ্ঞানিক ও স্বাধীন প্রমাণ পুলিশের প্রাথমিক বয়ানের সঙ্গে না মেলে, তাহলে সেই বয়ানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়, বরং তদন্তের একটি সম্ভাব্য সূত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মাবুদ নিজেও পরবর্তী সময়ে জানিয়েছিলেন যে দুই অভিযুক্তের ডিএনএ ও মাদক পরীক্ষা করা হবে এবং তাঁদের বক্তব্য ফরেনসিক ও ময়নাতদন্তের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে।

এই বক্তব্যের মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। অর্থাৎ, জনসমক্ষে হত্যার মোটিভ ও ঘটনার একটি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার সময়ও সব ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি।

তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, তদন্তের বৈজ্ঞানিক ফলাফলের আগে পুলিশি বয়ান কতটা নিশ্চিতভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল?

এখানেই শেষ নয়। তদন্তের গতিপথ পরিবর্তন এবং গোয়েন্দা শাখার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

চারজনের মরদেহ উদ্ধারের রাতেই গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। যদিও তখন মামলার তদন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের হাতে ছিল না।

এরপর ২৫ আগস্ট কোতোয়ালি থানার কাছ থেকে মামলাটি গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়। সনাতন চক্রবর্তী জানান, আরও নিবিড় তদন্ত এবং দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার উদ্দেশ্যেই মামলাটি গোয়েন্দা শাখায় দেওয়া হয়েছে। পরে পরিদর্শক মোহাম্মদ জিন্নাত আলীকে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়।

প্রশাসনিকভাবে মামলার তদন্ত অন্য ইউনিটে স্থানান্তর করা স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে। কিন্তু এই মামলায় স্থানান্তরের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, এরই মধ্যে পুলিশের প্রাথমিক বয়ান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পরে বিভিন্ন মহল থেকে তদন্ত নিয়ে সমালোচনাও আসে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে রংপুর সিটি নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে তদন্ত নিয়ে ১৯টি প্রশ্ন তোলা এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানানোর কথা উঠে আসে।

সুতরাং কোতোয়ালি পুলিশ থেকে গোয়েন্দা শাখায় তদন্ত হস্তান্তরকে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলেই পুরো বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার পর একই মহানগর পুলিশের কাঠামোর মধ্যেই তদন্তের পরবর্তী ধাপ পরিচালিত হওয়ায় স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে আসে।

আর সেই পর্যায়ে সনাতন চক্রবর্তী হয়ে ওঠেন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ।

সনাতনের ভূমিকা নিয়েও পৃথকভাবে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। কারণ তিনি শুধু গোয়েন্দা শাখার প্রশাসনিক দায়িত্বে ছিলেন না, তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রকাশ্যেও বক্তব্য দিয়েছেন।

তিনি দাবি করেন, গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তির বক্তব্যের সঙ্গে তাঁদের পরিচিত ব্যক্তি সিদ্ধার্থের বন্ধু সীমান্ত দাস এবং শ্মশানের তত্ত্বাবধায়ক বিদ্যুৎ মহন্তের বক্তব্যের মিল রয়েছে।

আরও এক পর্যায়ে তিনি বলেন, আদালতে দেওয়া বক্তব্যও মূলত মাবুদের আগে দেওয়া বিবরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, যদিও অভিযুক্তরা সেখানে কিছু অতিরিক্ত তথ্য দিয়েছে।

এই জায়গায় তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত প্রশ্ন সামনে আসে।

একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথমে একটি ঘটনার ব্যাখ্যা জনসমক্ষে দিলেন। এরপর একই কাঠামোর মধ্যে তদন্ত করা কর্মকর্তারা অভিযুক্তদের বক্তব্য ও সাক্ষীদের বক্তব্যকে সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তুলে ধরলেন। একই তদন্তকারী কাঠামো আবার সেই তত্ত্বের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্বও পালন করল।

এক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্তকারীর সামনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন থাকবে, তদন্তের মধ্যে কি নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল?

অর্থাৎ, প্রথমে একটি তত্ত্ব তৈরি হওয়ার পর পরবর্তী তথ্যগুলোকে কি সেই তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে, নাকি তত্ত্বটি ভুল হতে পারে ধরে নিয়েও সমান গুরুত্বে বিপরীত প্রমাণ খোঁজা হয়েছে?

এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তথ্যের সঙ্গে পুলিশের প্রকাশ্য বয়ানের কিছু অসামঞ্জস্যের বিষয় সামনে আসে।

পুলিশের পক্ষ থেকে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যার কথা বলা হয়, যা ময়নাতদন্তের তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানা যায়। কিন্তু আঘাতের ধরন এবং যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত কিছু বক্তব্য নিয়েও পরবর্তী সময়ে প্রশ্ন ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ময়নাতদন্তে প্রীতিলতা ও আগমীর ধর্ষণের প্রমাণ না পাওয়ার তথ্যও উঠে আসে।

মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। ছবিঃ সংগৃহীত

এখানে মূল প্রশ্ন কোনো একটি বক্তব্য সত্য না মিথ্যা, তা নয়। প্রশ্ন হলো, তদন্তের শুরুতে পুলিশ যে নির্দিষ্ট বয়ান দিয়েছে, পরবর্তী চিকিৎসা ও ফরেনসিক তথ্যের সঙ্গে সেটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল এবং অসামঞ্জস্য দেখা দিলে তদন্তের দিক কতটা বদলানো হয়েছিল।

একজন পুলিশ কর্মকর্তার পদমর্যাদা যত বেশি, তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যের প্রভাবও তত বেশি। ফলে সব ফরেনসিক তথ্য হাতে পাওয়ার আগেই যদি কোনো কর্মকর্তা হত্যার নির্দিষ্ট স্থান, সময়, মোটিভ ও হত্যার ক্রম জনসমক্ষে তুলে ধরেন, পরবর্তী তদন্তে সেই বক্তব্যের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

এই মামলায় এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পুলিশের নিজেদের ভূমিকার একটি পূর্ণাঙ্গ সময়রেখা তৈরি করা।

  • কখন পুলিশ প্রথম হত্যাকাণ্ডের খবর পায়?
  • কে প্রথম তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মাবুদকে খবর দেন?
  • মাবুদ কখন ঘটনাস্থল সম্পর্কে জানতে পারেন?
  • কখন তিনি ঘটনাস্থলে যান বা ঘটনাস্থলের তথ্য পান?
  • প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কী নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল?
  • সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করার সিদ্ধান্ত কখন নেওয়া হয়?
  • তাঁদের বিরুদ্ধে কোন নির্দিষ্ট আলামত প্রথম পাওয়া যায়?
  • তাঁদের কথিত বক্তব্য জনসমক্ষে প্রকাশের অনুমোদন কে দিয়েছিলেন?
  • সেই সময় পুলিশের হাতে কী কী প্রমাণ ছিল?
  • কোন কোন ফরেনসিক পরীক্ষা তখনও বাকি ছিল?
  • মামলাটি গোয়েন্দা শাখায় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন?

কেন স্বাধীন কোনো তদন্তকারী সংস্থা বা অন্য কোনো কাঠামোর কাছে তদন্ত না দিয়ে একই মহানগর পুলিশের একটি ইউনিটের কাছে তদন্ত হস্তান্তর করা হলো?

এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু মাবুদ বা সনাতনের বিরুদ্ধে নয়, বরং পুরো তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য প্রয়োজন।

আরও একটি বিষয় তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। হত্যাকাণ্ডের আগে চক্রবর্তী পরিবারের কোনো সদস্য পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা বা অন্য কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে কোনো অভিযোগ করেছিলেন কি না, করলে সেই অভিযোগ কে পেয়েছিলেন, কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি জানতেন কি না, তা যাচাই করা দরকার।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কার কার যোগাযোগ ছিল, তাঁদের মোবাইল ফোনে কী তথ্য ছিল, হত্যার আগের কয়েক দিনে তাঁদের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছেন, কারা তাঁদের বাড়িতে গিয়েছেন এবং হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে কোনো হুমকি, বিরোধ, অর্থনৈতিক চাপ বা সামাজিক দ্বন্দ্বের তথ্য ছিল কি না, সেগুলোও সমান গুরুত্বে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।

একইভাবে ১৯ আগস্ট রাত থেকে ২২ আগস্ট রাত পর্যন্ত পুরো সময়রেখা মিনিট ধরে পুনর্গঠন করা দরকার।

বিশেষ করে ১৯ আগস্ট রাত ১১টা ২৬ মিনিটে পরিবারের সদস্য পূজা চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রীতিলতা ও আগমীর প্রায় ৯ মিনিটের হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথন, ২০ আগস্ট রাত ২টা ৪০ মিনিটে প্রীতিলতার নম্বর থেকে আসা কথিত মিসড কল এবং ২২ আগস্ট রাতে পরিবারের বাড়িতে গিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়গুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য, ফোনের অবস্থান, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও পুনঃস্থাপনের সময়, বাড়ির আশপাশের সিসিটিভি, প্রতিবেশীদের বক্তব্য এবং ঘটনাস্থলের বৈজ্ঞানিক আলামত একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সময় ও গতিপথ সম্পর্কে অনেক বেশি নির্ভুল ধারণা পাওয়া সম্ভব।

একইভাবে দুই অভিযুক্তের শরীরে ভুক্তভোগীদের ডিএনএ বা অন্য কোনো জৈবিক আলামত পাওয়া গেছে কি না, তাঁদের পোশাক পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, তাঁদের মোবাইল ফোনের অবস্থান হত্যার সম্ভাব্য সময়ের সঙ্গে মেলে কি না, তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রমাণ কী এবং চারটি হত্যার সঙ্গে তাঁদের প্রত্যেকের সংযোগ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলোও প্রকাশ্যে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

কারণ, চারজন মানুষ নিহত হয়েছেন। ফলে শুধু দুজনকে গ্রেপ্তার করাই তদন্তের শেষ কথা হতে পারে না। বরং প্রত্যেকটি হত্যার সঙ্গে প্রত্যেক অভিযুক্তের সংযোগ আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তদন্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয় তখন, যখন একটি সম্ভাব্য তত্ত্বকে সত্য ধরে নিয়ে পরবর্তী সব তথ্য সেই তত্ত্বের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা শুরু হয়।

এই মামলায় সেই আশঙ্কা আছে কি না, তা এখন স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা দরকার।

মাবুদের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। তিনি যখন রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন, তখনই চারজনের মরদেহ উদ্ধার হয়। তিনি প্রথম দিকের পুলিশি বয়ান প্রকাশ্যে তুলে ধরেন এবং পরে কমিশনার হিসেবে শেষ দিনেও মামলার বিষয়ে বক্তব্য দেন। ২৭ আগস্ট তিনি কমিশনারের দায়িত্ব ছাড়ার দিনই রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেন।

অর্থাৎ, হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সময়ের পুলিশি প্রতিক্রিয়া এবং তদন্তের প্রাথমিক বয়ানের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা একই সময়ে আঞ্চলিক পর্যায়ের আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে চলে যান।

এ কারণে তাঁর ভূমিকা নিয়ে স্বাধীন যাচাইয়ের প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়।

অন্যদিকে সনাতন চক্রবর্তী তদন্তের পরবর্তী ধাপেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। ফলে তাঁর সিদ্ধান্ত, ঘটনাস্থলে উপস্থিতি, তদন্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ, সাক্ষীদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে তদন্তের নথিপত্রের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

এখানে স্বাধীন তদন্তের অর্থ এই নয় যে মাবুদ বা সনাতনকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ধরে নেওয়া হবে। বরং তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ সত্য কি না, সেটিও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।

স্বাধীন তদন্তের দুটি আলাদা স্তর হওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, হত্যাকাণ্ডের আগে বা হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁদের কারও সঙ্গে চক্রবর্তী পরিবারের সদস্যদের, তাঁদের বিরোধী কোনো ব্যক্তি বা সম্ভাব্য অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা।

দ্বিতীয়ত, মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তে তাঁরা কোনোভাবে তাড়াহুড়ো করে কোনো তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন কি না, কোনো আলামত বা তথ্য উপেক্ষা করেছেন কি না, তদন্তের গতিপথ প্রভাবিত করেছেন কি না অথবা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, যা তদন্তের নিরপেক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তা পরীক্ষা করা।

দুটি বিষয়কে এক করে দেখা যাবে না।

প্রথমটি সম্ভাব্য অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার প্রশ্ন। দ্বিতীয়টি প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ ও তদন্ত পরিচালনার প্রশ্ন। দুটিই তদন্তযোগ্য।

এই মামলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুলিশের বয়ান কেন বারবার বদলেছে, তার একটি পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া।

প্রথমে ইয়াবা সেবনকে কেন্দ্র করে হত্যার কথা বলা হলো। পরে জমি, সম্পত্তি, সামাজিক বিরোধসহ অন্য সম্ভাব্য কারণ সামনে এলো। হত্যার স্থান ও ক্রম সম্পর্কেও ভিন্ন বয়ান পাওয়া গেল। কোতোয়ালি থানার কাছ থেকে তদন্ত গেল গোয়েন্দা শাখায়। এর মধ্যেই ফরেনসিক ও ময়নাতদন্তের তথ্য সংগ্রহ চলতে থাকল।

এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনগুলো কি স্বাভাবিক তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি প্রথম দিকে একটি অসম্পূর্ণ তত্ত্ব দাঁড় করানোর কারণে তদন্তকে পরবর্তী সময়ে বারবার সংশোধন করতে হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে শুধু একটি স্বাধীন ও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে।

সেই তদন্তে পুলিশের ওয়্যারলেস বার্তা, কল রেকর্ড, ডিউটি রোস্টার, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কর্মকর্তাদের তালিকা, সিসিটিভি ফুটেজ, জব্দ তালিকা, ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, তদন্ত কর্মকর্তাদের ডায়েরি, আসামিদের জবানবন্দি, সাক্ষীদের বক্তব্য এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

প্রয়োজনে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের বৈধ ফরেনসিক যাচাইও করা উচিত, যদি তদন্তের আইনগত কাঠামোর মধ্যে তার প্রয়োজনীয় ভিত্তি থাকে।

সবচেয়ে বড় কথা, যে প্রমাণ সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে হত্যার সঙ্গে যুক্ত করে, সেটি যেমন খুঁজে বের করতে হবে, তেমনি তাঁদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে এমন আলামত থাকলে সেটিও সমান গুরুত্বে অনুসরণ করতে হবে।

একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মানদণ্ড হওয়া উচিত প্রমাণ কোন দিকে যাচ্ছে, সেটি। তদন্তকারীর আগে থেকে তৈরি ধারণা কোন দিকে যাচ্ছে, সেটি নয়।

রংপুরের চার খুনের তদন্তে এখন তাই মূল প্রশ্ন শুধু সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস চারজনকে হত্যা করেছেন কি না, তা নয়। বরং তাঁদের বিরুদ্ধে থাকা প্রতিটি প্রমাণ কি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে? অন্য কোনো সম্ভাব্য সন্দেহভাজন, মোটিভ বা যোগসূত্র কি সমান গুরুত্বে অনুসন্ধান করা হয়েছে? পুলিশের প্রথম দিকের বয়ান এবং পরবর্তী ফরেনসিক তথ্যের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য থাকলে তা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, তদন্তের শুরুতে যে বয়ান তৈরি হয়েছিল, সেটি কি প্রমাণ থেকে এসেছে, নাকি পরে প্রমাণগুলোকে সেই বয়ানের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা হয়েছে?

যদি মাবুদ ও সনাতনের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নের কোনো ভিত্তি না থাকে, একটি স্বাধীন তদন্তই তাঁদের ভূমিকা পরিষ্কার করতে পারে এবং পুলিশের মূল তদন্তকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

আর যদি তদন্তের কোথাও ভুল, পক্ষপাত, তথ্য গোপন, প্রমাণ উপেক্ষা বা তদন্তের গতিপথ প্রভাবিত করার ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে সেটিও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া বেরিয়ে আসবে না।

চারটি প্রাণহানির এই মামলায় তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন নতুন কোনো তত্ত্ব নয়, বরং পুরোনো তত্ত্বকে প্রমাণ দিয়ে যাচাই করা।

কারণ সত্যিকারের তদন্তের লক্ষ্য হওয়া উচিত কে অপরাধী তা প্রমাণ করা নয়, বরং কী ঘটেছিল তা প্রমাণ করা।

আর সেই প্রমাণ যদি পুলিশের প্রচলিত বয়ানের সঙ্গে মেলে, সেটিও গ্রহণ করতে হবে। যদি না মেলে, তাহলে সেই বয়ানকেই পুনরায় প্রশ্ন করতে হবে।

রংপুরের চার খুনের তদন্তে বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হলে মাবুদ ও সনাতন চক্রবর্তীসহ তদন্তের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত প্রত্যেক কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত, বক্তব্য, যোগাযোগ ও কার্যক্রমও তাই প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীন তদন্তের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

সূত্রঃ নর্থইস্ট নিউজ

এই শাখার আরও খবর

শেখ হাসিনা কি আবারও বাংলাদেশের ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন?

গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হওয়ার দিন, গত ৫ আগস্ট ভারত থেকে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি ঘোষণা করেন, ডিসেম্বরেই বাংলাদেশে ফিরবেন। তাঁর…

‘জিস্‌ম’ করার পর কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে, বিপাশা

২০০১ সালে ‘অজনবী’ সিনেমার মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় বিপাশা বসুর। এরপর ‘রাজ’-এর মতো একাধিক সফল সিনেমায় অভিনয় করে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। তবে ২০০৩…

১২ বছরের নাতনিকে ধর্ষণ, দাদার যাবজ্জীবন

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে প্রতিবেশী দাদা মোক্তার উদ্দিনকে (৫০) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাঁকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা…

শেখ হাসিনার নামে কী কী সম্পদ, ধানমন্ডি ৩২-এর মালিক কে

জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই…

আবারও চালু হতে পারে বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ থাকা মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস চালুর…

ইরান যুদ্ধের উত্তাপ বাড়ছে, রাজনৈতিক চাপ সামলাতে যুদ্ধ শেষের পথ খুঁজছেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে আবারও জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ কীভাবে শেষ করবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্বও যুদ্ধ বন্ধ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au