স্ত্রী ও তিন মেয়েকে হত্যার অভিযোগ, পলাতক বাবা
ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে স্ত্রী ও তিন মেয়েকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ঘুমন্ত অবস্থায় ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে…
নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকায় সনাতনী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, হুমকি, হামলা, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ধর্মীয় স্থাপনা সংক্রান্ত সমস্যা, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং চুরিসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ১৮টি ঘটনা গত আট মাসে পর্যবেক্ষণে এসেছে বলে দাবি করেছে হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ।
শুক্রবার ১১ সেপ্টেম্বর নীলফামারী শহরের কামালমোড় এলাকার কেন্দ্রীয় শ্রী শ্রী শিব মন্দিরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির বাংলাদেশ শাখার আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
সংগঠনটির দাবি, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে নীলফামারী জেলার বিভিন্ন এলাকায় সনাতনী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ১৮টি ঘটনার বর্ণনা তারা সংগ্রহ করেছে।
তবে সংগঠনটির পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, তাদের পর্যবেক্ষণে আসা কোনো অভিযোগকে তদন্তের আগে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। অভিযোগ গ্রহণ, তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই তাদের কাজ। কোনো ঘটনার প্রকৃত সত্য, দায়ী ব্যক্তি এবং ঘটনার উদ্দেশ্য নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত বলে জানিয়েছে তারা।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধ্যায় হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড় ছাড়াও সংগঠনটির বাংলাদেশ অধ্যায়ের সমন্বয়ক আশীষ কুমার অঞ্জন, কক্সবাজারের সমন্বয়ক রানা প্রতাপ দে, রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়ক রমেশ চন্দ্র রায়, নীলফামারী জেলা সমন্বয়ক গণপতি রায় ও প্রভাত রায়সহ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের সমন্বয়ক ও পর্যবেক্ষকেরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বিশেষভাবে ভূমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে দলিল, খতিয়ান, নামজারি, দখল এবং আদালতের আদেশ যথাযথভাবে যাচাই করার দাবি জানানো হয়। একইভাবে কোনো মন্দির বা ধর্মীয় স্থাপনায় ঘটনা ঘটলে সেটি সাধারণ অপরাধ, ব্যক্তিগত বিরোধ নাকি ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে ঘটেছে, তা প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়।
নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো অভিযোগ স্থানীয়ভাবে সালিশের মাধ্যমে ধামাচাপা না দিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করারও দাবি জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলাতেই গত আট মাসে আটটি ঘটনা তাদের নথিতে এসেছে। এর মধ্যে গত ১৮ জানুয়ারি জলঢাকার পশ্চিম বালাগ্রাম ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে দিলীপ চন্দ্র রায়ের পরিবারের সঙ্গে অগ্নিসংযোগ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগের কথা তুলে ধরা হয়।
সংগঠনটির দাবি, ওই ঘটনায় পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় বাইরে থেকে তাদের ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে ঘরের ভেতরে রাখা খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় এবং বুদ্ধাস চন্দ্র রায় গুরুতর আহত হন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টা বলে দাবি করেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
আরেকটি ঘটনায় জলঢাকার ডিমলাবাড়ী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঘুঘুমারি গ্রামের ১৭ বছর বয়সী মিষ্টি রানী দাসের মৃত্যুর বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, একই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র আলমগীর হোসেন রিয়াজের সঙ্গে প্রেমঘটিত বিষয় নিয়ে জানাজানি ও মানসিক চাপের একপর্যায়ে গত ৩০ জুলাই মিষ্টি রানী কীটনাশক পান করে মারা যান।
গত ১২ আগস্ট জলঢাকার মিরগঞ্জ ইউনিয়নের ৩ নম্বর এলাকায় একটি সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা, গাছপালা কেটে ফেলা এবং দেশত্যাগের হুমকির অভিযোগের কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
সংগঠনটির দাবি, বিষয়টি তাদের জানানো হলে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা হয়। প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থলে গেলেও মব বা সংঘবদ্ধ জনতার আতঙ্কের কারণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ করা হয়। পরিস্থিতির কারণে ওই পরিবারের নারী সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন বলেও জানানো হয়।
পরিবারটির পুরুষ সদস্যরা বাড়িতে থাকলেও আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন বলে সংগঠনটির বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। পরিবারের দাবি অনুযায়ী, প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা তাদের তিন শতাংশ জমি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়। বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া জলঢাকা মুক্তিপাড়ায় শতবর্ষী পুরাতন কালী মন্দিরের প্রবেশগেট ও পূর্বের দেয়াল ভেঙে ফেলার অভিযোগের কথাও তুলে ধরা হয়। অভিযোগকারী প্রশান্ত কর্মকারের বক্তব্য অনুযায়ী, কাঁচা রাস্তা পাকা করার টেন্ডার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওই কাজ করা হয়েছে। তবে মন্দিরের নিরাপত্তা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং যথাযথ অনুমতি নিয়ে কাজটি করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
গত ১৬ আগস্ট জলঢাকার গোলমুন্ডা ইউনিয়নের তিলাই গ্রামে দিলমা রায় নামে এক সংখ্যালঘু পরিবারের গৃহবধূকে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগের কথাও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নারী বাড়িতে একা থাকার সময় পাশের বাড়ির কাঁচামাল ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বারের ছেলে জিকরুল হক তার বাড়িতে ঢুকে পানি পান করতে চান। দিলমা পানি এগিয়ে দিতে গেলে জিকরুল তাকে জড়িয়ে ধরে শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন বলে অভিযোগ করা হয়। তার চিৎকারে শাশুড়ি ও প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসেন।
পরবর্তীতে স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হলেও সন্তোষজনক সমাধান না হওয়ায় ১৭ আগস্ট ওই নারী ধর্ষণচেষ্টা ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। বিষয়টি থানায় তদন্তাধীন রয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
এ ছাড়া গত ২৬ আগস্ট রাতে জলঢাকার ডালিয়া রোডের সামনে পাশাপাশি থাকা তিনটি জুয়েলারি দোকানে চুরির অভিযোগের কথাও তুলে ধরা হয়। দোকান তিনটি হলো বৈশাখী চন্দ্র রায়ের ‘বৈশাখ জুয়েলার্স’, পরিমল চন্দ্র রায়ের ‘পল্লবী জুয়েলার্স’ এবং দীপু চন্দ্র রায়ের ‘শিব শংকর জুয়েলার্স’।
সংগঠনটির দাবি, গভীর রাতে চোরের একটি চক্র সুপরিকল্পিতভাবে টিনের চালা কেটে দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে। পরে ড্রয়ার ও লকার ভেঙে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যায়। সব মিলিয়ে প্রায় আট লাখ ৫০ হাজার টাকার মালামাল চুরি হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভূমি দখল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা এবং বিচারহীনতার অভিযোগ বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে পুনরাবৃত্তি হলে এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
সংগঠনটির দাবি, তাদের প্রতিবেদনে উঠে আসা ঘটনাগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এ কমিশনের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, ঘটনাগুলোর পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত করার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অপরাধের অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, মানবাধিকার সবার জন্য এবং ন্যায়বিচারও সবার জন্য নিশ্চিত করতে হবে। উগ্রবাদ ও মব সহিংসতা প্রতিরোধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব উল্লেখ করে সংগঠনটি সরকার, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের যৌথ উদ্যোগে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, নির্যাতনের অভিযোগগুলো তদন্তে নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন, তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন ও আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au