ইউনূসের জাতিসংঘ সফর ঘিরে বিতর্ক, কেরি কেনেডি-যোগাযোগে নতুন করে ‘ডিপ স্টেট’ আলোচনা। ছবিঃ সংগৃহীত
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিউইয়র্ক সফর এবং জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে একটি সাইড-ইভেন্টে তাঁর বক্তব্যকে ঘিরে বাংলাদেশে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে তাঁর জাতিসংঘ সফরের ধরন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিশেষ করে মার্কিন মানবাধিকারকর্মী কেরি কেনেডির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
তবে এ বিতর্কে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। জাতিসংঘের নথি এবং প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ইউনূস ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘Social Business, Youth and Technology’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের সাইড-ইভেন্টে বক্তব্য দেন। এটি সাধারণ পরিষদের মূল সাধারণ বিতর্কে কোনো রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষে দেওয়া আনুষ্ঠানিক ভাষণ ছিল না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ও ওই অনুষ্ঠানকে পৃথক একটি ইভেন্ট হিসেবে নথিভুক্ত করেছে।
ইউনূস ওই অনুষ্ঠানে ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক ব্যবসা, তরুণ উদ্যোক্তা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানও বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী জোসে রামোস-হোর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
এ কারণেই ইউনূসের এই সফরকে কেউ কেউ সাধারণ পরিষদের মূল অধিবেশনে রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক ভাষণ হিসেবে উপস্থাপন করলেও জাতিসংঘের প্রকাশিত নথিতে তার ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু অনুষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক মর্যাদা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
এর পাশাপাশি ইউনূসের সঙ্গে মার্কিন মানবাধিকারকর্মী কেরি কেনেডির যোগাযোগ নিয়েও নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। কেরি কেনেডি রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট। তিনি সাবেক মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিনেটর রবার্ট এফ. কেনেডির মেয়ে এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির ভাতিজি।
ইউনূসের সঙ্গে কেরি কেনেডির যোগাযোগ অবশ্য সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। ২০১৪ সালেই কেরি কেনেডি ঢাকায় ইউনূস সেন্টারের একটি সামাজিক ব্যবসা বিষয়ক অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। ইউনূস সেন্টারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সেই সময় থেকেই দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেও নিউইয়র্কে ইউনূসের সঙ্গে কেরি কেনেডির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, জুলাই-আগস্টের সহিংসতা, জবাবদিহি, গুম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয় বলে সরকারি ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইউনূসের শ্রম আইন মামলায় সাজা হওয়ার পরও কেরি কেনেডি প্রকাশ্যে তাঁর সমর্থনে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তিনি ওই সাজাকে ‘অন্যায্য’ হিসেবে উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে ইউনূসের সঙ্গে আবারও কেরি কেনেডির নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীদের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের নির্বাচন, সংস্কার কার্যক্রম এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। ইউনূস আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে বাংলাদেশে নিয়মিত সফর করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এই ধারাবাহিক যোগাযোগের কারণে বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইউনূসের সমালোচকরা তাঁর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের কেউ কেউ এসব সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি ব্যবহার করছেন।
রাজনৈতিক আলোচনায় ‘ডিপ স্টেট’ বলতে সাধারণত রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকারের বাইরে থাকা কোনো অনির্বাচিত, প্রভাবশালী এবং পর্দার আড়ালের নেটওয়ার্ককে বোঝানো হয়। তবে ইউনূস, কেরি কেনেডি এবং মার্কিন সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ককে এমন কোনো গোপন নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে প্রমাণ করে এমন নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ‘ডিপ স্টেটের সঙ্গে যোগাযোগ’ বিষয়টি বর্তমানে মূলত রাজনৈতিক অভিযোগ ও ব্যাখ্যার পর্যায়েই রয়েছে, প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।
তবে এটাও সত্য যে কেরি কেনেডি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস ২০২৪ সালে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বৈঠক করে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছে। সংগঠনটির ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও ইউনূসের সঙ্গে ওই বৈঠকের উল্লেখ রয়েছে।
এই সম্পর্কের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েই মূলত বিতর্কটি তৈরি হয়েছে। ইউনূসের সমর্থকদের কাছে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের পক্ষে বৈশ্বিক সহযোগিতার অংশ। বিপরীতে তাঁর রাজনৈতিক সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, পশ্চিমা মানবাধিকার সংগঠন ও মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে ইউনূসের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তাঁর প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিভিন্ন মহলের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে ইউনূসের আন্তর্জাতিক যোগাযোগকেও অনেকে যুক্ত করেন। সমালোচকদের একটি অংশ দাবি করে আসছে, ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পশ্চিমা মহলের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ যোগাযোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অন্যদিকে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও রাজনৈতিক বিরোধিতা রয়েছে। সরকারের সময় সংঘটিত সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অর্থনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং মানবাধিকার ইস্যুতে তাঁর সমালোচকরা নানা অভিযোগ তুলেছেন। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে পৃথক ঘটনা, সরকারি তথ্য, তদন্ত প্রতিবেদন এবং স্বাধীন উৎসের তথ্য দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে ইউনূসের এবারের নিউইয়র্ক সফরকে ঘিরে বিতর্কের দুটি আলাদা দিক রয়েছে। প্রথমটি হলো জাতিসংঘের মূল সাধারণ বিতর্কে ভাষণ না দিয়ে সাইড-ইভেন্টে তাঁর বক্তব্য দেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো কেরি কেনেডি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের যোগাযোগ এবং এর রাজনৈতিক তাৎপর্য।