নাগরিকত্ব সংশোধন আইনে বাংলাদেশি হিন্দু শরণার্থীদের সনদ দেওয়ার আশ্বাস শুভেন্দুর।ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার ঘোষণা দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ-এর আওতায় আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব যোগ্য আবেদন নিষ্পত্তি করে নাগরিকত্বের সনদ দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তাঁর সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, রাজ্যের নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নদিয়া জেলার আরংঘাটায় একটি কালীপূজার মণ্ডপ উদ্বোধন করতে গিয়ে এ ঘোষণা দেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, সিএএ-এর আওতায় জমা পড়া সব যোগ্য আবেদন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হবে। কোনো যোগ্য আবেদনকারী যাতে বাদ না পড়েন, সে বিষয়েও প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা আবেদনগুলোর নথি যাচাই ও শুনানি দ্রুত সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
শুভেন্দু অধিকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলার জেলাশাসকদের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকা অনুসারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মহকুমাশাসকদের তত্ত্বাবধানে আবেদনকারীদের নথি যাচাই এবং শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে ১ নভেম্বর উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মতুয়া গোঁসাই সম্মেলনে একই সময়সীমার কথা জানিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে সিএএ-এর আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার মানুষ নাগরিকত্বের সনদ পেয়েছেন। বাকি যোগ্য আবেদনকারীদের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
সিএএ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া মতুয়া সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর কাছে নাগরিকত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকায় মতুয়া সম্প্রদায়ের বসবাস। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ভারতে স্থায়ী নাগরিকত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। ফলে এই দুই জেলায় বিপুলসংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তির ঘোষণা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সংসদে সিএএ পাস হয়। এই আইনে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আশ্রয় নেওয়া হিন্দু, মুসলিম নন এমন ছয়টি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সম্প্রদায়গুলো হলো হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিষ্টান। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁদের ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে ভারতে প্রবেশ করতে হয়েছে এবং আইনে নির্ধারিত অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে।
আইনটি পাসের চার বছরের বেশি সময় পর ২০২৪ সালের মার্চে এর বাস্তবায়ন বিধি প্রকাশ করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এরপর থেকে সিএএ-এর আওতায় নাগরিকত্বের আবেদন গ্রহণ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়।
তবে আবেদন জমা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব পাওয়া যাবে না। আবেদনকারীর ধর্মীয় পরিচয়, ভারতে প্রবেশের সময় এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আইনে নির্ধারিত শর্ত যাচাই করা হবে। শুনানি ও যাচাই শেষে যাঁরা যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, তাঁরাই নাগরিকত্বের সনদ পাবেন। অর্থাৎ শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষিত সময়সীমার অর্থ সব আবেদনকারীর নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা নয়, বরং সব যোগ্য আবেদনের নিষ্পত্তি করা।
৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আড়াই লাখ আবেদন নিষ্পত্তির এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে এখন জেলা প্রশাসনের সক্ষমতা, নথি যাচাই এবং শুনানি প্রক্রিয়ার গতিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতজন আবেদনকারী নাগরিকত্বের সনদ পান, তা নিয়ে নজর থাকবে মতুয়া সম্প্রদায়সহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠীর।
সূত্রঃ দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস