ছুটির পর ফ্রান্সে আবারও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু। ছবিঃ ফ্রান্স২৪
দুই সপ্তাহের ছুটি শেষে ফ্রান্সে আবারও শুরু হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। তবে আগের কয়েক সপ্তাহের তুলনায় এবার আন্দোলনের ব্যাপ্তি অনেকটাই কম। সোমবার রাজধানী প্যারিস, মার্সেই ও রেনসহ কয়েকটি শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশপথ অবরোধের চেষ্টা করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কার, শিক্ষকসংকট নিরসন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বাড়ানো এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তি ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।
ফরাসি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার সকাল থেকেই বিভিন্ন শহরের কয়েকটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ (গ্রিনিচ মান সময়) দেশটির প্রায় ৪১টি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় অবরুদ্ধ ছিল। দেশজুড়ে মোট উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১ শতাংশ।
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মার্সেইতে সোমবার সকালে একটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রবেশপথের সামনে কয়েকটি ময়লার পাত্র স্তূপ করে রাখেন আন্দোলনকারীরা। এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়।
সেখানে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ১৬ বছর বয়সী মেরিয়েম এএফপিকে বলেন, ‘আমরা আবার আন্দোলন শুরু করেছি। কারণ, আমাদের বলা হয়েছিল যে দাবিগুলোর বিষয়ে সমাধান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যা দেওয়া হয়েছে তা মোটেও যথেষ্ট নয়।’
বিদ্যালয়ের প্রবেশপথের সামনে রাখা একটি ময়লার পাত্রের ওপর বসে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
এর আগে দুই সপ্তাহের ছুটির আগে ফ্রান্সের তিন হাজারের বেশি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে কয়েক শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। গত সেপ্টেম্বরে প্যারিসের উপকণ্ঠে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমদিকে শিক্ষা খাতের সমস্যা নিয়ে আন্দোলন শুরু হলেও পরে এর পরিধি বাড়তে থাকে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষও আন্দোলনের অন্যতম দাবিতে পরিণত হয়। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্য ও সামাজিক আন্দোলনের কর্মীরাও যুক্ত হন।
কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। কোথাও কোথাও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সংখ্যালঘু সমর্থননির্ভর সরকারের জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সের এই আন্দোলনকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া কথিত ‘জেন জি’ বা তরুণ প্রজন্মের বিক্ষোভের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াসহ কয়েকটি দেশে তরুণদের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা এবং দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অবরোধের পরিসর সীমিত বলে দাবি শিক্ষামন্ত্রীর
ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে সোমবার সকালে ফ্রান্স ইন্টার রেডিওকে বলেন, বিদ্যালয় অবরোধ কিংবা অবরোধের চেষ্টার ঘটনা এখন খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে। তাঁর ভাষায়, মাত্র কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে। তবে বিদ্যালয়ে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা আইনত অপরাধ।
বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের প্রচারিত ফুটেজে কয়েকটি বিদ্যালয়ের আশপাশে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে। তবে তাঁদের পুরোপুরি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের পোশাকে দেখা যায়নি।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতিতেও সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা
শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরোনো ও জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবন সংস্কার, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য আসনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রচলিত পদ্ধতি বাতিল।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বর্তমান ব্যবস্থাকে সামাজিকভাবে বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, এই পদ্ধতিতে সব শিক্ষার্থী সমান সুযোগ পান না।
শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে।
তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৮ জনে সীমিত রাখা, বিদ্যালয় সংস্কারে ৪০০ কোটি ইউরো বরাদ্দ, উচ্চশিক্ষায় নতুন করে ১৫ হাজার আসন তৈরি এবং ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নতুন পদ্ধতি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রস্তাবিত ৪০০ কোটি ইউরোর বরাদ্দের লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন।
তবে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা সরকারের এসব প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের মতে, ঘোষিত উদ্যোগগুলো শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে যথেষ্ট নয়। তাই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
ফলে দুই সপ্তাহের ছুটির পর আন্দোলন তুলনামূলক ছোট পরিসরে ফিরলেও ফ্রান্সের শিক্ষা খাতের সংস্কার নিয়ে সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ এখনো কাটেনি।
সূত্রঃ ফ্রান্স২৪