নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাবাহিনী; ছবিঃ ওটিএন বাংলা
মেলবোর্ন, ৩০ জুলাই- রংপুরের গঙ্গাচড়ার আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামে ফেসবুকে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশ’ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুধবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক বার্তায় জানানো হয়, আলদাদপুর বালাপাড়া গ্রামে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের জেরে উত্তেজিত জনতা ভাঙচুর, লুটপাট এবং পুলিশের ওপর হামলা চালায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ রায় নামের এক ভুক্তোভোগী ব্যক্তি বাদী হয়ে অজ্ঞাত ১২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৬ জুন রাতে। ওই দিন ফেসবুকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে রঞ্জন রায় (২০) নামের এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে ওই গ্রামের সুজন রায়ের ছেলে এবং একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করে। রঞ্জন রায়কে গ্রেপ্তারের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

মেরামতের কাজ করছেন শ্রমিকরা; ছবিঃ ওটিএন বাংলা
ঘটনার দিন শনিবার (২৬ জুন) রাতেই উত্তেজিত জনতা দু’দফা রঞ্জন রায় এবং তার কাকা কেশব রায়ের বাড়িতে হামলা চালায়। পরদিন রবিবার (২৭ জুন) বিকেল ৩টার দিকে প্রায় ২ হাজার মানুষের একটি মিছিল আলদাদপুর গ্রামে আসে। পরে বিকেল ৪টার দিকে অভিযুক্ত রঞ্জন রায়ের বাড়ি ও তার প্রতিবেশীদের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাট চালায় মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৫টি পরিবারের ২২টি ঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি পরিবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এ ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছে। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, “এ ধরনের সহিংসতা কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি সংবিধানপ্রদত্ত সমান অধিকারের পরিপন্থী।”

কিছুক্ষন পরপর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন সন্ধ্যা রানি; ছবিঃ ওটিএন বাংলা
আসকের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একটি কিশোরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তাধীন থাকাকালে পুরো একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সংগঠিত হামলা চালানো হয়েছে, যা সংবিধান, আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। পুলিশ কিশোরটিকে গ্রেপ্তার করে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠালেও স্থানীয়ভাবে মাইকিং করে উসকানিমূলক প্রচার চালানো হয় এবং পরে বড় আকারের হামলা সংঘটিত হয়।
সংস্থাটি আরও উল্লেখ করে, “প্রশাসন সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েনের কথা বললেও, এই হামলার দায় এড়ানোর সুযোগ রাষ্ট্রের নেই। ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ধারাবাহিকতা বাড়ছে, অথচ অপরাধীরা বারবার রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি বিচারহীনতার এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত, যা সাংবিধানিক অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের পরিপন্থী।”
আসক সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ৪১ অনুচ্ছেদের কথা তুলে ধরে বলেছে, এসব অনুচ্ছেদ ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য ছাড়াই সমান অধিকার ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবচিত্র হচ্ছে, এসব অধিকার বারবার লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক।
এ ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।