ক্যানবেরায় বাপার দুর্গাপূজার ২০ বছর পূর্তি উদ্যাপনে অংশগ্রহণকারীদের একাংশ। ছবি: সরবরাহকৃত
ওটিএন বাংলা, ক্যানবেরা: দেবীর আরাধনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আর প্রজন্মের মেলবন্ধনে দুর্গাপূজা আয়োজনের দুই দশক উদ্যাপন করল বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া পূজা অ্যাসোসিয়েশন—বাপা। ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর ক্যানবেরায় অনুষ্ঠিত তিন দিনের এই উৎসবে স্থানীয় ও আশপাশের এলাকার পাঁচ শতাধিক ভক্ত ও দর্শনার্থী অংশ নেন। বিশ বছর আগে ছোট পরিসরে শুরু হওয়া একটি উদ্যোগের আজকের বিস্তৃত রূপ উঠে আসে এবারের আয়োজনে।
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও দেবীর আসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গোৎসব। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পূজার ধারাবাহিক আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন ভক্তরা। রোববার, ১৮ অক্টোবর সিঁদুরখেলা, আরতি নৃত্য ও বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তিন দিনের আয়োজন। দেবীকে বিদায়ের আবেগের সঙ্গে মিশে ছিল অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তা।
সুসজ্জিত উৎসবস্থলে পরিবার-পরিজন ও পরিচিতজনদের নিয়ে সমবেত হন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। পূজার ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি আড্ডা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও একসঙ্গে প্রসাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় আন্তরিক মিলনমেলার পরিবেশ। তিন দিনজুড়ে নিরামিষ প্রসাদ, দুপুর ও রাতের খাবার, হালকা নাশতা এবং পানীয়ের ব্যবস্থা ছিল। এই সম্মিলিত আপ্যায়ন হয়ে ওঠে নতুন পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে তোলারও উপলক্ষ।
এবারের উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সংগীত, নৃত্য ও নানা পরিবেশনার অধিকাংশেই অংশ নেন বাপার নিজস্ব শিল্পী ও সদস্যরা। অভিজ্ঞ শিল্পীদের পাশাপাশি শিশু-কিশোর ও তরুণ পরিবেশকদের অংশগ্রহণে উঠে আসে সংগঠনটির ভেতরে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক চর্চার পরিচয়। শিশুদের রং করার প্রতিযোগিতা ও পারিবারিক কার্যক্রম নতুন প্রজন্মকে উৎসবের সঙ্গে যুক্ত করে।

বাপার দুর্গোৎসবে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজনে খুদে অংশগ্রহণকারীরা। ছবি: সরবরাহকৃত
বাপার এই দুই দশকের পথচলায় গুরুত্ব পেয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং সবার অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষামূলক উদ্যোগ ও সামাজিক সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ গড়ে তুলতে কাজ করেছে।
সময়ের সঙ্গে সেই পরিসরে যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন ভাষা ও সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষ। বাংলাদেশ ও ভারতের পাশাপাশি নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ নানা দেশের পরিবার বাপার পূজা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও সামাজিক আয়োজনে অংশ নিয়েছে। দেবী দুর্গার সাহস, প্রজ্ঞা, মমতা ও ন্যায়ের আদর্শকে সামনে রেখে এসব আয়োজন হয়ে উঠেছে সংস্কৃতির আদান-প্রদান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ক্ষেত্র।
নিজস্ব আয়োজনের বাইরেও কমিউনিটি উৎসব, সাংস্কৃতিক বিনিময়, দাতব্য কার্যক্রম এবং অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে অংশ নিয়ে ক্যানবেরার বহুসাংস্কৃতিক পরিসরে অবদান রেখে চলেছে বাপা। এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে সংগঠনটি।
বাপার সাংস্কৃতিক ও মননশীল চর্চার আরেকটি অংশ বার্ষিক প্রকাশনা ‘কৃষ্টি’। সাহিত্য, দর্শন, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবনার এই প্রকাশনায় বেদান্তের শিক্ষা এবং সাধক ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটে। সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সংরক্ষণের পাশাপাশি মানবিকতা ও আত্মিক উপলব্ধির চর্চায় পাঠকদের উৎসাহিত করাও এর উদ্দেশ্য।
বিশ বছর পূর্তিতে এই দীর্ঘ যাত্রার সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবক, কমিটির সদস্য, পৃষ্ঠপোষক, স্পনসর, শিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীদের অবদান স্মরণ করেছে বাপা।
আগামী দিনেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখা, নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা এবং ঐক্য, সেবা ও অন্তর্ভুক্তির মূল্যবোধ নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে সংগঠনটি। ক্যানবেরায় বাপার দুর্গাপূজার বিশ বছর তাই একটি উৎসবের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি প্রবাসে একসঙ্গে থাকা, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তা তুলে দেওয়ার গল্পও।