গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ধানসহ বাড়ির মালপত্র ভ্যানে বা মাথায় করে সরিয়ে নিচ্ছেন পরিবারগুলো; ছবিঃ প্রথম আলো
মেলবোর্ন, ২৮ জুলাই- রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলদাদপুর ছয়ানি গ্রামে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কটূক্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এক কিশোরকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ১৯টি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনার পর গ্রাম ছেড়ে অনেকেই অন্যত্র সরে যাচ্ছেন। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ধানসহ বাড়ির মালপত্র ভ্যানে বা মাথায় করে সরিয়ে নিচ্ছেন তারা। নারীরা সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন-রাত কাটাচ্ছেন।
সোমবার (২৮ জুলাই) সকালেও গ্রামটিতে অস্থিরতা ও আতঙ্কের ছাপ ছিল স্পষ্ট। দেখা যায়, সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। আলদাদপুর নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খিলালগঞ্জ বাজার এলাকায় মোতায়েন রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ঘটনার পর গ্রাম ছেড়ে অনেকেই মালামাল নিয়ে অন্যত্র সরে যাচ্ছেন। ছবিঃ প্রথম আলো
গঙ্গাচড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল এমরান জানান, রনজন রায় নামের এক কিশোরের বিরুদ্ধে মহানবী (সা.)-কে অবমাননার অভিযোগ আসে। প্রমাণ পাওয়ার পর শনিবার রাতে তাকে আটক করা হয়। পরদিন সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দিয়ে আদালতের মাধ্যমে সম্মিলিত শিশু পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়।
তবে রনজনের পরিবারের দাবি, তার নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পোস্টটি দেওয়া হয়েছে। এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র, যার মাধ্যমে হিন্দু সম্প্রদায়কে গ্রাম থেকে বিতাড়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।
গ্রেফতারের পর শনিবার রাতেই উত্তেজিত জনতা রনজনের ও তার কাকার বাড়িতে হামলা চালায়। এরপর রবিবার বিক্ষোভ ও মানববন্ধনের নামে আরও কয়েক দফায় হিন্দুদের বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। হামলার সময় পুলিশের একজন কনস্টেবল আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ওসি।

অন্তত ১৯টি হিন্দু বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। ছবিঃ ওটিএন বাংলা
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানায়, ভাঙচুরের পাশাপাশি স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, গরু-ছাগল, এমনকি জমির কাগজপত্রও লুট হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী রোহেলা রাণী বলেন, ‘যদি আবার আগুন দেয়, তবে আর কিছুই থাকবে না।’
প্রতিবেশী হরিশচন্দ্র জানান, পরিস্থিতির অবনতি দেখে শ্বশুরবাড়ির গরু-ছাগল চন্দনপাটে নিজের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ নিজের বাড়ি ভাঙচুর হতে দেখেছেন দূর থেকে, কিন্তু কিছুই করতে পারেননি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য পরেশ চন্দ্র রায় জানান, আজও মিছিল বের করার হুমকি এসেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন কাজ করলেও মানুষ ভীত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, হামলার পেছনে কিশোরগঞ্জের মাগুরা ইউনিয়নের কিছু লোকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। পুলিশ ও সেনা মোতায়েন রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার পর দুটি স্থানীয় বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী আসেনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কালী রঞ্জন রায় বলেন, ‘বিদ্যালয়ের ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী সনাতন ধর্মাবলম্বী। অনেকেই পরিবারসহ বাইরে অবস্থান করছে।’
অভিযুক্ত রনজন রায়ের এক বন্ধু বলেন, সে এমন কাজ করতে পারে না। তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানান তিনি।

হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটে মোট ১৯ টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ছবিঃ ওটিএন বাংলা
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, গ্রামে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেকে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। বহু পরিবার এখনো গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
এই ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর ভয়াবহ আঘাত হিসেবে দেখছেন অনেকে। সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন সচেতন মহল।