লিড নিউজ

সরকারি হিসাবেই চলছে কাটা-ছেঁড়া, অভ্যুত্থানের এক বছর পরও নিহতের আসল সংখ্যা নিয়ে ‘ধোঁয়াশা’

  • 5:50 pm - August 06, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১১৬ বার
গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো ব্যাপক বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ছবিঃ বিবিসি

মেলবোর্ন, ৬ আগষ্ট- বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পেরিয়ে গেলেও, নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো ব্যাপক বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কোটা সংস্কারের আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে এক দফা দাবির আন্দোলনে রূপ নেওয়া এই গণঅভ্যুত্থান দেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড় নেয়, যার ফলশ্রুতিতে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের।

এই আন্দোলনের সময় যে প্রাণহানি ঘটে, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনো গণ-আন্দোলনে এত রক্তপাত ও প্রাণহানির নজির পাওয়া যায় না। তবে ঠিক কত মানুষ এই অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে বিভিন্ন পরিসংখ্যান উঠে আসছে, যার ফলে সৃষ্টি হয়েছে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি।

সরকারি হিসাবে, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত গেজেট অনুসারে, এই অভ্যুত্থানে ৮৪৪ জন নিহত হয়েছেন। তাদের ‘শহীদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নাম, পরিচয়সহ তালিকা প্রকাশ করেছে সরকার। কিন্তু জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন জানায়, নিহতের সংখ্যা প্রায় ১৪০০ জন, যাদের অধিকাংশই রাইফেল ও শটগানের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। জাতিসংঘের মতে, নিহতদের অন্তত ১২-১৩ শতাংশ শিশু। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই সময় আরও হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন এবং ১১ হাজার ৭০০ জনকে আটক করা হয়।

সরকারি তালিকা ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনের মধ্যকার এই বিস্তর পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। এমনকি সরকারের গেজেটেও অসংগতি ধরা পড়েছে। একাধিক নিহত ব্যক্তির নাম তালিকায় একাধিকবার এসেছে, অন্য কোনো ঘটনায় নিহত হলেও ভুল করে অনেকের নাম গেজেটে ঢুকে পড়েছে। আবার এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, আন্দোলনে নিহত হয়ে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়া ব্যক্তিদের নাম সরকারি তালিকায় নেই।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশরাত চৌধুরী জানান, গেজেট প্রকাশের পর নাগরিকদের কাছ থেকে অভিযোগ এসেছে। তদন্তের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, অন্তত ১৫-১৬ জনের নাম গেজেট থেকে বাদ দিতে হতে পারে। তার ভাষায়, “এই সংখ্যাটা ৮৪৪ থেকে কমবে।”

তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া ও তথ্য সংগ্রহে শৃঙ্খলার অভাব ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, “শুরুতে তালিকা তৈরিতে তৎপরতা থাকলেও এখন গা-ছাড়া ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। একটি সঠিক ও নির্ভুল তালিকা তৈরি না হলে এই ঘটনাগুলো ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই যায়।”

জাতিসংঘের রিপোর্টের সঙ্গে সরকারি গেজেটের ফারাকের অন্যতম একটি কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে, সরকারি তালিকায় শুধু আন্দোলনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে নিহত হয়েছেন। কিন্তু জাতিসংঘের হিসাবে, সেই সময় পুলিশ, আওয়ামী লীগ কর্মী এবং রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত অন্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ২০২৪ সালের অক্টোবরে এক তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে ৪৪ জন নিহত পুলিশ সদস্যের নাম রয়েছে। এই নামগুলোও সরকারি শহীদ তালিকায় নেই। কারণ সরকার শুধু আন্দোলনে নিহত সাধারণ নাগরিকদের শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আবার অনেক মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ হারালেও, তারা সরকারি বা আন্তর্জাতিক কোনো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হননি।

আরেকটি বিতর্কিত দিক হলো, ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে জুলাই-অগাস্ট মাসে ১১৪টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফনের তথ্য। ধারণা করা হচ্ছে, এদের অনেকেই আন্দোলনে নিহত। কিন্তু যেহেতু তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়নি, তাই তাদের নামও সরকারি তালিকায় আসেনি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এখন এই বেওয়ারিশ মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের কাজ শুরু করেছে। তবে সচিব ইশরাত চৌধুরী জানান, “এই প্রক্রিয়ায় এখনো আমরা জানি না কতজন রয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই সঠিক সংখ্যা জানা যাবে।”
এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা জোর দিয়ে বলছেন, এখনই নির্ভুল তালিকা তৈরি করা না হলে, ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি আরও বাড়বে। অনেক ভুয়া দাবিদার ক্ষতিপূরণ কিংবা সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। একইসঙ্গে যারা সত্যিকারের শহীদ, তাদের পরিবার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারে।

সবমিলিয়ে, অভ্যুত্থানের এক বছর পরও গণপ্রতিরোধে নিহতদের নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। সরকারি হিসাব ও আন্তর্জাতিক তথ্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক, বেওয়ারিশ দাফনের মরদেহ নিয়ে প্রশ্ন, গেজেটে ভুল নাম, কিংবা বাদ পড়াদের নিয়ে নতুন করে তদন্ত—সব মিলিয়ে এখনো একটি স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি হয়নি, যা এই আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই শাখার আরও খবর

পেলেটে ঝাঁঝরা মুখ, তবু অনুশোচনা নেই: হাসপাতাল থেকেই যন্তর মন্তরে ফেরার ঘোষণা

মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই:  দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে পুলিশের বলপ্রয়োগের ঘটনায় আহত হয়েও আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছা নেই বলে জানিয়েছেন ২৫ বছর…

বিশ্বকাপ ফাইনালে লাল কার্ডের পর মুখ খুললেন এনজো ফার্নান্দেজ

মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ শিরোপা হারানোর পর প্রথমবারের মতো মুখ খুলেছেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। ফাইনালে লাল কার্ড দেখে মাঠ…

অস্ট্রেলিয়ায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংক হিসেবে যাত্রা শুরু রেভলুটের, ব্যাংকিং খাতে বাড়ল নতুন প্রতিযোগিতা

মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ফিনটেক প্রতিষ্ঠান রেভলুট ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ট্রেলিয়ায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম শুরু করেছে। দেশটির আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে ব্যাংকিং…

ফিফার রেকর্ডে নেই লাল কার্ড, তবু পারেদেসের বিরুদ্ধে তদন্তে শাস্তির আশঙ্কা

মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: স্পেনের কাছে ১-০ গোলে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর ম্যাচ শেষে মাঠে ঘটে যাওয়া উত্তপ্ত সংঘর্ষের জেরে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়েন্দ্রো পারেদেসকে লাল কার্ড…

বাংলাদেশের ‘জুলাই শহীদ’ গেজেটে অনিয়ম, বাখের আলী ‘কবির’ হলেন যেভাবে

মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই:  বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত ‘জুলাই শহীদ’ গেজেট নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার সমন্বয়ে গঠিত অনানুষ্ঠানিক জোট MARK&AUA।…

হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি, তদন্ত চলছে

মেলবোর্ন, ২৩ জুলাই: ইরানের হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ লারাক দ্বীপে মার্কিন বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে দেশটির আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম। বুধবার…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au