খুলনায় ছাত্র হত্যা মামলায় খুবির সাবেক শিক্ষার্থী আটক
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় হাসনাত হাবিব রিফাত নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাবেক শিক্ষার্থীকে আটক করেছে স্পেশাল রেসপন্স…
অন্যায়, বৈষম্য কিংবা অযৌক্তিক যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জাগ্রত বিবেকের তাড়নায় আপত্তি ও ভিন্নমত প্রকাশ করাই হলো প্রতিবাদ। কিন্তু সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে প্রতিবাদের সেই আদর্শিক রূপটি যেন হারিয়ে যাচ্ছে; অধিকাংশ প্রতিবাদই এখন নির্দিষ্ট স্বার্থ বা সুবিধাজনক এজেন্ডা অনুযায়ী ‘বাছাই করা’ রূপ ধারণ করেছে।
ধরা যাক, একই বয়সের দু’টি শিশু একই রকম নৃশংসতার শিকার হলো।
একজন রাজধানীর সচ্ছল পরিবারের সন্তান। স্কুলের পোশাকে তার হাসিমুখের ছবি মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল। সংবাদমাধ্যমে এলো, মানুষ শেয়ার করল, বিচারের দাবি উঠল। মানুষ কাঁদল, প্রতিবাদ হলো।
অন্য শিশুটি গ্রামের দরিদ্র পরিবারের। তার এমন কোনো ঝকঝকে ছবি নেই। তার মৃত্যুর খবর স্থানীয় সংবাদে প্রকাশিত হলো। দু-এক দিন পর সেটিও হারিয়ে গেল।
কিন্তু দু’টি শিশুর জীবনের মূল্য কি আলাদা ছিল?
নিশ্চয়ই নয়।
তাহলে একটি মৃত্যু জাতীয় বিবেককে নাড়িয়ে দিতে পারে, অন্যটি কেন প্রায় নিঃশব্দে হারিয়ে যায়? মানুষের সহানুভূতি কি সত্যিই সর্বজনীন? নাকি কান্নারও দেশ, দল, শ্রেণি, পরিচয় ও ঠিকানা আছে?
পৃথিবীর প্রতিটি দুঃখে সমানভাবে কষ্ট পাওয়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ‘আইডেন্টিফায়েবল ভিকটিম ইফেক্ট’। একজন নির্দিষ্ট মানুষের নাম, মুখ ও গল্প সামনে এলে তার সঙ্গে আবেগের সংযোগ তৈরি হয়। বিপরীতে, একই ঘটনা শুধু সংখ্যা হয়ে এলে আবেগের তীব্রতা কমতে পারে।
“সাত বছরের একটি শিশু মারা গেছে”; এটি একটি সংবাদ। কিন্তু সেই শিশুটির হাসিমুখ, নাম, স্কুলব্যাগ কিংবা তার মায়ের অপেক্ষা সামনে এলে শিশুটি আর সংখ্যা থাকে না। এ কারণেই হয়তো একটি মুখ কখনো হাজারটি সংখ্যার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
মনোবিজ্ঞানে ‘সাইকিক নাম্বিং’ ও ‘কম্প্যাশন ফেইড’ নামে আরও দু’টি ধারণা রয়েছে। পল সলভিকসহ গবেষকদের কাজ আমাদের দেখায়, বিপদগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও আমাদের সহানুভূতি সেই অনুপাতে বাড়ে না।
একটি শিশু কুয়োয় পড়ে গেলে গোটা দেশ রাত জেগে উদ্ধার অভিযান দেখতে পারে। অথচ দূরের কোনো দুর্যোগে শত মানুষের মৃত্যুসংবাদ আমরা চায়ের সঙ্গে পড়ে পরের পাতায় চলে যাই। মানুষ তখন ধীরে ধীরে মানুষ থেকে পরিসংখ্যানে পরিণত হয়।
কিন্তু সমস্যাটি শুধু মস্তিষ্কের নয়।
একই অপরাধে ভুক্তভোগী কিংবা অপরাধীর পরিচয় বদলে গেলে যদি আমাদের নৈতিক অবস্থানও বদলে যায়, তখন কি সেটিকে শুধু মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা বলা যায়?
আমার পছন্দের রাজনৈতিক দলের একজন কর্মী আক্রান্ত হলে আমি প্রতিবাদ করি। কিন্তু একই অপরাধ প্রতিপক্ষের কারও সঙ্গে ঘটলে যদি নীরব থাকি, কিংবা অপরাধী আমার পক্ষের হলে তার পক্ষে যুক্তি খুঁজি, তখন প্রশ্ন করতেই হয়; আমি কি সত্যিই অন্যায়ের বিরুদ্ধে? নাকি শুধু আমার মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে?
রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানের গবেষণায়ও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ৪,৭৩৭ অংশগ্রহণকারী নিয়ে পরিচালিত চারটি গবেষণায় রাজনৈতিক মিত্র বা নিরপেক্ষ ব্যক্তির তুলনায় প্রতিপক্ষের দুর্ভোগে কম সমানুভূতি দেখা গেছে। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের মধ্যে এর মাত্রা সমান ছিল না।
রাজনৈতিক মেরুকরণ তাই শুধু ভোটের বাক্সে আটকে থাকে না; সেটি আমাদের মানবিক সম্পর্কেও ঢুকে পড়তে পারে।
রাজধানীর কান্না বনাম গ্রামের কান্না
ঢাকার পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী কিংবা প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তানের সঙ্গে কিছু ঘটলে সংবাদটি দ্রুত জাতীয় পরিসরে পৌঁছানোর অবকাঠামো রয়েছে–সাংবাদিক, ক্যামেরা, নাগরিক সংগঠন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী মানুষ আছেন।
সংবাদমাধ্যম ইচ্ছাকৃতভাবে গ্রামের মানুষকে অবহেলা করে; তথ্যভিত্তিক গবেষণা ছাড়া এমন দাবি করা ঠিক হবে না। কিন্তু যে প্রশ্নটি করা জরুরি–ভৌগোলিক দূরত্ব কি কখনো আবেগের দূরত্বও তৈরি করে? একটি দেশের সব নাগরিকের দুর্ভোগ কি সমানভাবে জাতীয় দৃশ্যপটে পৌঁছাতে পারে?
ভুক্তভোগীর বয়স, চেহারা, সামাজিক অবস্থান কিংবা আবেগজাগানিয়া ছবি কি আমাদের মনোযোগকেও প্রভাবিত করে?
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এর কিছু প্রমাণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে আলোচিত ‘মিসিং হোয়াইট ওম্যান সিনড্রোম’ নিয়ে জ্যাক সমার্সের ২০১৬ সালের গবেষণায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংবাদ প্রকাশে জাতিগত পরিচয় ও নারী-পুরুষভেদে পার্থক্য পাওয়া যায়।
এটি বাংলাদেশের প্রমাণ নয়। কিন্তু নিজেদের দিকে তাকানোর কারণ দেয়। সচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারের দুই শিশুর গল্প বলার সুযোগ কি সমান? শহরের একটি মুখ ও গ্রামের একটি মুখের সংবাদমূল্য কি বাস্তবে সমান?
ফেসবুকের যুগে প্রতিবাদেরও বাজার আছে
একটি শক্তিশালী ছবি, কয়েক সেকেন্ডের সিসিটিভি ফুটেজ কিংবা একটি হ্যাশট্যাগ কোনো ঘটনাকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের সামনে নিয়ে যেতে পারে। এর সুফল অসাধারণ–অনেক অন্যায় এখন সহজে চাপা থাকে না।
কিন্তু যে দুঃখ সহজে ছবি হয়, যে ক্ষোভ সহজে পোস্ট হয়, সেগুলো বেশি ছড়াতেও পারে।
২০২১ সালে Science Advances-এ প্রকাশিত উইলিয়াম ব্র্যাডি ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় ৭,৩৩১ ব্যবহারকারীর প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ টুইট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনলাইনে ক্ষোভ প্রকাশ করে বেশি সামাজিক প্রতিক্রিয়া পেলে ভবিষ্যতে একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশের প্রবণতা বাড়তে পারে।
সংবাদমাধ্যমও একা দায়ী নয়। মানুষ যে খবর বেশি দেখে, সংবাদমাধ্যম সেটিকে বেশি গুরুত্ব দেয়; আবার সংবাদমাধ্যমের বেশি প্রচার মানুষের নজর ও শেয়ার বাড়ায়।
বেশি প্রচার → বেশি নজর → বেশি আবেগ → বেশি শেয়ার → আরও বেশি প্রচার।
সমানুভূতি আর ন্যায়বোধ এক নয়
আমরা প্রত্যেক মানুষের জন্য একই মাত্রায় ব্যক্তিগত দুঃখ অনুভব করতে পারব না। কিন্তু ন্যায়বিচারের জন্য একই আবেগ অনুভব করাও জরুরি নয়।
একজন অপরিচিত মানুষের মৃত্যুতে আমি হয়তো পরিচিত কারও মতো কাঁদব না। তাই বলে তার হত্যার বিচার কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায় না।
আমাদের সমানুভূতি পুরোপুরি নিরপেক্ষ না-ও হতে পারে। কিন্তু আইন নিরপেক্ষ হতে পারে। হত্যাকারী আমার দলের হলেও হত্যাকে হত্যা বলা যায়। নির্যাতিত মানুষটি আমার প্রতিপক্ষ হলেও তার জন্য বিচার চাওয়া যায়।
নিজেকে তাই প্রশ্ন করা দরকার–ভুক্তভোগী আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হলে কি আমার প্রতিক্রিয়া একই হতো? অপরাধী আমার সমর্থিত পক্ষের হলে কি একই ভাষায় নিন্দা করতাম? ঘটনাটি দূরের গ্রামে ঘটলে কিংবা ভুক্তভোগীর আকর্ষণীয় ছবি না থাকলেও কি তার জীবনের মূল্য আমার কাছে একই থাকত?
পৃথিবীর প্রতিটি মৃত্যুতে আমরা সমানভাবে কাঁদব–এ প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষের অনুভূতির সীমা আছে।
কিন্তু নৈতিকতার সীমা কি একই জায়গায় শেষ হতে হবে?
আমাদের চোখের পানি আলাদা হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বোধ কেন আলাদা হবে?
একটি শিশুর জীবন রাজধানীতে এক রকম এবং প্রত্যন্ত গ্রামে আরেক রকম মূল্যবান হতে পারে না। ধনী বাবার সন্তানের রক্ত আর দরিদ্র বাবার সন্তানের রক্তের মূল্য আলাদা হতে পারে না। কোনো হত্যার নৈতিকতা হত্যাকারী কিংবা নিহত মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে না।
সভ্যতার পরীক্ষা শুধু আমরা কত জোরে নিজের মানুষের জন্য প্রতিবাদ করি, তা দিয়ে হয় না। আসল পরীক্ষা হয়তো তখনই, যখন অন্যায়ের শিকার মানুষটি ‘আমাদের’ কেউ নয়। আর তার চেয়েও কঠিন পরীক্ষা তখন, যখন অন্যায়কারীটি ‘আমাদেরই’ একজন।
মানুষ হিসেবে আমাদের অনুভূতি হয়তো চিরকালই কিছুটা সিলেকটিভ থাকবে।
কিন্তু মানদণ্ড যেন সিলেকটিভ না হয়।
মানবতার ভবিষ্যতের জন্য সম্ভবত এই পার্থক্যটুকুই সবচেয়ে জরুরি।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক
তথ্যসূত্র:
১. ইত্তেফাক, ‘পল্লবীতে শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উত্তাল মিরপুর’, ২১ মে ২০২৬।
২. BBC Learning English, Compassion Fatigue, 2021।
৩. Brady প্রমুখ, How Social Learning Amplifies Moral Outrage Expression in Online Social Networks, Science Advances, 2021।
৪. Sommers, Missing White Woman Syndrome, Journal of Criminal Law and Criminology, 2016।
৫. সমকাল, ‘ধর্ষণের প্রতিবাদ: ঢাবি ঢামেক বুয়েটে বিক্ষোভ’, 2025।
৬. আনন্দবাজার পত্রিকা, ‘পিটিয়ে কিশোরকে খুন, ফুঁসছে বাংলাদেশ’, 2015।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au