বিশ্বজুড়ে স্কুলে মোবাইল নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশে কী করবে?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্কুলে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ বাড়ছে। শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ কমে যাওয়া, সাইবার বুলিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং অতিরিক্ত…
কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের (এসআরএফটিআই) ক্যাম্পাসে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের (এবিজিপি) সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ২৭ সেপ্টেম্বরের এ ঘটনায় উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলা ও অনুষ্ঠান বানচালের অভিযোগ তুলেছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অনুষ্ঠান আয়োজকদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসের বাইরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ইনস্টিটিউটের মূল অডিটোরিয়ামে এবিজিপির একটি অনুষ্ঠান আয়োজনকে কেন্দ্র করে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই তারা অডিটোরিয়াম ভাড়া করে অনুষ্ঠান করছিল। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্রসমাজকে না জানিয়ে ক্যাম্পাসে একটি রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়। পরে অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি জানাতে গিয়ে তারা হামলার শিকার হন বলে দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে এবিজিপিকে ডানপন্থী ও আরএসএস-সংশ্লিষ্ট সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কীভাবে ঘটনার শুরু?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর এসআরএফটিআইয়ের মূল থিয়েটারে এবিজিপির একটি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানটি ভোক্তা অধিকার ও সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল এবং অডিটোরিয়াম ব্যবহারের জন্য তারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছিল।
এবিজিপির এক সদস্য সাংবাদিকদের জানান, অডিটোরিয়াম ভাড়া বাবদ তারা ১৫ হাজার রুপি পরিশোধ করেছিলেন এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতিও পেয়েছিলেন। সংগঠনের রাজ্য সভাপতি পঙ্কজ রায় অনুষ্ঠানটিকে ভোক্তা অধিকার ও ‘জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি’র ওপর আয়োজিত কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে এসআরএফটিআইয়ের শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, অনুষ্ঠানটি সম্পর্কে তাদের আগে জানানো হয়নি। শিক্ষার্থীদের দাবি, ক্যাম্পাসে একটি বেসরকারি সংগঠনের অনুষ্ঠান কীভাবে অনুমোদন পেল, তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তোলেন। পরে তারা অনুষ্ঠানের স্থানের কাছে পোস্টার লাগিয়ে প্রতিবাদ জানান।
শিক্ষার্থীদের সংগঠনের বক্তব্য অনুযায়ী, দুপুরের দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী মূল থিয়েটারের কাছে পোস্টার লাগাতে গেলে এবিজিপির সদস্যদের সঙ্গে তাদের বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। এরপর পরিস্থিতি শারীরিক সংঘর্ষে গড়ায়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ কী?
এসআরএফটিআইয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনুষ্ঠানে কয়েকজন বক্তা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’, ‘আরবান নকশাল’ এবং ‘টেররিস্ট’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করেন। প্রতিবাদ করতে গেলে এবিজিপির সদস্যরা তাদের ওপর হামলা করেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। একজন শিক্ষকও দাবি করেছেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ঠেকাতে গিয়ে তিনি ও আরও কয়েকজন শিক্ষক আক্রান্ত হন।
আরও গুরুতর অভিযোগ হিসেবে শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, বাইরের লোকজন ক্যাম্পাসে ঢুকে তাদের ওপর হামলা চালায়। কিছু প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে লাঠি বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার অভিযোগের কথাও এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, সংঘর্ষে প্রায় ৩০ শিক্ষার্থী ও দুই শিক্ষক আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ২৫ শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং তাদের মধ্যে দুজনকে ভর্তি করা হয়েছিল। তবে আহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
এবিজিপির পাল্টা অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবিজিপি। সংগঠনটির দাবি, শিক্ষার্থীরাই প্রথমে তাদের অনুষ্ঠানে বাধা দেন, পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন এবং কর্মসূচি বন্ধ করার চেষ্টা করেন।
এবিজিপির পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, তাদের সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং সংঘর্ষে সংগঠনের চারজন সদস্যকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। সংগঠনটির দাবি, অনুষ্ঠানে ভারতমাতা ও স্বামী বিবেকানন্দের ছবি ছিল, যার কিছু অংশ শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত করেন।
এবিজিপির এক সদস্য আরও দাবি করেছেন, তাদের বাস ক্যাম্পাসের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছিল এবং সদস্যদের বের হতে বাধা দেওয়া হয়। পরে পুলিশি উপস্থিতিতে সংগঠনের বাস ও একটি অ্যাম্বুলেন্স ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
অর্থাৎ সংঘর্ষের সূত্রপাত কে করেছে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত।
গেট বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের অবস্থান
সংঘর্ষের পর শিক্ষার্থীরা ইনস্টিটিউটের মূল গেট বন্ধ করে অবস্থান নেন। তাদের অভিযোগ ছিল, বাইরে থেকে আরও লোকজন ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়তে পারেন।
অন্যদিকে ক্যাম্পাসের বাইরে জড়ো হওয়া লোকজনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের উত্তেজনা তৈরি হয়। দুই পক্ষের মধ্যে স্লোগান-পাল্টা স্লোগানও হয়। কিছু প্রতিবেদনে ক্যাম্পাসের ভেতরে পাথর ও বোতল ছোড়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, এবিজিপির সদস্যদের বহনকারী বাস ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বাইরে থেকে তাদের লক্ষ্য করে পাথর ও ইট ছোড়া হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসের বাইরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ ক্যাম্পাসের প্রবেশপথ ঘিরে অবস্থান নেয় এবং উত্তেজিত দুই পক্ষকে আলাদা রাখার চেষ্টা করে।
এসআরএফটিআইয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত হওয়ার কোনো রিপোর্ট তখন পর্যন্ত ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের কাছে ছিল না।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে দুই পক্ষের অভিযোগ
ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের একাংশ পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তাদের অভিযোগ, হামলার ঘটনায় দ্রুত মামলা করার পরিবর্তে পুলিশ অভিযোগকারীদের নাম ও ঠিকানা নথিভুক্ত করছিল।
শিক্ষার্থীরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের দাবি জানিয়ে পুলিশের একটি গাড়ির সামনে প্রতিবাদ করেন।
অন্যদিকে এবিজিপির পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়, তাদের সদস্যদের ক্যাম্পাস থেকে বের হতে বাধা দেওয়া হয়েছে। ফলে সংঘর্ষের পরও কিছু সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল।
পরবর্তী সময়ে পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে এবং পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলা করা হয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বর সকালে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল এবং শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যোগ দেন। মূল ফটকের বাইরে পুলিশ মোতায়েন থাকলেও নতুন করে কোনো বড় ধরনের উত্তেজনার খবর পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক বক্তব্যই কি সংঘর্ষের মূল কারণ?
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিষয়। প্রথমত, একটি বাইরের সংগঠনকে এসআরএফটিআইয়ের মতো সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়া। দ্বিতীয়ত, ওই অনুষ্ঠানকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত কর্মসূচি হিসেবে দেখেছে কি না এবং বক্তাদের বক্তব্যকে তারা কীভাবে নিয়েছে।
এবিজিপির বক্তব্য, তারা বৈধ অনুমতি নিয়েই অডিটোরিয়াম ভাড়া করে অনুষ্ঠান করেছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান করার আগে ছাত্রসমাজকে অবহিত করা হয়নি এবং তারা এই আয়োজনের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।
ফলে মূল বিরোধ শুধু অনুষ্ঠান বন্ধ বা চালু রাখার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্যাম্পাসে বাইরের সংগঠনের রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত কর্মসূচির সুযোগ থাকা উচিত কি না, শিক্ষার্থীদের আপত্তির পর কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী হওয়া উচিত এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা কোথায়, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
যাদবপুরের পর এবার এসআরএফটিআই
কলকাতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক উত্তেজনার ধারাবাহিকতার মধ্যেই এসআরএফটিআইয়ের এই ঘটনা ঘটল। এর কয়েক সপ্তাহ আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও এবিভিপি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। সেই ঘটনাতেও দুই পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে বাইরের লোকজন আনা এবং হামলার অভিযোগ তুলেছিল।
তবে দুটি ঘটনার পরিস্থিতি এক নয়। যাদবপুরের ঘটনা ছিল ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে, আর এসআরএফটিআইয়ের ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট বাইরের সংগঠনের অনুষ্ঠান আয়োজনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের আপত্তি থেকেই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এসআরএফটিআই?
সত্যজিৎ রায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট ভারতের জাতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। ১৯৯৫ সালে ভারত সরকারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই কারণে প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত কোনো কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনা সাধারণ কোনো ক্যাম্পাস বিরোধের চেয়ে বেশি গুরুত্ব বহন করছে। বিশেষ করে চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানে মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে বিতর্ক স্বাভাবিকভাবেই বড় পরিসরে আলোচিত হচ্ছে।
২৭ সেপ্টেম্বরের সংঘর্ষের ঘটনায় দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য থাকায় প্রকৃত ঘটনার পূর্ণ চিত্র পেতে পুলিশি তদন্ত, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, সংঘর্ষের প্রথম হামলা কার পক্ষ থেকে হয়েছিল বা কারা বাইরে থেকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছিল। পুলিশি তদন্ত ও মামলার অগ্রগতিতেই এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়ার কথা।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au