আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়; ছবিঃ ববিসি বাংলা
মেলবোর্ন, ৭ আগষ্ট- আওয়ামী লীগ বর্তমানে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের শাসন পরবর্তী সময়ে দলটি এখন ক্ষমতার বাইরে। এই পরাজয়কে ঘিরে দলটি যে পথ বেছে নিয়েছে, তা হলো ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’-কে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে সোজা করার চেষ্টা।
দলের অভিমত, দেশি-বিদেশি নানা মহলের ষড়যন্ত্রের ফলেই শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। একইসঙ্গে তারা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাকে তাদের ফিরে আসার পথ হিসেবে দেখছে।
দমননীতি, অনুশোচনার অভাব এবং বর্তমান সংকট
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়ন এবং সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছিল। তবে সেসব নিয়ে দলটি আজও কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই অনুশোচনার অভাব এবং ক্ষমতা হারানোর পরও আত্মসমালোচনার পরিবর্তে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে আশ্রয় নেওয়াটা দলটির বিশ্বাসযোগ্যতা ও পুনরুত্থানের পথে বড় প্রতিবন্ধক হতে পারে।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ক্ষমতা হারানোর বাস্তবতা এবং নেতৃত্ব সংকট
শেখ হাসিনা ও তার সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় একটি অংশ দেশত্যাগ করেছে। কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছেন ভারত, কেউ যুক্তরাষ্ট্র, কেউ বা যুক্তরাজ্যে। সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং বহু নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা মামলায় বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। দেশের ভেতরে যারা রয়েছেন, তারাও আত্মগোপনে থাকা বা সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে রয়েছেন।
এই বাস্তবতায় দলটি মাঠে নেমে রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারবে কিনা – তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যর্থতা ঢাকতে চায় আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এবং তৃণমূল নেতাদের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করে, শেখ হাসিনার সরকার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ছাত্র আন্দোলন, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকার—সবাই মিলে আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থান নিয়েছে বলেই তারা ক্ষমতা হারিয়েছে।
এই বিশ্বাস থেকেই আওয়ামী লীগ এখন চেষ্টা করছে নিজেদের পতনের ঘটনাকে ষড়যন্ত্রের ফ্রেমে উপস্থাপন করতে। নেতারা মনে করেন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের কৃতিত্ব দাবি করে নিজেদের মধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়ায় জনগণের কাছে আওয়ামী লীগের অবস্থান কিছুটা সহানুভূতির জায়গা পেতে পারে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব যতই প্রচার হোক না কেন, দলীয় দমননীতি, বিরোধী মত দমন, বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার মতো অভিযোগগুলো মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না। বরং ভুল স্বীকার না করে বরাবরের মতো অস্বীকারের কৌশল দলকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলতে পারে।
শেখ হাসিনা ও জয়: নেতৃত্ব কীভাবে রূপ নিচ্ছে?
ক্ষমতা হারানোর পরও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এখনো দলটি পরিচালিত হচ্ছে। তিনি ভারতে অবস্থান করেও ভার্চুয়ালি দলের কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি অন্তত ছয়জন প্রবাসী নেতার সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন এবং এখন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
একইসঙ্গে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে রাজনীতিতে আরও বেশি সক্রিয় করে তোলা হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন। নেতারা মনে করছেন, জয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের একটি বড় মুখ হলেও শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণই চূড়ান্ত থাকবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা: আওয়ামী লীগের সুযোগ?
বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অপারগতা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক দৈন্যদশা—এসবকে আওয়ামী লীগ তাদের ফিরে আসার সুযোগ হিসেবে দেখছে।
দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও এই ব্যর্থতার প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের ব্যর্থতা আওয়ামী লীগের জন্য নতুন আশার দিক তৈরি করেছে।
সুত্রঃ বিবিসি বাংলা