বাংলাদেশ

তৃতীয় পর্ব: মতামত | প্রফেসর ড. শ্যামল দাস

হিন্দুত্ববাদের বিকল্প কি জিন্নাহবাদ?

  • 11:00 am - September 21, 2026
  • পঠিত হয়েছে:২২৮ বার
ইতিহাসে জিন্নাহ থাকবেন, বাংলাদেশের নায়ক হয়ে নয়।
বর্তমানে জিন্নাহ কে পুনঃপ্রতিষ্ঠার আরেকটি যুক্তি হচ্ছে, তিনি হিন্দুত্ববাদের বিপরীত প্রতীক। কিন্তু হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্ববাদ এক নয়। হিন্দুধর্ম বহু মত ও দর্শনের ধর্মীয় ঐতিহ্য; হিন্দুত্ববাদ একটি রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ। বিনায়ক দামোদর সাভারকর ভারতীয় জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে হিন্দু সভ্যতাগত পরিচয় স্থাপন করেছিলেন। এই ধারণা মুসলমান, খ্রিষ্টান ও অন্য সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করে।হিন্দুত্ববাদের সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার বিরোধিতা করতে গিয়ে জিন্নাহ কে বাংলাদেশের স্বাভাবিক বন্ধু বানানো বুদ্ধিবৃত্তিক ভুল। হিন্দুত্ববাদ যদি হিন্দু পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতিকে সংজ্ঞায়িত করে, জিন্নাহ র দ্বিজাতিতত্ত্বও মুসলমানকে পৃথক রাজনৈতিক জাতিতে রূপান্তর করেছিল। দুটি মতবাদ অভিন্ন নয়, কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মীয় পরিচয় জাতি নির্মাণের প্রধান উপাদান হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে তাই পছন্দটি হিন্দুত্ববাদ অথবা জিন্নাহবাদ নয়। বিকল্প হলো ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ ও সমান নাগরিকত্ব।জিন্নাহ , ইসলামপন্থা ও “ইসলামিক রিপাবলিক”জিন্নাহ কে মওদুদীর মতো শরিয়াহভিত্তিক ইসলামপন্থী বলা যাবে না। শিক্ষা, আইনচর্চা, পোশাক ও জীবনযাপনে তিনি পাশ্চাত্যঘেঁষা ছিলেন। নিয়মিত ধর্মাচারের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন না। বিভিন্ন জীবনী ও স্মৃতিকথায় তাঁর মদ্যপান ও ইসলামে নিষিদ্ধ খাদ্য গ্রহণের উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব থেকে তাঁকে নাস্তিক বলা ঠিক হবে না। বরং বলা যায়, ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রথাগত ধর্মাচারী ছিলেন না, কিন্তু রাজনীতিতে মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয়কে রাষ্ট্র নির্মাণের প্রধান ভিত্তি করেছিলেন।১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সরকারি নাম “Islamic Republic of Pakistan” ছিল না। দেশটির নাম ছিল Pakistan বা Dominion of Pakistan। জিন্নাহ মারা যান ১৯৪৮ সালে। তাঁর মৃত্যুর পরে, ১৯৪৯ সালের Objectives Resolution-এ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং মুসলমানদের কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে জীবন পরিচালনার নীতি অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে প্রথম দেশটির আনুষ্ঠানিক নাম হয় “Islamic Republic of Pakistan” এবং রাষ্ট্রপতির পদ মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত হয়।

অর্থাৎ জিন্নাহ নিজে “Islamic Republic” নামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেননি। কিন্তু তাঁর ধর্মভিত্তিক মুসলিম জাতীয়তাবাদ পরবর্তী ইসলামিকীকরণের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। ধারাবাহিকতাটি ছিল: মুসলমান পৃথক জাতি, মুসলমানের জন্য পৃথক রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের মুসলিম পরিচয়, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, শেষে ইসলামিক রিপাবলিক। শেষের ধাপগুলো জিন্নাহ সম্পন্ন করেননি, কিন্তু প্রথম দুটি তাঁর নেতৃত্বেই রাষ্ট্রীয় রূপ পেয়েছিল।

এই কাঠামোয় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও অন্যরা কাগজে নাগরিক অধিকার পেলেও রাষ্ট্রের ঘোষিত ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হতে পারেনি। একজন অমুসলিম নাগরিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে যেতে না পারলে তার নাগরিকত্ব আইনত স্বীকৃত হলেও সমমর্যাদার থাকে না।

মওদুদীর চোখে জিন্নাহ র পাকিস্তান

আজ জিন্নাহ , মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে একই আদর্শিক ধারায় রাখা হলেও ইতিহাসে মওদুদী ছিলেন জিন্নাহ’র কঠোর সমালোচক। তিনি মুসলিম লীগকে “জামায়াতে জাহিলিয়াত” বলেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, জিন্নাহ “ইসলামের শাসন” নয়, “মুসলমানের শাসন” প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন।

মওদুদীর মতে, আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র হবে প্রকৃত “পাক-ই-স্তান”; পাশ্চাত্য গণতন্ত্র ও জনপ্রভুত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হলে তা হবে “না-পাকি-স্তান।” জামায়াত ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে অংশ নেয়নি। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওদুদী সেখানে গিয়ে রাষ্ট্রটিকে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রে রূপান্তরের আন্দোলন শুরু করেন।

অতএব জিন্নাহ জামায়াতের স্বাভাবিক আদর্শিক নায়ক ছিলেন না। বরং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে জামায়াত তাঁকে যথেষ্ট ইসলামী মনে করেনি; প্রতিষ্ঠার পরে তাঁর রাষ্ট্রকে নিজেদের ধারণা অনুযায়ী ইসলামিকীকরণ করতে চেয়েছে।

নিজের মেয়েও যে পাকিস্তানে স্থায়ী হলেন না

জিন্নাহ র ব্যক্তিজীবনেও দ্বিজাতিতত্ত্বের সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। তাঁর স্ত্রী রতনবাই পেটিট ছিলেন পারসি পরিবারের মেয়ে। তাঁদের একমাত্র কন্যা দিনা পরে পারসি ব্যবসায়ী নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। জিন্নাহ এতে আপত্তি করেছিলেন, যদিও তিনি নিজেও একজন পারসি নারীকে বিয়ে করেছিলেন।

১৯৪৭ সালে জিন্নাহ পাকিস্তানে গেলেও দিনা সেখানে স্থায়ী হননি। তিনি বোম্বেতে জীবনযাপন করেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তাঁর সন্তান ও পরবর্তী বংশধরেরাও ভারতীয় পরিচয়ের মধ্যেই জীবন গড়েছেন। তবে জিন্নাহ র কোনো আত্মীয় পাকিস্তানে যাননি বলা ঠিক নয়; তাঁর বোন ফাতিমা জিন্নাহ তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন।

দিনার সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের বৈধতা বাতিল করে না, কিন্তু একটি গভীর মানবিক প্রশ্ন তোলে। রাজনৈতিক তত্ত্ব মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ করতে পারে; কিন্তু ভালোবাসা, পরিবার, ভাষা ও বসবাসের বাস্তব জীবন প্রায়ই সেই সীমানা মানে না।

ইতিহাসে জিন্নাহ থাকবেন, বাংলাদেশের নায়ক হয়ে নয়

জিন্নাহ র ছবি ছিঁড়ে ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না। আবার আর্কাইভের নামে তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার নায়ক বানানোও ইতিহাসচর্চা নয়। তাঁর ছবি থাকলে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ, ভাষা আন্দোলনের সূচনা, মওদুদীর বিরোধিতা এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের পরিণতিও দেখাতে হবে। প্রসঙ্গহীন ছবি ইতিহাস নয়; তা রাজনৈতিক প্রতীক নির্মাণ।

জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু গভীরভাবে সমস্যাসংকুল একটি অধ্যায়। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধেই বাঙালি ভাষা আন্দোলন করেছে এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই যদি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণের “প্রতিশ্রুতি” হয়, তবে তার প্রতীক খুঁজতে হবে ভাষাশহীদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং নাগরিক অধিকারের সংগ্রামের মধ্যে। ১৯৪৮ সালে বাঙালির ভাষার সমমর্যাদা প্রত্যাখ্যান করা নেতার মধ্যে নয়।

প্রশ্নটি তাই শুধু ডাকসু আর্কাইভে জিন্নাহ’র ছবি থাকবে কি থাকবে না, সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা বাংলাদেশকে কোন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখতে চাই: দ্বিজাতিতত্ত্বের পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার ইতিহাসে, নাকি ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, নাগরিক সাম্য ও বহুত্ববাদের ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ইতিহাসে? আজকের বাংলাদেশকে যদি সত্যিই নতুন হতে হয়, তাকে পুরোনো পাকিস্তানের ছায়ায় নয়, নিজের ইতিহাসের আলোয় দাঁড়াতে হবে।

এই শাখার আরও খবর

শরীয়তপুরের কলেজের কনসার্টে শেখ হাসিনা ও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান

শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার সরকারি শামসুর রহমান কলেজে নবীনবরণ উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার…

বিএনপির কর্মসূচিতে বেজে উঠল শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা গান

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত প্রচারণা কর্মসূচিতে মাইকে বেজে উঠেছে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা গান ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা…

শেখ মুজিবকে ‘জাতির পিতা’ সম্বোধন, বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সভায় দুই দফা হট্টগোল

জয়পুরহাটে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের আয়োজিত আলোচনা সভায় ব্যানারে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছবি না থাকাকে কেন্দ্র করে হট্টগোল হয়েছে। পরে…

বাংলাদেশ-পাকিস্তান থেকে যাওয়া সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দিতে তোড়জোড় পশ্চিমবঙ্গে

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন…

শেখ হাসিনার নিরাপত্তার উদ্যোগ নিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ৬ এমপির চিঠি

বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকরণ বন্ধ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার আগে তাঁর আইনি ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাজ্যের…

৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ হুজুরের, গ্রেপ্তারের পর কারাগারে

ওটিএন বাংলা ডেস্ক :  নরসিংদীর মনোহরদীতে মক্তবে আরবি পড়তে গিয়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে আট বছর বয়সী এক শিশুশিক্ষার্থী। শিশুটিকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে মক্তবের শিক্ষক…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au