বিশ্ব

ফ্রান্স থেকে স্পেন, ইউরোপজুড়ে কেন রাস্তায় নামছে জেন-জি?

  • 12:42 am - October 27, 2026
  • পঠিত হয়েছে:১৩৮ বার
সম্প্রতি ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, বেলজিয়াম, আলবেনিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণ প্রজন্ম বা `জেন-জি’ ব্যাপক মাত্রায় আন্দোলেন শুরু করেছে। ছবি: সংগৃহীত

আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভে নেমেছে তরুণ প্রজন্ম। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, বেলজিয়াম, আলবেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া এসব আন্দোলনে উঠে আসছে একটি অভিন্ন বার্তা: বর্তমান ব্যবস্থা তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে না। এতে চাপে পড়ছে দেশগুলোর সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

ইউরোপের একাধিক দেশে তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন সংকট, আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল অবকাঠামো। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীরা। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, গ্রিস ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে এসব আন্দোলন সরকারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

তরুণদের অভিযোগ, ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অথচ সেই অনিশ্চয়তা কাটাতে সরকারগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা মিলছে না। ফলে দেশে দেশে ভিন্ন ভিন্ন ইস্যুতে শুরু হওয়া আন্দোলনগুলোর মধ্যে আবাসন, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়ে মিল দেখা যাচ্ছে।

দেশে দেশে ভিন্ন ইস্যু, ক্ষোভের জায়গা এক

স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাস্কালকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা তরুণদের প্রতিবাদের অন্যতম উপলক্ষ হয়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ এবং স্কুলের অবকাঠামো সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন।

অন্যদিকে, আলবেনিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে।

দেশভেদে আন্দোলনের কারণ আলাদা হলেও তরুণদের মধ্যে একটি সাধারণ উদ্বেগ স্পষ্ট। তাঁদের অনেকের ধারণা, আগের প্রজন্মের তুলনায় এখন বাড়ি কেনা বা ভাড়া নেওয়া, মানসম্মত শিক্ষা অর্জন এবং স্থিতিশীল চাকরি পাওয়া অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।

ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউনিয়ন ন্যাশনাল দেৎতুদি আঁদে ফ্রঁস (ইউএনইএফ)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস ডি ব্রিটো মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, এসব আন্দোলনের মধ্যে পার্থক্যের চেয়ে মিলই বেশি।

তিনি বলেন, “আমরা সবাই শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামগ্রিকভাবে তরুণ প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছি। একই সঙ্গে আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আবাসন সমস্যা নিয়েও আলোচনা করছি।”

ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

আবাসন ও শিক্ষার সংকটের পাশাপাশি পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও উদ্বিগ্ন তরুণেরা। এসব পরিবর্তন তাঁদের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বেলজিয়ামভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইউরোপিয়ান করেসপন্ডেন্ট-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিনটেলম্যানের মতে, এসব বিক্ষোভ সরকারের প্রতি তরুণদের হতাশার প্রতিফলন।

তিনি বলেন, “তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এমন একটি অনুভূতি তৈরি হয়েছে যে, ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।”

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ

ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ এবং স্কুলের অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নতুন নয়। প্রায় নয় বছর ধরে এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করে আসছেন তাঁরা।

কিন্তু দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা।

ছাত্রনেতা অ্যালিস ডি ব্রিটো সিএনএনকে বলেন, “মানুষ উত্তরের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।”

রোম থেকে লিসবন, আবাসন সংকটে বিপাকে শিক্ষার্থীরা

ইতালির রাজধানী রোমে আবাসন ব্যয় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাঁদের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে।

রোমের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে সিএনএনকে বলেন, তিনি ও তাঁর ভাই মিলে যে কক্ষে থাকেন, সেটির ভাড়া পরিশোধ করতেই তাঁদের হিমশিম খেতে হয়।

একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে পর্তুগালেও। সেখানে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে রাজধানী লিসবনে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়ে বিক্ষোভ করেছেন।

আবাসন সংকটের এই চিত্র তরুণদের মধ্যে বৃহত্তর একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে: শিক্ষা শেষ করে চাকরি পেলেও যদি বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করা কঠিন হয়, তাহলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ কতটা বাস্তবসম্মত?

ইতালি ও গ্রিসে বিনা মূল্যে শিক্ষার দাবি

ইতালি ও গ্রিসে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের মানোন্নয়ন, বিনা মূল্যে সরকারি শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জনসেবামূলক খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীদের অনেকে স্লোগান দিয়েছেন, “গ্রিস থেকে ফ্রান্স, আমরা চাই সবার জন্য উন্মুক্ত ও বিনা মূল্যে শিক্ষা।”

এই দাবির মধ্য দিয়ে শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য কমানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে।

আলবেনিয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলন

আলবেনিয়ায় গত সপ্তাহে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন এবং অস্থিরতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দায়ী করেন।

তবে আন্দোলনকারীদের একাংশ সরকারের পরিবর্তন দাবি করছেন। রয়টার্সকে এক বিক্ষোভকারী বলেন, “আমরা পরিবর্তন চাই, আর সে কারণেই আমরা এখানে এসেছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা বিপ্লব চাই, আমরা নতুন সরকার চাই। আমরা কোনো আলোচনার পথে যেতে চাই না; আমাদের যত দ্রুত সম্ভব একটি নতুন সরকার প্রয়োজন।”

আরও বিক্ষোভের প্রস্তুতি

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আগামী দিনগুলোতেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত রয়েছে।

জার্মানিতে ‘জেন জেড রেগেল্ট’ বা ‘জেন-জি সব সামলে নেবে’ নামে একটি গোষ্ঠী ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। স্পেনের ট্রেড ইউনিয়নগুলো ১১ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটেন ও ইতালির ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে ২০ নভেম্বর কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে।

আন্দোলনের কেন্দ্রে তরুণদের ভবিষ্যৎ

ইউরোপের দেশগুলোতে চলমান আন্দোলনগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ হিসেবে দেখার সুযোগ কম। আবাসন সংকট, শিক্ষার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় তরুণদের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি করেছে, বিভিন্ন দেশের আন্দোলনে তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

দেশভেদে দাবি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলাদা হলেও তরুণদের মূল উদ্বেগ প্রায় একই: শিক্ষা শেষ করে কাজ পাওয়া, সাধ্যের মধ্যে বাসস্থান নিশ্চিত করা এবং সম্মানজনক জীবনযাপন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে সরকারগুলো কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর আন্দোলনের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে। একই সঙ্গে এসব বিক্ষোভ ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে: বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা কি নতুন প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে?

সূত্র : সিএনএন, এনডিটিভি 

এই শাখার আরও খবর

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থান সম্পর্কে দুর্গাপূজা কী বার্তা দেয়?

দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্‌যাপন, পূজামণ্ডপে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি এবং ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে বিএনপি সরকার। তবে উৎসব নির্বিঘ্নে শেষ হওয়াই…

বাংলাদেশে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী গড়তে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশে ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী নগরী’ প্রতিষ্ঠা, কৃষির আধুনিকায়ন এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়াতে জাপানের সহায়তা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত…

‘আমি শুধু চাই, তাকে থামানো হোক’: দণ্ডিত ধর্ষকের বিরুদ্ধে সাহসী সতর্কবার্তা ভুক্তভোগীর

দুই তরুণীকে ধর্ষণের দায়ে কারাদণ্ড ভোগ করা এক ব্যক্তি আবারও একই ধরনের অপরাধের চেষ্টা করছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় প্রতিবন্ধী সহায়তা কর্মসূচি এনডিআইএসের…

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের হুমকিতে অস্বস্তিতে অস্ট্রেলিয়ার লেবার পার্টি, চাপে প্রধানমন্ত্রী আলবানিজ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর হুমকি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজের জন্য রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানির…

দিল্লিতে হঠাৎ এনএসআই মহাপরিচালক, আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন

বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সারওয়ার ফরিদের দিল্লি সফরকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য…

সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি

আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে এবং প্রয়োজন হলে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও কমিউনিটি…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au