বাংলাদেশ

ব্রিকস সম্মেলনে না গিয়ে বড় কূটনৈতিক সুযোগ হারাল বাংলাদেশ?

  • 7:42 pm - September 11, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২ বার
ব্রিকস বাংলাদেশের অনুপস্থিতিকে ‘হারানো সুযোগ’ বলছেন বিশ্লেষক।

ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশ না নেওয়াকে ‘হারানো সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন ভারতের বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সহযোগী ফেলো প্রবেশ কুমার গুপ্ত। তার মতে, এই সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হলে ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন কমানো, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হতে পারত।

হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে প্রবেশ কুমার গুপ্ত এসব মতামত তুলে ধরেছেন। তার লেখায় বলা হয়েছে, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ‘বিল্ডিং ফর রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কো-অপারেশন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ বা স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নকে প্রতিপাদ্য করে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বর্তমানে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্বে থাকা দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের এ ধরনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে প্রচলিত একটি রীতি। এর পাশাপাশি চলতি বছরের শুরুতে ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আলাদাভাবে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও জানিয়েছিল।

তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের যুক্তি, আমন্ত্রণটি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ সরকারের জন্য নয়, বরং বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ভারতে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর বহুপক্ষীয় কোনো সম্মেলনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে হওয়াই বেশি উপযুক্ত।

প্রবেশ কুমার গুপ্তের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি তাৎক্ষণিক সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। তার মতে, ব্রিকসের মতো বহুপক্ষীয় সম্মেলন দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আনুষ্ঠানিক চাপ ছাড়াই অনানুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময়ের সুযোগ দিতে পারে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্মেলনের পার্শ্ব বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ও আউটরিচ সেশনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ভারতীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় সক্রিয় করার সুযোগ পেত। একই সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি সম্পদ ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো অভিন্ন স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনার পথ তৈরি হতে পারত বলে মনে করেন লেখক।

২০২৪ সালে ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিভিন্ন কারণে চাপে রয়েছে বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাকে ফেরত চাওয়ার বিষয়টি দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগকে আরও জটিল করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনকে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফরের তুলনায় তুলনামূলক কম চাপের একটি কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছেন প্রবেশ কুমার গুপ্ত।

তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বাইরেও বাংলাদেশের জন্য ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার বড় ধরনের কূটনৈতিক সুযোগ ছিল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এবারের সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ ব্রিকসের সদস্য ও অংশীদার বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসেরও সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা ও প্রতিনিধিরা সম্মেলনে অংশ নেবেন। ফলে একই প্ল্যাটফর্মে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের যোগাযোগ তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারত বলে মনে করেন লেখক।

প্রবেশ কুমার গুপ্তের মতে, আউটরিচ সেশন ও বিভিন্ন পার্শ্ব বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জলবায়ু অর্থায়ন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সরবরাহব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেদের স্বার্থ তুলে ধরতে পারত।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, চীন ও রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য। তাই ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিলে এসব দেশের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে একসঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারত বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ব্রিকস বর্তমানে বৈশ্বিক দক্ষিণের উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং বিকল্প উন্নয়ন মডেল নিয়ে আলোচনায় সংগঠনটির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশও বৈশ্বিক দক্ষিণের বিভিন্ন এজেন্ডায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারত বলে মনে করেন প্রবেশ কুমার গুপ্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, টেকসই অবকাঠামো, ডিজিটাল সেবা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো বিষয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও দাবি আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হতো।

বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েও এগোচ্ছে দেশটি। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা ও সহজ অর্থায়নের সুযোগ ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। ফলে নতুন ও বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

লেখকের মতে, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেশটির বহুপক্ষীয় কূটনীতি এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার প্রতি দীর্ঘদিনের অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করতে পারত। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের আরও সক্রিয় ভূমিকার বার্তাও দেওয়া সম্ভব হতো।

তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রথম ভারত সফরকে দ্বিপক্ষীয় সফর হিসেবে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিবেচনা রয়েছে। প্রবেশ কুমার গুপ্তের মতে, বাংলাদেশের এই অবস্থান বোধগম্য হলেও এর ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বর্তমান স্থবিরতা আরও দীর্ঘ হতে পারে।

বিশ্লেষণটির সার্বিক মূল্যায়ন হলো, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় কূটনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ সবসময় একইভাবে ফিরে আসে না। তাই ব্রিকসের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরা, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করা ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এই শাখার আরও খবর

​সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী: পঁচাত্তর-পরবর্তী দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের হাল ধরা এক সাহসী নেত্রী

​বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের মূল্যায়ন শুধু তাঁদের কোনো একটি পদ বা দায়িত্ব দিয়ে করা যায় না। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় তাঁদের ভূমিকা ছড়িয়ে…

ইরান সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে, দাবি নেতানিয়াহুর

ইরানের বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রী সরকার পতনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার দাবি, ইরানে ইসরায়েলের চলমান অভিযানের বেশ কয়েকটি…

রাম বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোক্তা হরিদাস দুই দিনের রিমান্ডে

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রাম বিগ্রহ নির্মাণের উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে ফ্ল্যাট প্রতারণার একটি মামলায় দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে আদালত। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার…

চট্টগ্রামে অনলাইন স্ক্যামিংয়ের সন্দেহে চীন-পাকিস্তানিসহ ৬২ বিদেশি আটক

চট্টগ্রাম নগরের খুলশী এলাকায় অনলাইন স্ক্যামিং চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে চীন, পাকিস্তান ও লাওসসহ বিভিন্ন দেশের ৬২ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার…

অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় বিদেশিদের কাজের সময় নির্ধারণ

অস্ট্রেলিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় থাকা বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে দেশটির সরকার। অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সাবক্লাস ৫০০ শিক্ষার্থী ভিসাধারীরা তাদের কোর্স…

অস্ট্রেলিয়ার হিন্দু সম্প্রদায়কে গণেশোৎসবের শুভেচ্ছা অ্যান্থনি অ্যালবানিজের

গণেশোৎসব উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি উষ্ণ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ। দেশজুড়ে পরিবার ও বিভিন্ন হিন্দু সম্প্রদায় যখন ২০২৬ সালের গণেশোৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au