ধর্মীয় বিভাজনের আড়ালে শ্রেণিসংগ্রাম
হিন্দু ও মুসলমানকে দুটি পৃথক জাতি হিসেবে উপস্থাপনের আগে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন করা প্রয়োজন: ঔপনিবেশিক বাংলায় বিরোধটি কি প্রকৃত অর্থেই শুধু হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে…
ইতিহাস কখনো হুবহু পুনরাবৃত্তি হয়ে ফিরে আসে না; কখনো তা ফিরে আসে গভীর বিদ্রূপের রূপ নিয়ে। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভারতের ওপর ঢাকার কৌশলগত নির্ভরতা কমিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এখন তাঁর ছেলে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, এক অভূতপূর্ব কৌশলগত পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে—সম্ভাব্য ‘মক্কা চুক্তি’র মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন নিরাপত্তা-সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে।
এখানে প্রজন্মগত এক বিস্ময়কর প্রতিসাম্য লক্ষ করা যায়। জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব সুসংহত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ভারতের প্রভাব থেকে কিছুটা কৌশলগত দূরত্ব তৈরির লক্ষ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। পরিবর্তিত দক্ষিণ এশীয় বাস্তবতায় তাঁর ছেলে এখন সেই বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতিকে একটি আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা-কাঠামোর রূপ দিতে পারেন।
তবে পাকিস্তানের দিকে বাংলাদেশের এই সম্ভাব্য ঝুঁকে পড়ার মধ্যে আরও গভীর এক ঐতিহাসিক বিদ্রূপ রয়েছে—এমনকি কেউ কেউ একে ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখতে পারেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নৃশংসতা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমানও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। অথচ রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনিই ভারতের কাছ থেকে কৌশলগত দূরত্ব তৈরির প্রয়োজনে পাকিস্তানের দিকে আবার হাত বাড়িয়েছিলেন।
তারেক রহমান যদি পাকিস্তানকেন্দ্রিক কোনো নিরাপত্তা-ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই উত্তরাধিকারকে আরও এগিয়ে নেন, তাহলে তাকে নিছক কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হবে। এর সঙ্গে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক জড়িয়ে থাকবে—বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা একজন ব্যক্তির ছেলে এখন সেই পাকিস্তানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, যার কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। একই সঙ্গে এটি সেই প্রতিবেশী ভারতের প্রতিও একটি স্পষ্ট বার্তা, যার সামরিক হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নির্ণায়ক ভূমিকা রেখেছিল।
তারেক রহমান তাঁর মা খালেদা জিয়ার কাছ থেকেও এই কৌশলগত চিন্তার উত্তরাধিকার পেয়েছেন। খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ধারা বরাবরই পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনামূলক উষ্ণ সম্পর্ক, শক্তিশালী ইসলামি পরিচয় এবং আওয়ামী লীগের ভারতকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে বাংলাদেশকে পৃথকভাবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টার সমন্বয় ঘটিয়েছে। এই পারিবারিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের আলোকে ‘মক্কা চুক্তি’ আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে এই চুক্তির তাৎক্ষণিক গুরুত্ব সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের মধ্যে নিহিত থাকার সম্ভাবনা কম। বাংলাদেশ থেকে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের ভৌগোলিক দূরত্ব এবং প্রচলিত সামরিক হস্তক্ষেপের জটিল রসদব্যবস্থা বিবেচনায় এমন কোনো অভিযান বাস্তবে কল্পনা করা কঠিন। তাই চুক্তিটির প্রকৃত মূল্য সামরিক সক্ষমতার চেয়ে এর মাধ্যমে দেওয়া ভূরাজনৈতিক বার্তার মধ্যেই বেশি থাকতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি বোঝাবে যে, নয়াদিল্লির বাইরে ঢাকার সামনে অন্য কৌশলগত বিকল্পও রয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে এটি ভারতকে জানাবে যে, দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাংলাদেশ প্রস্তুত। আর দেশের অভ্যন্তরে তারেক রহমান নিজেকে তাঁর বাবা-মা উভয়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন—একদিকে কথিত ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো জাতীয়তাবাদী নেতা, অন্যদিকে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনঃনিশ্চিতকারী রাষ্ট্রনায়ক।
সুতরাং ‘মক্কা চুক্তি’ সামরিক ঢালের চেয়ে একটি ভূরাজনৈতিক পতাকা হিসেবেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান ও মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের জটিল ঐতিহাসিক সম্পর্কের মধ্যে এটি হবে দেশটির নতুন কৌশলগত অবস্থান ঘোষণার একটি মাধ্যম।
এই চুক্তিতে যুক্ত হলে ভারতের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশ আরও বেশি দর-কষাকষির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ককে নিজের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা-সমীকরণে অন্তর্ভুক্ত করে তারেক রহমান বাংলাদেশের কৌশলগত বিকল্পগুলো বৈচিত্র্যময় করতে পারবেন। এর ফলে ভৌগোলিক অবস্থান ও ভারতের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরতা থেকে সৃষ্ট অসমতাও কিছুটা কমতে পারে।
এর উদ্দেশ্য যে অবশ্যই ভারতবিরোধী জোট গঠন, তা নয়। বরং বাংলাদেশ দেখাতে চাইতে পারে যে ঢাকার সামনে বিকল্প রয়েছে এবং পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও জ্বালানির মতো বিষয়ে বাংলাদেশের সহযোগিতাকে ভারত স্বতঃসিদ্ধ ধরে নিতে পারে না।
এখানে আরেকটি হিসাবও কাজ করতে পারে—ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়লে চীনও ঢাকার প্রতি আরও উদার হতে পারে। এই হিসাবটি ত্রিমুখী। বাংলাদেশ যদি নয়াদিল্লিকে দেখাতে পারে যে তার সামনে অন্য বিকল্প রয়েছে, তাহলে বেইজিং অর্থায়ন, অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে আরও গভীর সম্পর্ক গড়ার সুযোগ দেখতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিযোগিতামূলক অগ্রাধিকার নিয়ে ব্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র যদি অতীতের মতো বাংলাদেশকে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য দেওয়ার অবস্থানে না থাকে, তাহলে এই হিসাব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ হয়তো মনে করছে, ভারত, চীন ও অন্য অংশীদারদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতাই ঢাকার জন্য একটি মূল্যবান কৌশলগত সম্পদ। বৃহৎ শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশ যত বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠবে, তাদের কাছ থেকে তত বেশি সুবিধা ও ছাড় আদায়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
অতএব তারেক রহমানের হিসাবটি হয়তো ভারতকে বাদ দিয়ে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়া কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে চীনকে গ্রহণ করার মতো সরল নয়। বরং বাংলাদেশের সমর্থন ও সহযোগিতা লাভের জন্য প্রতিটি বৃহৎ শক্তিকে আরও বেশি প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য করার মতো একটি ভূরাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করাই হতে পারে এর লক্ষ্য।
সে ক্ষেত্রে ‘মক্কা চুক্তি’ কেবল নয়াদিল্লির বিরুদ্ধে দর-কষাকষির হাতিয়ার হবে না; এটি বেইজিংয়ের প্রতিও একটি প্রণোদনামূলক বার্তা দিতে পারে—বাংলাদেশ অংশীদারত্বে আগ্রহী, তবে সেই অংশীদারত্বের বিনিময়ে বাস্তব সুবিধা প্রত্যাশা করে।
এই উদীয়মান পরিস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই। যে পাকিস্তান একসময় বাংলাদেশের গভীরতম জাতীয় ক্ষতের উৎস ছিল, সেই পাকিস্তানই এখন এমন একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, যার সাহায্যে ঢাকা ১৯৭১ সালে অর্জিত কৌশলগত স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে।
জিয়াউর রহমানের বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির দর্শন এভাবে দ্বিতীয় প্রজন্মের হাতে নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে, যার সঙ্গে যুক্ত হবে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। এর অর্থ অবধারিতভাবে ভারতকে প্রত্যাখ্যান করা নয়; আবার এটি নিছক পাকিস্তানকে আলিঙ্গন করাও নয়। বরং এটি হতে পারে একটি হিসাবি ঘোষণা—বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব তখনই সবচেয়ে নিরাপদ থাকে, যখন কোনো বৃহৎ শক্তি ধরে নিতে পারে না যে ঢাকার সামনে তার বিকল্প কোনো পথ নেই।
তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত ‘মক্কা চুক্তি’কে রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ দিলে, এর গুরুত্ব তুরস্ক, সৌদি আরব বা পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের সহায়তায় এগিয়ে আসার ক্ষীণ সম্ভাবনার মধ্যে থাকবে না। বরং মূল তাৎপর্য থাকবে চুক্তিতে স্বাক্ষরের চারপাশের রাজনৈতিক বার্তায়।
এর মাধ্যমে নয়াদিল্লিকে জানানো হবে যে বাংলাদেশকে আর ভারতের কৌশলগত বলয়ের স্থায়ী অংশ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। বেইজিংকে বোঝানো হবে, ঢাকা আরও গভীর অংশীদারত্বের জন্য প্রস্তুত। ওয়াশিংটনকে সতর্ক করা হবে যে, যুক্তরাষ্ট্র কোনো কৌশলগত পরিসর অবহেলা করলে অন্য শক্তি সেখানে প্রবেশ করবে। আর বাংলাদেশের ভোটারদের কাছে বার্তা যাবে—জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা সার্বভৌমত্ব, মুসলিম সংহতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছেন।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো এটাই হবে—সমষ্টিগত প্রতিরক্ষার নামে প্রস্তাবিত একটি চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সামরিক নিরাপত্তা-ব্যবস্থার চেয়ে কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। অর্থাৎ এটি এমন এক কৌশল, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ভূগোলকে রাজনৈতিক নিয়তির একমাত্র নির্ধারক হতে না দেওয়ার চেষ্টা করবে।
মূল মতামত: ভূপিন্দর সিং। লেখক আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং পুদুচেরির সাবেক লেফটেন্যান্ট গভর্নর। বাংলা ভাষান্তর ও সম্পাদনা: OTN Bangla।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au