বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন করে সাজাতে চায় বাংলাদেশ।ছবি: সংগৃহীত
ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করছে বাংলাদেশ সরকার। এসব চুক্তিতে কোনো অসামঞ্জস্য বা বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো বিধান রয়েছে কি না, তা যাচাই করাই এই পর্যালোচনার মূল উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেছেন, চুক্তিগুলো বাতিল করার কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং পর্যালোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় পাওয়া গেলে তা সংশোধন বা বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শুক্রবার রাতে টেলিফোনে দেওয়া বক্তব্যে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ভারতের সঙ্গে করা চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখে কোথাও কোনো অসামঞ্জস্য থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো বিদ্যমান চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করবে। কোনো চুক্তিতে অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে তখন ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে সংসদ মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান হুইপ জানিয়েছিলেন, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার। তখন তিনি বলেছিলেন, পর্যালোচনার ফলাফল খুব শিগগির জানানো হবে।
তবে শুক্রবারের বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করেন, এই পর্যালোচনার অর্থ সব চুক্তি বাতিল করা নয়। বরং প্রতিটি চুক্তির বিষয়বস্তু ও বাস্তব প্রয়োগ পরীক্ষা করে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বিধান থাকলে সেটি সংশোধন বা বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বাংলাদেশের সরকার ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। একই সঙ্গে দেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যমান চুক্তি ও সমঝোতার আওতা বেশ বিস্তৃত। এর মধ্যে যোগাযোগ, অবকাঠামো, বন্দর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাত রয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে করা বিভিন্ন ব্যবস্থার আওতায় ভারতের পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর ব্যবহারের বিষয়টি দুই দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের পণ্য পরিবহনের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়।
এই ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে। প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেছিলেন, আগের সরকার এমন কিছু চুক্তি করেছিল যেখানে বন্ধুদেশের জাহাজ বাংলাদেশের জাহাজের তুলনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগ ছিল বলে তিনি মনে করেন। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত পর্যালোচনা ও সরকারি সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ আমদানি এবং সীমান্তবর্তী জ্বালানি সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে অতীতে বিদ্যুৎ আমদানির কিছু অর্থ পরিশোধে বিলম্ব এবং আর্থিক শর্ত পুনর্বিবেচনার দাবি উঠেছে।
অবকাঠামো উন্নয়নেও ভারতের ঋণ ও অর্থায়নের ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভারত বাংলাদেশকে রেল, সড়ক, বন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পে ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি ঋণসুবিধা বা লাইন অব ক্রেডিট দিয়েছে। এসব অর্থায়নে বাস্তবায়িত বা প্রস্তাবিত কয়েকটি প্রকল্প বাংলাদেশের পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনার মধ্যেও রয়েছে।
প্রধান হুইপ এর আগে একটি ভারতীয় ঋণে নির্মিত সড়কের উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, ওই ঋণ সুদসহ বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হচ্ছে, অথচ বাংলাদেশের যানবাহন সেই সড়ক ব্যবহার করতে পারছে না। এ ধরনের ব্যবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন। তবে কোন নির্দিষ্ট চুক্তি বা প্রকল্পের ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আনা হবে, সে বিষয়ে সরকার এখনো বিস্তারিত জানায়নি।
সীমান্ত নিরাপত্তাও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যাতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ছিল। পাশাপাশি সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং জঙ্গি তৎপরতা মোকাবিলায়ও দুই দেশ বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছে।
১০১টি চুক্তি পর্যালোচনার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল শুক্রবার এক নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ভারত এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখেছে, তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এর ফলে ১০১টি চুক্তির পর্যালোচনা নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত যে অবস্থান জানানো হয়েছে, তাতে সব চুক্তি বাতিলের কোনো সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো চুক্তিগুলো আলাদাভাবে পর্যালোচনা করবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় পাওয়া গেলে তা সংশোধনের জন্য ভারতের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, অবকাঠামো প্রকল্প, ঋণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পর্যালোচনার ফলাফল প্রকাশের পর এসব খাতে বিদ্যমান বিভিন্ন ব্যবস্থা ও চুক্তিতে কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, পর্যালোচনার মূল লক্ষ্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়, বরং বিদ্যমান চুক্তিগুলো বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা। অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ পাওয়ার পর তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
সূত্রঃ দ্য ইকোনোমিক টাইমস