তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করল পিবিআই
বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর সঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় কাটানো ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের…
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ভোট গণনা শেষ হলেও নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন কোনো পক্ষই এককভাবে পায়নি। এমন পরিস্থিতিতে তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন বা তাদের সমর্থন নেওয়ার প্রশ্নে বিরোধীদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় সরকার গঠনের সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার ভোরে প্রকাশিত চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। এর মধ্যে তাঁর দল লিকুদ পার্টির আসন ২৭টি। অন্যদিকে নেতানিয়াহুবিরোধী শিবির পেয়েছে ৪৮টি আসন। আরব দলগুলোর জোট জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম পেয়েছে মোট ১৯টি আসন। এই দুই দলের সমর্থন বিরোধীরা নিশ্চিত করতে পারলে তাদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা দাঁড়াবে ৬৭, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে ছয়টি বেশি।
এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। কয়েক দশকের মধ্যে এটি দেশটির সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির অন্যতম ঘটনা। তবে ভোটের ফলাফলে কোনো পক্ষের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় এখন সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দর-কষাকষিই হয়ে উঠেছে প্রধান বিষয়।
নেতানিয়াহুকে সরিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার কয়েক দফা বৈঠক করেছেন বিরোধী শিবিরের নেতারা। ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান আলাদাভাবে রাআম দলের চেয়ারম্যান মনসুর আব্বাস, ইয়াশার পার্টির চেয়ারম্যান গাদি আইজেনকট এবং বি’য়াচাদ দলের নেতা ইয়ার লাপিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
অন্যদিকে বি’য়াচাদ দলের চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেট বৈঠক করেন গাদি আইজেনকট ও ইয়ার গোলানের সঙ্গে। এসব আলোচনায় সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে বিরোধী শিবিরের ভেতরেই এ নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। ‘টাইমস অব ইসরায়েল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী চার দলের মধ্যে তিনটি দল ইয়াশার, বি’য়াচাদ ও ইসরায়েল বেইতেনু আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে জোট সরকার গঠনে আগ্রহী নয়। ফলে আরব দলগুলোর ১৯ আসন যোগ করলে বিরোধীদের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৬৭ হলেও বাস্তবে সরকার গঠনের পথ এখনো পরিষ্কার নয়।
ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে কেবল ডেমোক্র্যাটস দলের চেয়ারম্যান ইয়ার গোলান প্রকাশ্যে আরব দলগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শুক্রবার ইসরায়েলের উদারপন্থী সংবাদপত্র ‘হারেৎজ’-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি আরব দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠনের জোরালো আহ্বান জানান।
গোলান তাঁর নিবন্ধে বলেন, গণতান্ত্রিক ইসরায়েলে কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব শর্তসাপেক্ষ হতে পারে না। একজন আরব নাগরিকের ভোটের মূল্য একজন ইহুদি নাগরিকের ভোটের সমান। শুধু পরিচয় বা নামের কারণে কয়েক লাখ নাগরিকের ভোটকে উপেক্ষা করা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। তাঁর মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা ছাড়া বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
অন্যদিকে বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ নির্বাচনের ফলকে নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের জয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, বিরোধীরা সরাসরি নিরঙ্কুশ জয় আশা করেছিলেন, কিন্তু তা হয়নি। তবে আগের পার্লামেন্টে নেতানিয়াহুর জোটের আসন ছিল ৬৮টি, এবার তা কমে ৫৩টিতে নেমেছে। এই ফলকে বিরোধীদের সাফল্য হিসেবে দেখছেন তিনি।
লাপিদের ভাষায়, ব্যবধান কম হলেও বিরোধীরা জিতেছেন। তিনি বলেন, ‘জয় মানেই জয়।’ তাঁর দাবি, নেতানিয়াহুর জোটের ৫৩টি আসনের মধ্যে ১৩টি পেয়েছে অতি রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই দুটি দল নিজেদের জায়নবাদী বলে মনে করে না। ওই ১৩টি আসন বাদ দিলে নেতানিয়াহুর পক্ষে থাকা বাকি আসনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০-এ।
বিরোধীরা যখন বিকল্প সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশ করছেন, তখন নিজেদের ডানপন্থী জোটের ঐক্য ধরে রাখতে তৎপর রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও। বৃহস্পতিবার জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী এবং উগ্র ডানপন্থী দল ওতজমা ইহুদিতের চেয়ারম্যান ইতামার বেন-গভিরের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি।
দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমান ডানপন্থী সরকার টিকিয়ে রাখা এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবাদে সমর্থনকারীদের সমর্থনপুষ্ট কোনো বামপন্থী সরকার গঠন ঠেকানোর বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। একই দিন উগ্র ডানপন্থী রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বেজালেল স্মোট্রিচের সঙ্গেও বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপ সমন্বয় করাই ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়।
চ্যানেল ১৪-এর বরাতে ‘টাইমস অব ইসরায়েল’ জানিয়েছে, বৈঠকে জোটের শরিকদের আশ্বস্ত করে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গেই থাকব।’ নির্বাচনে আসন কমে গেলেও ডানপন্থী জোটের ঐক্য ধরে রেখে সরকার গঠনের সম্ভাবনা বজায় রাখতে চাইছেন তিনি।
নতুন নেসেটের অধিবেশনের প্রস্তুতি
সরকার গঠনের আলোচনা চলার পাশাপাশি নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশনের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট। তাঁর দল নেসেটের অধিবেশন শুরু হওয়ার পরপরই কয়েকটি বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা করছে।
প্রস্তাবিত বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে সব ইসরায়েলি নাগরিকের জন্য সামরিক বাহিনীতে যোগদান অথবা জাতীয় সেবা বাধ্যতামূলক করা, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন এবং রাষ্ট্রীয় বাজেট বরাদ্দের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা।
ইসরায়েলের নতুন পার্লামেন্টের সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান আগামী ১০ নভেম্বর হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার গঠনের আলোচনা ওই সময়ের মধ্যে শেষ না হলেও নির্ধারিত দিনেই নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। তবে নতুন সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়া দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিরোধীরা আরব দলগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবেন কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে নেতানিয়াহু তাঁর বর্তমান জোটের ঐক্য ধরে রাখতে এবং জোটের বাইরে থাকা অন্য দলের সদস্যদের সমর্থন আদায় করতে পারবেন কি না, তার ওপরও পরবর্তী সরকারের ভাগ্য নির্ভর করছে।
নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘিরেও ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেইতের প্রধান ডেভিড জিনি এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গাদি আইজেনকট।
বৈঠকের পর আইজেনকট বলেন, নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। এ বিষয়ে পেশাদার সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক চাপের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে তদন্ত শেষ করার সুযোগ দিতে হবে। তদন্তের ফল প্রকাশের আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয় বলেও মনে করেন তিনি।
একই সঙ্গে আইজেনকট অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদ সমন্বিতভাবে নির্বাচনের ফলাফলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রচার চালাচ্ছে। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রচার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাই নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হবে।
শিন বেইত জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তদন্তের পরিসরও অত্যন্ত সীমিত। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, তদন্তের অজুহাতে আইন মেনে ভোট দেওয়া আরব নাগরিকদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা ঠিক হবে না।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে ব্যাপক নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, নির্বাচন আইন মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হওয়ার মতো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও বিরোধীরা এখনো সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। আরব দলগুলোর সমর্থন গ্রহণের প্রশ্নে বিরোধী দলগুলোর অবস্থান এক না হওয়ায় তাদের সংখ্যাগত সুবিধা এখনো কার্যকর রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়নি। অন্যদিকে নেতানিয়াহু নিজের জোট ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। ফলে ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের শপথ অনুষ্ঠানের আগে ইসরায়েলের রাজনীতিতে আরও আলোচনা, দর-কষাকষি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্রঃ জেরুজালেম পোস্ট ও টাইমস অব ইসরায়েল
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au