কংগ্রেসকে ‘পরজীবী’, রাহুলকে ‘ব্যর্থ পণ্য’ বললেন মোদি
ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস ও বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কংগ্রেসকে ‘পরজীবী’ আখ্যা দিয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন,…
নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবার, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা এবং বালু-পাথরের বাণিজ্য নিয়ে অপরাধীদের তৎপরতার তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। এসব কর্মকাণ্ডের তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি অপরাধী চক্রের বিরাগভাজন হয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন তাঁর স্বজন ও সহকর্মীরা। একাধিকবার হত্যার চেষ্টা এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের কাছে উদ্বেগ জানানোর পরও শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারান তিনি। তাঁর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এখন আলোচনায় এসেছেন সীমান্ত এলাকার দুই পরিচিত ব্যক্তি শামীম আহমেদ ওরফে ‘শুটার শামীম’ এবং তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজুল’।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ির পাশেই গুলি করে হত্যা করা হয় বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি আলিফকে। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে আটজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে।
ছদ্মবেশে অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করতেন আলিফ
আলিফ কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো চায়ের দোকানি, কখনো জুতা সেলাইকারী, আবার কখনো পাগলের ছদ্মবেশে সীমান্তবর্তী এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন বলে তাঁর স্বজন ও সহকর্মীরা জানিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মাদক, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের কারবার এবং বালু-পাথরের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অপরাধজগতের তথ্য সংগ্রহ করা।
সংগৃহীত তথ্যের কিছু অংশ নিজের ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করতেন তিনি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে দিতেন। তাঁর কর্মস্থল রূপসী বাংলার সম্পাদক আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, সীমান্ত এলাকার অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে কাজ করার কারণে বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠী আলিফের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।
আনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, একাধিকবার হামলার শিকার হওয়ার পরও আলিফ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বন্ধ করেননি। নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের কাছেও আবেদন করেছিলেন তিনি। তবে তাঁকে নিরাপত্তা দিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর সহকর্মীরা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে শামীম ও তাজুলের নাম
পুলিশের তদন্তে শুটার শামীম ও কিলার তাজুলের নাম এসেছে। পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডে শুটার হিসেবে তাজুলের নাম উঠে এসেছে। শামীমকেও সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁদের কাউকে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবার, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা এবং বালু-পাথরের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীর তৎপরতা রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের অভিযোগও রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে প্রায় ৩০টি মামলা রয়েছে। তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে অন্তত ১৫টি মামলা, যার অধিকাংশই হত্যা-সংক্রান্ত বলে জানিয়েছেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমেদ।
দুর্গাপুর উপজেলার কাকড়াকান্দা এলাকার আবদুস ছাত্তারের ছেলে শামীম আহমেদের বিরুদ্ধে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা, অবৈধ অস্ত্রের কারবার, ডাকাতি ও সীমান্তে চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। তিনি একটি অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্ত্র মামলায় সাজা, পরে গ্রেপ্তার ও জামিন
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে একটি অস্ত্র মামলায় আদালত তাজুল ইসলামকে ১০ বছর সাত মাসের কারাদণ্ড দেন। এরপর তিনি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে কলমাকান্দা উপজেলা থেকে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করে তৎকালীন র্যাব, বর্তমানে এসআরবি নামে পরিচিত বাহিনী।
তবে ওই সময় তাঁকে শুধু নতুন অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছিল এবং আগের মামলা ও সাজাসংক্রান্ত তথ্য গোপন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সাংবাদিক ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির নেত্রকোনা প্রতিনিধি গজনবী বিপ্লব জানান, এ বিষয়ে আলিফ তৎকালীন পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।
আলিফের স্বজন ও সহকর্মীদের অভিযোগ, এ ঘটনার পর তৎকালীন পুলিশ সুপার ফয়েজ আহম্মেদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। পরে ধর্ষণসহ দুটি মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে আলিফ অভিযোগ করেছিলেন। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। ২০২৫ সালে ওই দুটি মামলায় অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় তিনি অব্যাহতি পান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেও দুইবার হত্যার চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি
আলিফের স্বজন ও সহকর্মীদের দাবি, গত বছর অন্তত দুইবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারিতে দুর্গাপুর শহরে পুলিশের উপপরিদর্শক শফিকুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর কিছুক্ষণ আগে একই রাস্তা দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলেন আলিফ। হামলাকারীরা তাঁকে ভেবে ভুল করে শফিকুল ইসলামকে হত্যা করেছিল বলে তাঁদের ধারণা।
এরপর গত বছরের নভেম্বরে দুর্গাপুর শহরে রামদা ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আলিফের ওপর হামলা চালানো হয়। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। ওই হামলা থেকেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি।
এসব ঘটনার পর গত বছরের ৩০ নভেম্বর নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলামের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় নিজের নিরাপত্তাঝুঁকির কথা জানিয়েছিলেন আলিফ। তাঁর সহকর্মীদের দাবি, সীমান্ত এলাকার অপরাধীদের তথ্য প্রকাশের কারণে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
দুই আত্মীয় গ্রেপ্তার, চলছে তদন্ত
আলিফ হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ১৮ অক্টোবর কিলার তাজুলের ভাতিজা সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্বকে (২২) গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর হেফাজতে অস্ত্রভর্তি একটি ব্যাগ ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাঁকে আদালতে হাজির করে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, গত ২০ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর থেকে আশিকুর রহমান প্রাঙ্গণকে (২১) গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি শুটার শামীমের ভাগ্নে। পরদিন আদালত তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, গ্রেপ্তার দুজনের একজন শুটার শামীমের ভাগ্নে এবং অন্যজন কিলার তাজুলের ভাতিজা। মূল হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম জানিয়েছেন, আলিফ হত্যার পাশাপাশি আগের ঘটনাগুলোও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। মূল হোতাদের গ্রেপ্তারে পুলিশ দিনরাত কাজ করছে। পুলিশের ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ জাহিদুল হাসানও বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
বিচারের দাবিতে মানববন্ধন, কাঁদলেন মা
সাংবাদিক আলিফ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে নেত্রকোনা জেলা শহর ও কলমাকান্দায় মানববন্ধন করেছেন স্বজন, এলাকাবাসী ও সাংবাদিকেরা।
গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে কলমাকান্দা উপজেলার গোগলা ইউনিয়নের শুনই গ্রামে আলিফের বাড়ি ফকিরবাড়ি মোড়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে তাঁর মা জোবেদা আক্তার, বড় ভাই শহীদুল ইসলাম ফকির ও সাদেক ফকির, বোন কল্পনা আক্তার ও মিলা, স্থানীয় বাসিন্দা নাজমুল হাসান এবং স্কুলশিক্ষক ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য সঞ্চয় নন্দীসহ এলাকাবাসী অংশ নেন।
মানববন্ধনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জোবেদা আক্তার বলেন, তিনি ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চান। দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জানান তিনি।
একই দিন বেলা ১২টার দিকে নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়ায় জেলা প্রেসক্লাবের সামনে আরেকটি মানববন্ধন হয়। গ্রামীণ সাংবাদিক ফাউন্ডেশনের ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি হায়দার জাহান চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুখলেছুর রহমান, সাংবাদিক এরশাদুল হক জনিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা অংশ নেন।
আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, অপরাধ অনুসন্ধান ও তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁর স্বামী বারবার প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছিলেন। নিরাপত্তার আশঙ্কার কথা পুলিশকে জানানোর পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এখন আলিফ হত্যা মামলার তদন্তে মূল পরিকল্পনাকারী ও হামলাকারীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি আগের হামলার ঘটনাগুলোর সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। স্বজন, সহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au