বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকরণ বন্ধ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার আগে তাঁর আইনি ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন দেশটির ছয় আইনপ্রণেতা। চিঠিতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি এবং আটক অবস্থায় নির্যাতন বা গুমের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
সম্প্রতি পাঠানো ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য বব ব্ল্যাকম্যান, সাবেক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য চার্লস ট্যানকক এবং স্কটিশ পার্লামেন্টের চার সদস্য মার্টিন ডে, পল ম্যাকলেনান, অ্যালান ব্রাউন ও সিমাস লোগান।
চিঠিতে আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবে সেই বিচারপ্রক্রিয়া যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিচালিত বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন চিঠির স্বাক্ষরকারীরা।
আইনপ্রণেতারা তাঁদের চিঠিতে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, শেখ হাসিনার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উত্থাপিত প্রশ্নগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্বিচারে গ্রেপ্তার বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রাইব্যুনালের আইনি কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠিতে চারটি বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
প্রথমত, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না, সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে লিখিত নিশ্চয়তা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আটক অবস্থায় তাঁর ওপর নির্যাতন, গুম বা অন্য কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা যেন নিজের পছন্দের আইনজীবীদের মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ পর্যালোচনার আহ্বানও জানিয়েছেন চিঠির স্বাক্ষরকারীরা।
তৃতীয়ত, জাতিসংঘ অথবা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) সহায়তায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ থাকলে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে আস্থা তৈরিতে সহায়তা হতে পারে।
চতুর্থত, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপের পরিবেশ তৈরিতে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
চিঠির শেষাংশে ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনকে বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে চিঠি পাঠানোর দিন থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে যুক্তরাজ্য সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, তা লিখিতভাবে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন আইনপ্রণেতারা।
তবে ছয় আইনপ্রণেতার চিঠিতে উত্থাপিত উদ্বেগ ও প্রস্তাবগুলো তাঁদের নিজস্ব অবস্থান হিসেবে বিবেচ্য। এগুলো যুক্তরাজ্য সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা অবস্থান নয়। চিঠির বিষয়ে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কি না, তা উল্লেখ করা হয়নি।
চিঠিটি এমন এক সময়ে দেওয়া হলো, যখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া, তাঁর সম্ভাব্য দেশে ফেরা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনায় রয়েছে। আইনপ্রণেতাদের এই উদ্যোগের ফলে বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক অবস্থান কী হয়, সেদিকে নজর থাকবে।