কেরানীগঞ্জে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ভাইকে গুলি, ২৫ ভরি সোনা লুট
ঢাকার কেরানীগঞ্জে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও তাঁর ফুফাতো ভাইকে গুলি করে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে…
ঢাকার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বারবার মাথা নিচু করে থাকলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম। মামলার শুনানি শুরুর পর তাঁকে কয়েকবার কান্না করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে নজরুল নিজেই স্ত্রীকে কান্না করতে নিষেধ করেন। দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় সোমবার তাঁদের আদালতে হাজির করা হলে এমন দৃশ্য দেখা যায়।
পুলিশের করা সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালত গাজী নজরুলের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সোমবার বেলা ৩টা ৬ মিনিটের দিকে কঠোর নিরাপত্তায় আদালতের হাজতখানা থেকে গাজী নজরুল ও মাকছুদা ইসলামকে বের করা হয়। তাঁদের হাতে হাতকড়া ছিল না। তবে দুজনের মাথায় হেলমেট এবং বুকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো ছিল। নজরুলের মুখে মাস্ক ছিল এবং বাঁ হাতে ছিল সোনালি রঙের ঘড়ি।
পুলিশের নিরাপত্তায় সিঁড়ি দিয়ে তাঁদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের পঞ্চম তলায় ৮ নম্বর আদালতের কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। বেলা ৩টা ১২ মিনিটের দিকে পুলিশ তাঁদের মাথার হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট খুলে দেয়। তখন বিচারক এজলাসে ছিলেন না। এ সময় গাজী নজরুল তাঁর আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেন।
বেলা ৩টা ১৪ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসেন। উপস্থিত সবাইকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে এক মিনিট পর শুনানি শুরু করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষ মামলার নম্বর উল্লেখ করে আসামি হিসেবে ৭৫ বছর বয়সী গাজী নজরুল ইসলাম ও ৬৫ বছর বয়সী মাকছুদা ইসলামের নাম ঘোষণা করলে নজরুল মাথা নিচু করে ফেলেন। তখন তাঁর পেছনে কিছুটা সরে গিয়ে মাকছুদাকে কাঁদতে দেখা যায়। শুনানির বড় একটি অংশজুড়েই নজরুল মাথা নিচু করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাকছুদাও প্রায় নিশ্চুপ ছিলেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শেরেবাংলা নগর থানার এসআই শামসুজ্জোহা সরকার আদালতে গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।
রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মরিয়ম খাতুন যখন ফাঁস দিয়ে মারা যান, তখন নজরুল ও মাকছুদা একই বাসায় ছিলেন। আত্মহত্যার ঘটনায় তাঁদের কোনো প্রভাব বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা জানার জন্য জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। এ কারণে তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া জরুরি বলে আদালতের কাছে আবেদন করেন তিনি।
তবে রিমান্ডের বিরোধিতা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান। তিনি দুই আসামির জামিনও চান।
আইনজীবী আদালতকে বলেন, গাজী নজরুল একজন সংসদ সদস্য এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি চারবারের সংসদ সদস্য এবং তাঁর বয়স ৭৫ বছর। তাঁর স্ত্রী মাকছুদাও ৬৫ বছর বয়সী। তাঁদের দুজনেরই বয়স বিবেচনায় নেওয়া উচিত। মামলাটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা হলেও এর সঙ্গে তাঁদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
আইনজীবী আরও বলেন, গাজী নজরুল তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে ভালোবাসতেন এবং ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তদন্ত কর্মকর্তাকে তাঁরা সহযোগিতা করবেন। তাই তাঁদের রিমান্ডে নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। রিমান্ড আবেদন বাতিল করে জামিন দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, গাজী নজরুল মরিয়মকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং বিয়ের পর তাঁকে প্রথম স্ত্রী মাকছুদার সঙ্গে মিলে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, মরিয়মকে বিভিন্ন হোটেল-মোটেলে নিয়ে যাওয়া হতো এবং পরে বিয়ের পর তাঁর ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। মৃত্যুর আগে মরিয়মের লেখা একটি চিরকুটে এসব বিষয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মরিয়ম আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারেন। ফলে ঘটনাটিকে শুধু আত্মহত্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও আদালতে যুক্তি দেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী।
শুনানির একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মামলার প্রসঙ্গে রাজনৈতিক মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘ওনারা জামায়াত ইসলাম করে। এটা হচ্ছে তার নমুনা।’
তখন বিচারক তাঁকে থামিয়ে বলেন, ‘আমরা এই মামলার প্রসঙ্গে থাকি। রাজনীতিতে না যাই।’
এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, তিনি মূলত আসামিদের কথিত নৈতিক অবস্থান ও মামলার অভিযোগের মধ্যে যে বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছেন, সেটিই বলছিলেন। তবে বিচারক মামলাটিকে রাজনৈতিক প্রসঙ্গের বাইরে রেখে কেবল অভিযোগ ও তদন্তের বিষয়েই শুনানি চালিয়ে যান। শুনানিতে রাজনৈতিক বক্তব্যকে এভাবে সীমিত রাখার বিষয়টি আদালতের কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হয়ে ওঠে।
এ সময় কাঠগড়ায় থাকা গাজী নজরুল সামান্য মাথা তুলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর দিকে তাকান। পরে আবার মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন। স্ত্রী মাকছুদা তখনও কান্না করছিলেন। নজরুল তাঁকে কান্না করতে নিষেধ করেন।
পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবারও রিমান্ডের বিরোধিতা করে বলেন, তাঁর মক্কেল দ্বিতীয় স্ত্রীকে ভালোবাসতেন এবং মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তদন্ত কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত বেলা ৩টা ৩১ মিনিটে আদেশ দেন। গাজী নজরুল ইসলামের চার দিন এবং মাকছুদা ইসলামের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
আদালতের আদেশের পর তাঁদের কাঠগড়া থেকে নামিয়ে আনার সময় কয়েকজন সাংবাদিক গাজী নজরুলের কাছে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চান। তখন তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না বলেও দাবি করেন।
মরিয়ম কেন আত্মহত্যা করেছেন, জানতে চাইলে নজরুল বলেন, এ বিষয়ে তিনি জানেন না।
এরপর বেলা ৩টা ৩৪ মিনিটের দিকে পুলিশ আবার গাজী নজরুল ও মাকছুদাকে হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে আদালতকক্ষ থেকে নিচে নিয়ে যায়। আদালতের বারান্দায় তখন কয়েকজন আইনজীবী তাঁদের উদ্দেশে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন। পরে পুলিশের নিরাপত্তায় সিঁড়ি দিয়ে তাঁদের হাজতখানায় নেওয়া হয়।
এর আগে বেলা ২টা ২২ মিনিটের দিকে পুলিশের একটি সাদা প্রাইভেট কারে গাজী নজরুল ও মাকছুদা ইসলামকে আদালতে আনা হয়। তাঁদের আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়েছিল। পরে শুনানির জন্য তাঁদের কাঠগড়ায় তোলা হয়।
যেভাবে মামলার সূত্রপাত
রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের মরদেহ ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটি সংসদ সদস্য হিসেবে গাজী নজরুলের নামে বরাদ্দ ছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মরিয়মকে একটি কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে সিআইডির ফরেনসিক দলের সদস্যদেরও ডাকা হয়েছিল। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ ওই ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ছাড়াও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। ওবায়দুর রহমানকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি বলে জানিয়েছে।
মামলার এজাহারে মরিয়মের বাবা অভিযোগ করেন, তাঁর মেয়ে জুন মাসে গাজী নজরুলকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটে মরিয়ম ও গাজী নজরুল বসবাস করতেন। একই বাসায় নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকছুদাও থাকতেন।
এজাহারে আরও অভিযোগ করা হয়, বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। মরিয়ম তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে মুঠোফোনে এসব বিষয় জানাতেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, রোববার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনের বাসায় যেতে বলেন গাজী নজরুল। খবর পেয়ে তাঁর বাবা সেখানে যান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর শ্যালিকা সুফিয়া।
বাসায় গিয়ে তাঁরা অনেক মানুষের উপস্থিতি দেখতে পান। পরে জানতে পারেন, একটি ঘরের ভেতরে মরিয়ম ফাঁস দিয়েছেন। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পুলিশ ও উপস্থিত ব্যক্তিদের সহায়তায় দরজা ভেঙে মরিয়মকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায় বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
পুলিশ পরে মরিয়মের বিছানার ওপর থেকে একটি চিরকুট উদ্ধার করেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। ওই চিরকুটে কী লেখা ছিল এবং সেটির ফরেনসিক পরীক্ষা হয়েছে কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে আগেও আলোচনায়
গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। চলতি বছরের জুলাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ব্যক্তিগত ভিডিও নিয়ে তাঁকে ঘিরে ব্যাপক আলোচনা হয়। পরে তিনি জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী মরিয়ম খাতুন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী।
এরপর ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করে বলে প্রথম আলো জানিয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দেওয়ার কথাও প্রকাশ্যে আসে।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় এখন সেই সম্পর্ক, ন্যাম ভবনের বাসায় তাঁদের বসবাস, মরিয়মের পরিবারের করা অভিযোগ এবং মৃত্যুর আগে লেখা চিরকুটসহ বিভিন্ন বিষয় তদন্তের আওতায় আসছে।
তবে মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং আত্মহত্যায় কেউ প্ররোচনা দিয়েছিল কি না, তা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। বর্তমানে গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলাম মামলার আসামি হিসেবে পুলিশের রিমান্ডে রয়েছেন; তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। আদালতের পরবর্তী তদন্ত ও মামলার কার্যক্রমেই এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই হবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au