নিহত শিক্ষক মনোরঞ্জন রায়। ছবি : সংগৃহীত
ওটিএন বাংলা রিপোর্ট : প্রয়াত বন্ধুর পরিবারের পাশে ছিলেন প্রায় ১৩ বছর। সেই পরিবারের বিরোধ মেটাতে গিয়েই প্রাণ হারালেন দিনাজপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জন রায় (৫৫)।
তাঁকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সামনে এসেছে বাড়ির যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে বিরোধ, নির্মাণকাজের পারিশ্রমিক এবং কাঠের হিসাব নিয়ে দ্বন্দ্বের তথ্য। একাধিক বিরোধের জেরে কীভাবে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠল, কার সঙ্গে কার বিরোধ ছিল এবং শিক্ষক মনোরঞ্জন কেন হামলার শিকার হলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
গত রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বেলাইচণ্ডি ইউনিয়নের নয় মোল্লাপাড়া গ্রামে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। মনোরঞ্জন চিরিরবন্দর উপজেলার চক সুকদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর ছেলে চন্দন কুমার রায় মামলা করেছেন। পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
রাস্তার জমি নিয়ে বিরোধ
মনোরঞ্জন রায়ের সঙ্গে নয় মোল্লাপাড়া গ্রামের প্রয়াত আজিজুল হকের বন্ধুত্ব ছিল দীর্ঘদিনের। প্রায় ১৩ বছর আগে আজিজুলের মৃত্যুর পরও তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন মনোরঞ্জন। পরিবারের সদস্যদের পড়াশোনা ও অন্যান্য প্রয়োজনে সহযোগিতা করতেন তিনি। সম্প্রতি আজিজুলের পরিবার পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি নির্মাণ শুরু করে। এরপর বাড়ির পাশে যাতায়াতের রাস্তার জায়গা নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বাড়ি নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত জায়গা না ছাড়ার অভিযোগে প্রতিবেশীদের কয়েকজন মনোরঞ্জনের ওপরও ক্ষুব্ধ ছিলেন। বাড়ির রাস্তা নিয়ে বিরোধের কারণে দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই উত্তেজনা চলছিল।
নির্মাণকাজের পারিশ্রমিক নিয়ে দ্বন্দ্ব
বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি বেড়া তৈরির কাজের পারিশ্রমিক নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়। আজিজুলের ছেলে আল-রোমানের ভাষ্য অনুযায়ী, কাঠমিস্ত্রি ফরতাজ হোসেনের সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি বণ্টন ও কাঠের হিসাব নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। ফরতাজ শ্রমিকপ্রতি ৮০০ টাকা পারিশ্রমিক দাবি করেছিলেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, পারিশ্রমিক নিয়ে অসন্তোষের জেরে ফরতাজকে কাজ থেকে বাদ দিয়ে অন্য শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো শুরু হয়। এতে বিরোধ আরও তীব্র হয়। ঘটনার দিন ফরতাজ ও প্রতিবেশী আসাদুজ্জামানসহ কয়েকজন ওই বাড়িতে যান। সেখানে আজিজুলের স্ত্রী রোমানা বেগমের সঙ্গে তাঁদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিরোধ মেটাতে সেখানে যান মনোরঞ্জন।
বিরোধ মেটাতে গিয়ে হামলার শিকার
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িতে পৌঁছানোর পর মনোরঞ্জনের সঙ্গে ফরতাজের কথা-কাটাকাটি হয়। তাঁকে ধর্মমেয়ের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে অপমান করা হয়েছিল বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
একপর্যায়ে মনোরঞ্জনের ওপর হামলা চালানো হয়। তাঁকে সজনে গাছের ডাল ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে ধাওয়া করা হয়। পরে তিনি পাশের একটি ধানখেতে পড়ে যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বন্ধুত্বের সম্পর্কও ঠেকাতে পারেনি সহিংসতা
আজিজুলের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন তাঁর পরিবারের পাশে ছিলেন মনোরঞ্জন। সেই সম্পর্কের কারণেই বিরোধ মেটাতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি।
ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পার্বতীপুর মডেল থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় আসাদুজ্জামান ও আশিকুজ্জামান আলো মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতের ছেলে চন্দন কুমার রায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তদন্ত চলছে।