সৌদির তেল অবকাঠামোয় হামলা, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ল ৩%
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানি একটি কার্গো জাহাজে হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। সোমবার…
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক এলাকায় শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণের সেবামন্দিরে শ্রীশ্রী রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো একটি দ্বিতল ভবন ভেঙে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। মন্দির পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ও সাধারণ সম্পাদক মুকুল চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেবামন্দিরের ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত, যুবরাজ এবং পরিচালনা কমিটির অধিকাংশ সদস্যকে না জানিয়ে এক্সকাভেটর দিয়ে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর সেবামন্দিরের সংস্কারকাজের অংশ হিসেবে নাটমন্দির, লক্ষ্মণ ঘর ও মোহন্তদের বিশ্রামঘর ভাঙার পাশাপাশি রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত পুরোনো ভবনটিও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। ভবনটি ভেঙে ফেলার ঘটনায় ভক্ত ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় প্রবীণ ও ভক্তদের দাবি, ঐতিহাসিক ভবনটিতে শ্রীশ্রী রামঠাকুর ও তাঁর পূর্বপুরুষরা বসবাস করতেন। ভবনের চিলেকোঠায় লক্ষ্মী-নারায়ণ বিগ্রহ ছিল। সেখানেই রামঠাকুর ধ্যান করতেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস রয়েছে। এ কারণে ভবনটি অনেকের কাছে ‘ধ্যানঘর’ হিসেবে পরিচিত ছিল।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক এলাকায় মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীশ্রী রামঠাকুর। তাঁর বাবা শ্রী রাধামাধব চক্রবর্তী ছিলেন সাধক এবং মা শ্রীমতি কমলাদেবী চক্রবর্তী ছিলেন সেবাপরায়ণ নারী। চার ভাইয়ের মধ্যে রামঠাকুর ছিলেন সেজো।
রামঠাকুরের আদিনিবাস ছিল নড়িয়া উপজেলার জপসা ইউনিয়নের কীর্তিনাশা নদীর তীরে। নদীভাঙনের কারণে তাঁর বাবা রাধামাধব চক্রবর্তী শ্বশুরবাড়ি ডিঙ্গামানিক এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
ডিঙ্গামানিক এলাকায় প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে শ্রীশ্রী সত্যনারায়ণের সেবামন্দির। মন্দির প্রাঙ্গণে মূল মন্দিরের পাশাপাশি নাটমন্দির, মহারাজ ভবন, রামঠাকুরের জন্মঘর, দুর্গামণ্ডপ, কালীমাতার মন্দির, কমলামাধব স্মৃতি মন্দির এবং মোহন্তদের স্মৃতিমন্দিরসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে।
এর মধ্যে দুর্গামন্দিরের পাশে থাকা পুরোনো দ্বিতল ভবনটিকে রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করতেন ভক্তরা। প্রবীণদের ভাষ্য, ভবনের চিলেকোঠায় থাকা নারায়ণ বিগ্রহের পূজা করতেন রামঠাকুর এবং সেখানে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় ভবনটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এটি রামঠাকুরের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি।
মন্দির পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ বলরাম দাস বলেন, ভবনটি ঠাকুরবাড়ির একটি ঐতিহ্য ছিল। এটি ভাঙার বিষয়ে তাকেও জানানো হয়নি। এমনকি পরিচালনা কমিটির অধিকাংশ সদস্যও বিষয়টি জানতেন না বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, কমিটির সিদ্ধান্তে ভবনটি ভাঙা হয়নি; সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যক্তিগতভাবে এটি ভেঙেছেন।
কমিটির সদস্য ত্রিনাথ ঘোষ বলেন, ভবনটি ভেঙে ফেলায় তারা অত্যন্ত কষ্ট পেয়েছেন। তাঁর দাবি, এটি রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা ছিল এবং কমিটির অন্য সদস্যদের সিদ্ধান্ত ছাড়াই ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত মোহন্তও বিষয়টি অবগত আছেন বলে জানান তিনি।
রামঠাকুরের আত্মীয় ও স্থানীয় বাসিন্দা শিল্পী রানী চক্রবর্তী বলেন, পুরোনো ভবনটি ছিল ঠাকুরের দাদুর বাড়ি। তাঁর ১০২ বছর বয়সে মারা যাওয়া দিদি শাশুড়ির কাছ থেকে তিনি শুনেছেন, রামঠাকুর বাড়িতে এলে ওই ভবনের চিলেকোঠায় ধ্যান করতেন। এ কারণেই জায়গাটি ধ্যানঘর হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
শিল্পী রানী চক্রবর্তীর দাবি, দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা সেখানে এসে ভবনের সঙ্গে ছবি তুলতেন। অনেকেই এটিকে ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ ও সংস্কারের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছিলেন এবং অনুদান দেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন। তবে হঠাৎ ভবনটি ভেঙে ফেলা হবে, সে বিষয়ে তারা কেউ জানতেন না বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের শরীয়তপুরের আহ্বায়ক বিজন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ভবনটি রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত একটি পুরাকীর্তি। তাঁর দাবি, এটি কমপক্ষে ৪০০ বছরের পুরোনো এবং রামঠাকুরের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হওয়ায় সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা প্রয়োজন ছিল। মোহন্তকে অবগত না করে এটি ভেঙে ফেলা দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে ভবনটি ভেঙে ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করেননি মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুকুল চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। তাই নতুন করে নির্মাণের উদ্দেশ্যে এটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভবনটি চুন-সুরকির গাঁথুনি হওয়ায় মেরামত বা সংস্কারের উপযোগী ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
সহ-সভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেন, ভবনটি গাছপালা ও জঞ্জালে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। ভবিষ্যতে সেখানে উন্নয়নকাজ করার স্বার্থে ভবনটি অপসারণ করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী ভবনটি ভাঙার বিষয়ে মন্দিরের ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত অবগত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য না করে প্রশ্নটি মোহন্তকেই করার কথা বলেন।
এদিকে সেবামন্দিরের ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত ও যুবরাজ শ্রীমৎ সুভাষ চক্রবর্তী বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো ভবনটি ভাঙার বিষয়ে মন্দির পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। পূজার আগে তিনি বাংলাদেশে ঠাকুরবাড়িতে ফিরলে কমিটির সদস্যদের নিয়ে বসে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান।
বিষয়টি নিয়ে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, প্রশাসন সাধারণত ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তির ভবন সংরক্ষণের বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। মন্দির কর্তৃপক্ষ কেন এবং কী উদ্দেশ্যে ভবনটি ভেঙেছে, তা জনগণের সামনে পরিষ্কার করা উচিত। এ বিষয়ে কোনো রেজ্যুলেশন হয়ে থাকলে সেটিও প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাশাপাশি ভবনটি ভাঙার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমিটির কতটা এখতিয়ার ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে জানান জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসক বলেন, এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au