বাংলাদেশ

রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ তুলে ডব্লিউএইচও ছাড়লেন সাইমা ওয়াজেদ

  • 12:34 pm - September 22, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৩২ বার
সাইমা ওয়াজেদ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগের পর নিজের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ তুলেছেন সাইমা ওয়াজেদ। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের ভূমিকার কারণে তাঁকে প্রায় এক বছর পেশাগতভাবে নিষ্ক্রিয় ও বেতনহীন অবস্থায় থাকতে হয়েছে।

সাইমা ওয়াজেদ বলেন, বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডব্লিউএইচও স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। তবে সেখানে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তাতে তাঁর মতে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম ও যথাযথ প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়েছে। তাঁর আপত্তি ডব্লিউএইচওর মূল প্রতিষ্ঠান বা এর স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত লক্ষ্য নিয়ে নয়, বরং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং সেগুলো মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে।

তিনি জানান, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে তিনি ছুটিতে যেতে সম্মত হয়েছিলেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, তাঁর বিষয়ে ওঠা অভিযোগের তদন্ত নিরপেক্ষভাবে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই ছুটি বেতনহীন ছুটিতে পরিণত হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

সাইমার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলাসহ একাধিক অভিযোগের তদন্ত চলছিল। এর মধ্যে ২০২১ সালে কেনা একটি জমি নিয়ে করা অভিযোগও ছিল। সাইমার দাবি, তিনি ডব্লিউএইচওতে যোগ দেওয়ার কয়েক বছর আগেই ওই জমি কিনেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় সেটি কেনার অধিকার তাঁর ছিল। তাঁর ভাষ্য, ওই মামলায় বাংলাদেশে তাঁকে অনুপস্থিতিতে বিচার করা হয় এবং তিনি পলাতক ছিলেন বলে দাবি করা হলেও সে সময় তিনি প্রকাশ্যেই নয়াদিল্লিতে ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর দাবি, মামলার বিষয়ে তাঁকে আইনগতভাবে যথাযথ নোটিশও দেওয়া হয়নি।

সাইমা বলেন, পরবর্তীতে একজন স্বাধীন আইনজীবী মামলাটির নথিপত্র পর্যালোচনা করে তাঁকে জানান, মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়া ও মূল অভিযোগের মধ্যে আইনগত সমস্যা রয়েছে। তাঁর দাবি, পুরো বিষয়টির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে এবং এর সঙ্গে তাঁর মা শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধেরও সম্পর্ক রয়েছে।

এ ছাড়া চীনে একটি সফরকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সাইমার দাবি, ওই সফর আসলে অনুষ্ঠিতই হয়নি, কারণ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এ-সংক্রান্ত অর্থ ফেরতের বিষয়টি একজন সহকারীর প্রশাসনিক ভুলের কারণে হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অর্থের পরিমাণ ছিল ৯০১ মার্কিন ডলার। ২০২৬ সালের আগস্টের শুরুতে ডব্লিউএইচওর অভ্যন্তরীণ তদারকি বিভাগ তাঁকে জানায়, ওই অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তদন্তটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

সাইমা আরও বলেন, বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসের কিছু যোগাযোগ নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর দাবি, এসব যোগাযোগ প্রচলিত কূটনৈতিক চ্যানেল অনুসরণ করে হয়নি। একই সময়ে ডব্লিউএইচও মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে গোপনীয় নথি ফাঁস হওয়ার বিষয়টিও তাঁর নজরে আসে। তিনি এ দুটি বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানান। তবে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় তাঁর আবেদনের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

সাইমার দাবি, তেদ্রোসের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগ ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো নিয়ে স্বাধীন তদন্তের অনুরোধ জানানোর মাত্র ১০ দিন পর তাঁর ছুটির ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। তিনি এটিকে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁর অভিযোগ, এর মাধ্যমে তাঁকে আর্থিক চাপের মধ্যে রাখা, তাঁর পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করা এবং তাঁর বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল।

নিজের আইনি পরামর্শকদের বক্তব্য তুলে ধরে সাইমা আরও বলেন, তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস নিজেও ইথিওপিয়া-সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তবে তাঁর ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন সাইমা। তাঁর মতে, যথাযথ প্রক্রিয়ার মূল কথা হলো একই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা।

ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালক পদে নিজের নিয়োগ নিয়েও সাইমা বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তাঁকে নির্বাচনের সময় সংস্থাটির নির্ধারিত যাচাই ও মনোনয়ন প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়েছিল। তাঁর মা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় সেই পারিবারিক পরিচয়কে তাঁর পেশাগত যোগ্যতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনকারী অনেক ব্যক্তিরই রাজনৈতিক বা জনসম্পৃক্ত পটভূমি রয়েছে।

সাইমা ওয়াজেদ জানান, প্রায় এক বছর কোনো আয় ছাড়া এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকার পর তিনি শেষ পর্যন্ত ডব্লিউএইচও থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এর আগে ৮ সেপ্টেম্বর আঞ্চলিক কমিটি তাঁর নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছিল। পরে বিষয়টি ডব্লিউএইচওর নির্বাহী বোর্ডে বিবেচনার কথা ছিল।

পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে সাইমা বলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেছেন বলে মনে করেন না এবং তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোও তদন্তে টেকেনি। তাঁর দাবি, তদন্ত শেষ হওয়ার পরও তাঁকে কীভাবে দীর্ঘ সময় দায়িত্বের বাইরে রাখা হলো, সে বিষয়ে ডব্লিউএইচওর নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা বা জবাবদিহি তিনি পাননি। তাঁর মতে, অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় ডব্লিউএইচওতে থাকার আর কোনো বাস্তব পথ তিনি দেখছিলেন না।

তবে ডব্লিউএইচওর পক্ষ থেকে এর আগে বলা হয়েছে, সাইমা ওয়াজেদকে ঘিরে প্রক্রিয়াটি চলমান ছিল এবং গোপনীয়তার কারণে তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। সাইমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অবশ্য তিনি নিজেই অস্বীকার করেছেন।

সাইমা বলেন, ডব্লিউএইচওর লক্ষ্য ও কার্যক্রমের প্রতি তাঁর আস্থা এখনও অটুট রয়েছে। তাঁর মতে, সংস্থাটির অধিকাংশ কর্মী সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করেন। তবে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিশ্ববাসীর কাছে যে প্রতিষ্ঠান আস্থা ও জবাবদিহির প্রত্যাশা করে, সেই প্রতিষ্ঠানকেও নিজের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একই নিয়ম ও প্রক্রিয়া সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

এখন নিজের পেশাগত সুনাম পুনরুদ্ধার করে আবারও নিজের পছন্দের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে চান সাইমা ওয়াজেদ। তাঁর ভাষ্য, তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো বিভিন্ন নেতিবাচক প্রচারণা ও গুজবের অবসান ঘটিয়ে ভবিষ্যতে মানুষের সেবায় কাজ করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য।

সুত্রঃ ফাস্টপোস্ট

এই শাখার আরও খবর

টাইফুন দুজুয়ানের তাণ্ডবে জাপানে ১৯ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ

শক্তিশালী টাইফুন দুজুয়ানের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জাপানের রাজধানী টোকিওসহ দেশটির পূর্বাঞ্চল। প্রবল বৃষ্টি, ঝোড়ো বাতাস, বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কায় ছয়টি প্রশাসনিক অঞ্চলের ১৯ লাখের…

দুর্নীতির বরপুত্র তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিএনপি’র যত মিথ্যাচার

আমি প্রায়ই বলি, বিএনপি দলটি দাঁড়িয়ে আছে মিথ্যের ওপর। আসলে দলটির নাম হওয়া উচিত Bangladesh Nontruth Party (BNP)।মোটামুটিভাবে শুরু থেকে আরম্ভ করে এখন পর্যন্ত দলটির…

বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকার ৩৬ শতাংশ : আইএমএফ

বাংলাদেশে প্রতি ১০০ জন শিক্ষিত তরুণের মধ্যে ৩৬ জন বেকার। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য…

সুদানে মানবিক যুদ্ধবিরতি বারবার ব্যর্থ হচ্ছে কেন, দায় কার?

সুদানে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। যুদ্ধ বন্ধের বদলে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে। এর ফলে ভয়াবহ মানবিক সংকট আরও গভীর…

কেরানীগঞ্জে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ভাইকে গুলি, ২৫ ভরি সোনা লুট

ঢাকার কেরানীগঞ্জে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও তাঁর ফুফাতো ভাইকে গুলি করে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে…

জাবি অধ্যাপকের কাছে চাঁদা দাবি, সন্তানকে অপহরণের হুমকি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক অধ্যাপককে মুঠোফোনে কল করে চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে তাঁর সন্তানকে অপহরণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিজের ও…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au