বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের দিকে এক ফিরে দেখা

  • 8:54 pm - September 28, 2026
  • পঠিত হয়েছে:৭৭ বার
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

জন্মদিনে রাজনৈতিক কোলাহল নয়, শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার আহ্বান

২৮ সেপ্টেম্বর ৭৯ বছরে পা দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তার রাজনৈতিক জীবন নানা নাটকীয়তা ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ে পরিপূর্ণ। ১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হত্যার ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া, দীর্ঘদিন নির্বাসন ও গৃহবন্দিত্বে থাকা এবং একাধিকবার হত্যাচেষ্টার মুখোমুখি হওয়া তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

তবে এই রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু তার টিকে থাকা নয়, বরং সেই প্রতিকূলতার পর তিনি কী অর্জন করেছিলেন, সেটিও আলোচনার দাবি রাখে।

২০০৯ থেকে উন্নয়নের নতুন অধ্যায়

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় বাংলাদেশের সামনে ছিল বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ।

এরপর প্রায় ১৫ বছর ধরে দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে বলে তার সমর্থকেরা মনে করেন।

এই সময়ে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা অর্জন করে। প্রায় দেড় দশক ধরে গড়ে ৬ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বজায় ছিল।

শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে একাধিক বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, যেগুলো একসময় অনেকের কাছেই উচ্চাভিলাষী বা কঠিন বলে মনে হয়েছিল।

৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয় বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে। ঢাকার মেট্রোরেল রাজধানীর গণপরিবহনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের অন্যতম উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হিসেবে দেখা হয়।

শুধু অবকাঠামো নয়, প্রযুক্তিতেও পরিবর্তন

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে শুধু সেতু, সড়ক বা অন্যান্য অবকাঠামো দিয়ে বিচার করলে এর একটি অংশই দেখা হবে।

তার সরকারের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কর্মসূচির মাধ্যমে ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি ও সেবা খাতের বিকাশে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই বৃহত্তর উন্নয়ন ভাবনার লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য ও সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকে নিয়ে যাওয়া।

পরবর্তী সময়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ধারণার মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর, অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে আনা হয়।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর নতুন বাস্তবতা

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।

এর পরের সময় নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার এসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। তবে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করে, বাংলাদেশকে আগের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে নিতে সরকারের সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ এখনও পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।

শেখ হাসিনার উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক

শেখ হাসিনার জন্মদিনকে কেন্দ্র করে তাই শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা নয়, বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশ কি আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক আস্থার পথে এগোবে, নাকি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকবে, সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ হাসিনার সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হলেও তার প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের অবকাঠামো, অর্থনীতি ও উন্নয়ন খাতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় প্রকল্পগুলো এখন দেশের বাস্তব অবকাঠামোর অংশ। একই সময়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে পরিবর্তন এনেছে।

তবে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মূল্যায়ন কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সরকারের শাসনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক বিরোধ, মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও দেশে-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। ফলে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সময়কে মূল্যায়ন করতে হলে উন্নয়ন অর্জনের পাশাপাশি এসব বিতর্কও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

সামনে বাংলাদেশের কোন পথ?

৭৯ বছরে শেখ হাসিনা এখনও বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

তার সমর্থকদের কাছে তিনি রাজনৈতিক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনা করা একজন নেতা এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট ধারার প্রতীক।

অন্যদিকে তার সমালোচকেরা তার সরকারের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ফলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক এখনও শেষ হয়নি।

তার জন্মদিনে মূল প্রশ্ন হতে পারে, গত দেড় দশকের উন্নয়ন থেকে বাংলাদেশ কী শিক্ষা নেবে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের দিকে এগোবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক আস্থার সমন্বয়ে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ তৈরি করা।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন সেই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তার সময়ে অর্জিত সাফল্য যেমন আলোচনায় থাকবে, তেমনি তার সরকারের সিদ্ধান্ত ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।

এই শাখার আরও খবর

বিশ্বজুড়ে স্কুলে মোবাইল নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশে কী করবে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বাড়ছে। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমে যাওয়া, সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং অতিরিক্ত…

কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ, চাপে বাংলাদেশসহ চার দেশ

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। এর মধ্যে কাতার…

রামু হামলার ১৪ বছর, বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের

কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে ভয়াবহ হামলার ১৪ বছর পূর্ণ হলেও এখনো শেষ হয়নি বিচারপ্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময়েও মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা…

শেষ মুহূর্তের গোলে বেলজিয়ামকে হারিয়ে শীর্ষে ফ্রান্স

বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচজুড়ে দাপট দেখিয়েও গোলের দেখা পাচ্ছিল না ফ্রান্স। একের পর এক আক্রমণ, কয়েকটি সহজ সুযোগ এবং ক্রসবারে বল লাগার পরও কাঙ্ক্ষিত গোলটি আসছিল…

মধ্যরাতেও বিক্ষোভে উত্তপ্ত চুয়েট

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ, ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার…

বাংলাদেশি পাটপণ্যে নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা ভারতের

বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটপণ্যের ওপর নতুন করে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২৪ সেপ্টেম্বরের এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ৩৬টি বাংলাদেশি পাটপণ্য…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au