সাংবাদিক আলিফ হত্যা: সীমান্তের দুই গডফাদারকে ঘিরে সন্দেহ
নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকায় মাদক কারবার, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা এবং বালু-পাথরের বাণিজ্য নিয়ে অপরাধীদের তৎপরতার তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতেন সাংবাদিক…
খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বাড়ছে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ। এর মধ্যে নগরীর লবণচরা এলাকায় মায়ের সামনে খুশি বেগম (২৫) নামের এক গৃহবধূকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় আলোচনায় এসেছে ‘আশিক বাহিনী’। নিহতের মায়ের অভিযোগ, হত্যায় জড়িত ব্যক্তি এই বাহিনীর সদস্য। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফল এখনো নিশ্চিত নয়।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়ার ৭ নম্বর গলি এলাকায় রিকশা থেকে নামার পর খুশি বেগমকে গুলি করা হয়। এ ঘটনায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খুলনার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বি-কোম্পানি, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আরমান গ্রুপ, শাকিল গ্রুপ, নাসিম গ্রুপ, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ ও টেংকি শাওন গ্রুপ। তবে এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।
কারা এই আশিক বাহিনী
খুলনার চানমারী এলাকার আশিক ইসলামকে কেন্দ্র করে ‘আশিক বাহিনী’ বা ‘আশিক গ্রুপ’ গড়ে ওঠে বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গোষ্ঠীটি লবণচরা ও খুলনা সদর থানার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, জমি দখল, পরিবহন খাতে অর্থ আদায়, অস্ত্রের মহড়া এবং বিভিন্ন সহিংস ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলায় প্রথম আশিকের নাম আসে। এরপর বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে মোট ১০টি মামলার তথ্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আশিকের বাবা জুলফিকার আলী ওরফে জুলফি সুন্দরবন এলাকার একজন পরিচিত ডাকাত ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তার মৃত্যু হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রায় এক দশক আগে এলাকার কিশোরদের নিয়ে আশিক একটি দল গড়ে তোলেন। সময়ের সঙ্গে দলটির সদস্যদের বিরুদ্ধে অস্ত্র প্রদর্শন, মাদক কারবার ও বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠতে থাকে। আশিকের বড় ভাই সজিবের নামও এই অপরাধী চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আলোচনায় এসেছে। গত বছর বিপুল পরিমাণ মাদকসহ যৌথ বাহিনীর হাতে সজিব গ্রেপ্তার হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধান সহযোগীদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ
আশিকের প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত ফয়সালের নামও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। খুলনা সদরের দক্ষিণ টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফয়সালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় আটটি মামলার তথ্য রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে একটি হত্যা মামলায় তার নাম আসে এবং ২০১৮ সাল থেকে আশিকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আশিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন বস মিজান, আব্দুল্লাহ, পালসার সোহেল, কাউট বাসার, জাহিদুল ইসলাম, হেলাল, নাদিম, ডালিম, পারভেজ, দুলাল, অপু, সাগর লেলিন, জিহাদ হোসেন জিয়া, আরমান, সাইফুল ইসলাম পিটিল, গোলাম মোস্তফা ওরফে ট্যারা মোস্ত, মো. ইয়াছিন, মো. নিয়াজ মোর্শেদ, শেখ বাবুল ও স্পিকার মিরাজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইফুল ইসলাম পিটিল জোড়া হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে, স্পিকার মিরাজকে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ ও মামলার বর্তমান অবস্থা সংশ্লিষ্ট নথি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন কয়েকজন
২০২৬ সালের মধ্যভাগ থেকে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে আশিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৩ জুন লবণচরা এলাকা থেকে পারভেজ গাজী (৩২) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ তাকে আশিক গ্রুপের অন্যতম শীর্ষ শুটার হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।
এ ছাড়া গত আগস্টে নিরালা আবাসিক এলাকা থেকে শিবলী হোসেন রুবেলকে একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। চানমারী বাজার ও মতিয়াখালী এলাকা থেকে র্যাবের অভিযানে ইমন শরীফ ও সজল খান নামের আরও দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে দেশীয় পাইপগান ও ইয়াবাসহ ইয়াসিন নামের আরেক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, আশিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০ জন অস্ত্রধারী সদস্য রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় শতাধিক মামলা রয়েছে। তবে এসব সংখ্যা ও অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং মামলার নথি দিয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
খুলনায় হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনে দেওয়া খুলনা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৩টি। পুলিশের হিসাবে, ১৯টি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং এসব ঘটনায় ৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলোর তদন্ত চলছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তদন্তে শনাক্ত হওয়া হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে নয়টি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ, সাতটি মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব, দুটি ইজিবাইক চুরি এবং একটি চুরির সন্দেহে গণপিটুনির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে, খুলনা জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর বাইরের জেলার নয়টি থানায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৫টি মামলা হয়েছে এবং ২৫টির রহস্য উদ্ঘাটনের কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে নয়টি গুলিতে, চারটি পারিবারিক বিরোধে, দুটি শ্বাসরোধে, দুটি রাজনৈতিক কারণে, ১৩টি সামাজিক বিরোধে এবং তিনটি কুপিয়ে হত্যার ঘটনা। আরও দুটি হত্যাকাণ্ডের কারণ অজ্ঞাত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গুলিতে ও কুপিয়ে সংঘটিত কয়েকটি হত্যার পেছনে মাদক, চুরি-ছিনতাই এবং আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ কাজ করেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
খুলনায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র অপরাধের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। পুলিশ ও যৌথ বাহিনী অভিযান জোরদারের কথা বললেও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে এবং জামিনে মুক্তির পর কেউ যেন আবার অপরাধে জড়াতে না পারে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা হবে।
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au