তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করল পিবিআই। ছবিঃ সংগৃহীত
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটানো ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসা থেকে তাঁকে হেফাজতে নেয় পিবিআই। পরদিন শুক্রবার তাঁকে নিয়ে টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হয়। পরে তাঁকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার দিবাগত রাতে পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বি ব্লকের একটি বাসার তৃতীয় তলা থেকে দীপকে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজার ছেলে।
ঘটনাস্থলে নিয়ে তথ্য যাচাই, উদ্ধার মোটরসাইকেল
শুক্রবার দীপকে নিয়ে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় যায় পিবিআইয়ের তদন্ত দল। তুরাগ নদসংলগ্ন বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের পাশের মাঠে সেদিন রাতে কী ঘটেছিল, তা জানতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকা থেকে একটি কালো রঙের সুজুকি জিক্সার ১৫০ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেলটির নম্বরপ্লেট ছিল না।
মোটরসাইকেলটি তাহসিফের কি না, তা নিশ্চিত হতে এর কাগজপত্র, ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা হচ্ছিল। মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে মোটরসাইকেলটি প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে পাওয়া যায়।
পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেন, ঘটনার রাতে তিনি ও তাহসিফ তুরাগ নদসংলগ্ন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে কথা বলার সময় কয়েকজন তাঁদের ধাওয়া করেন। দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ধাওয়াকারীদের মধ্যে দুজনের পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম ছিল। তাঁদের দেখে তাহসিফ দৌড় দেন এবং একপর্যায়ে নদীতে ঝাঁপ দেন। অন্যদিকে দীপ বিআইডব্লিউটিএর ২৯ নম্বর সীমানা পিলারের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। পরে সেখান থেকে চলে যান তিনি।
তবে ধাওয়াকারীরা প্রকৃতপক্ষে পুলিশ সদস্য ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি পিবিআই। পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. এনায়েত হোসেন মান্নান শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। সেখানে পুলিশের কেউ ছিলেন কি না, ইউনিফর্ম পরা ব্যক্তিদের সেখানে কোনো দায়িত্ব ছিল কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীপের বক্তব্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। তাঁরা কেন ওই মাঠে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিয়েছেন। একপর্যায়ে সেখানে যাওয়ার কথাও অস্বীকার করেন। পরে মোটরসাইকেলটির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তাহসিফ তাঁকে মোটরসাইকেলে করে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই এলাকা আগে থেকে তাঁর পরিচিত ছিল না বলেও দাবি করেন দীপ।
ঘটনার রাতে তাঁদের সঙ্গে অন্য কেউ বা কোনো নারী ছিলেন কি না, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ কললিস্ট ও বার্তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত দীপের সঙ্গে তাহসিফের ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ১০ থেকে ১২ বার যোগাযোগ হয়েছিল।
তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগে যা ঘটেছিল
গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের ডাকে সাড়া দিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি।
এর আগে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাহসিফ ও দীপকে একসঙ্গে দেখা যায়। ফুটেজে তাঁদের হাত মেলাতে দেখা গেছে। এরপর তাঁরা আলাদা দুটি মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান।
পরিবারের কাছে দীপ জানিয়েছিলেন, তাহসিফের মোটরসাইকেলে সমস্যা হওয়ায় তাঁরা একটি ওয়ার্কশপে গিয়েছিলেন। মোটরসাইকেল ঠিক করার পর একসঙ্গে খাবার খেয়ে তিনি চলে যান। তবে পিবিআইয়ের তদন্তে তাঁদের রাতের চলাফেরা ও যোগাযোগের বিষয়ে আরও তথ্য সামনে এসেছে। দীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতের কোনো একপর্যায়ে তাঁরা টঙ্গীর তুরাগ নদসংলগ্ন এলাকায় যান।
তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসতে থাকার খবর পেয়ে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে সেটি উদ্ধার করেন। পরে হাতঘড়ি ও পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে মরদেহটি তাহসিফের বলে শনাক্ত করা হয়।
পরদিন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জানাজা শেষে ১২ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম ছেলের মৃত্যুকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। ধাওয়ার মুখে তাঁর ছেলে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে দীপ যে দাবি করেছেন, সেটিও প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি। বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফ সাঁতার জানতেন। পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেও তিনি সাঁতারের কোর্স করেছিলেন। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
মৃত্যুর কারণ জানতে চলছে তদন্ত
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের সময় তাঁর শরীর থেকে সংগ্রহ করা রক্ত, পাকস্থলী, কিডনি ও ভিসেরার নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এসব পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
পিবিআই কর্মকর্তারা জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় মূল তদন্ত করছে নৌ পুলিশ। ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় পিবিআই ছায়া তদন্তের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ ও যাচাই করেছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে গিয়ে পৌঁছালেন, ঘটনার রাতে তাঁর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল, দীপের বক্তব্যের অসংগতির কারণ কী এবং অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং নৌ পুলিশের তদন্তের ভিত্তিতেই তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার কথা।