বাংলাদেশের জার্সিতে অভিষেকের অপেক্ষায় ফারহান আলী
বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলে প্রথমবার ডাক পেয়েই দেশের মানুষের ভালোবাসায় অভিভূত ১৯ বছর বয়সী ফারহান আলী ওয়াহিদ। ইংল্যান্ডে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই তরুণ উইঙ্গারের…
দেশে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নতুন করে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এ বছর বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ শিশুদের কারও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে নদী থেকে, কারও পাওয়া গেছে মাটিচাপা অবস্থায়।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় নিহত ১৫৫ শিশুর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু হয়েছে ৬৮ জনের। পারিবারিক পরিসরে নির্যাতনে নিহত হয়েছে ৪৯ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৬ শিশুকে, যার মধ্যে দুইজন ছেলে শিশু। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার পর চারজন, গুলিতে তিনজন, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করা দুই শিশু শারীরিক নির্যাতনে এবং উত্ত্যক্তকারীর হাতে দুই শিশু নিহত হয়েছে। অপহরণের পরও একজন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এসব পরিসংখ্যান তৈরি করেছে আসক।
সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। পাবনা সদরে ১০ বছর বয়সী একটি শিশু ৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হওয়ার সাত দিন পর ১৬ সেপ্টেম্বর একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরপর জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছর বয়সী একটি শিশু ১০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি। ১২ সেপ্টেম্বর তার এক সহপাঠীর বাড়ির মেঝেতে মাটিচাপা অবস্থায় শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশের দাবি, সহপাঠীর বাবা শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছেন। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে হত্যার শিকার হয়েছে আরও কয়েক শিশু। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ২৫ জুন একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে এক পরিবারের মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত তিন মেয়ের মধ্যে সিপার বয়স ছিল ১০ বছর, ইকরা ১৭ এবং সাইমা আক্তার ২১ বছর।
আগস্টে রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশও হত্যার শিকার হয়। একই মাসে মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর ২৪ আগস্ট নদী থেকে তার এক বছর বয়সী সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। সর্বশেষ সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে একই পরিবারের ১০, ৭ ও ২ বছর বয়সী তিন শিশুকে হত্যা করা হয়।
শিশুদের বাইরে দেশে হত্যার ঘটনাও কম নয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে দেশে ২ হাজার ৩৬২টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ২৯৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
শিশুহত্যার পাশাপাশি নিখোঁজের সংখ্যাও উদ্বেগ তৈরি করছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু, যা মোট নিখোঁজের প্রায় ১৩ শতাংশ।
পুলিশের যাচাই অনুযায়ী, শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ৪৭৪টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০৬ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৬৮ জন এখনও উদ্ধার হয়নি। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোর নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জনকে উদ্ধার করা হলেও ১ হাজার ৯৭০ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ছোট শিশুরা সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অপরিচিত জায়গায় গিয়ে পথ হারিয়ে, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় কিংবা একা বাড়ি ফেরার সময় অন্যত্র চলে গিয়ে নিখোঁজ হয়। আর ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে অভিমান, পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক কলহ, স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা, অর্থ বা অন্য সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা এবং বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ পাওয়া গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শিশু নিখোঁজের ১৭ হাজার ৮০৮টি জিডি হয়েছিল। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৪১৪ এবং ২০২৫ সালে ২২ হাজার ৫৫০।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, শিশু নিখোঁজ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নতুন নয়। শিশু বলতে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকে বোঝানো হয়। অপহরণ, ধর্ষণ, কিশোর-কিশোরীদের প্রেমের কারণে পালিয়ে যাওয়া, বাবা-মায়ের সঙ্গে অভিমানসহ বিভিন্ন কারণে শিশুরা নিখোঁজ হতে পারে।
তিনি বলেন, নিখোঁজের সংখ্যা বড় হলে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আগে নিখোঁজের জিডি হওয়ার পর উদ্ধার হওয়া শিশুদের তথ্য নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করা হতো না। এখন সেই তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জিডির সঙ্গে শিশুর ছবি সংগ্রহ, নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত তদন্ত, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং উদ্ধার হওয়া শিশুদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশুদের পরিবারকে আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপত্তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
শিশুদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে ২২ মে বিবৃতি দিয়েছিল ইউনিসেফ। সংস্থাটির তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স শিশুদের ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের প্রতিটি পরিসরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা, শিশুবান্ধব পুলিশ ও বিচারপ্রক্রিয়া, স্থানীয় পর্যায়ে সুরক্ষা এবং মানসিক-সামাজিক সহায়তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, সমাজে নারী ও শিশুরা তুলনামূলকভাবে বেশি দুর্বল ও অসহায়। বিশেষ করে শিশুরা অনেক সময় নির্যাতনের বিষয়টি বুঝতে বা প্রতিবাদ করতে পারে না। ফলে তাদের ওপর দীর্ঘদিন নির্যাতন চললেও অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না।
তার মতে, এসব ঘটনায় রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত, বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া এবং ভুক্তভোগীর দিক থেকে বিষয়টি দেখার মানসিকতা গড়ে তোলাও জরুরি।
সুলতানা কামাল আরও বলেন, মানবাধিকার ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চার ঘাটতি, মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি অশ্রদ্ধা এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব এসব ঘটনায় রয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au