অভিযানটি যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল। ছবিঃ সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১১ আগষ্ট- গাজায় শিগগিরই নতুন সামরিক অভিযান শুরু হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। রবিবার (১০ আগস্ট) তিনি জানান, হামাসের অবশিষ্ট ঘাঁটিগুলো দখল করা এবং ইসরায়েলে আটক বন্দিদের মুক্ত করাই এই অভিযানের মূল লক্ষ্য। তার ভাষায়, অভিযানটি যত দ্রুত সম্ভব শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেন, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী গাজা সিটির অবশিষ্ট দুটি হামাস ঘাঁটি দখল করা হবে। তবে ইসরায়েলের উদ্দেশ্য পুরো গাজা দখল নয়, বরং সীমান্তঘেঁষা একটি “নিরাপত্তা বেল্ট” তৈরি করে হামাসের অবশিষ্ট শক্তি দুর্বল করা এবং সীমান্ত নিরাপদ রাখা।
তিনি আরও জানান, বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নিতে আগে নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করা হবে, যাতে তারা গাজা সিটি থেকে সরে যেতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, অতীতে ঘোষিত “নিরাপদ এলাকা” সবসময় বেসামরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
ইসরায়েলি সামরিক নেতৃত্বও পুরো গাজা দখলের বিপক্ষে সতর্ক করেছে। তাদের মতে, এতে দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যা ইসরায়েলের জন্য দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি করবে এবং বন্দিদের নিরাপত্তা বিপন্ন করবে।
নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। আলোচনায় গাজার পরিস্থিতি, বন্দিদের মুক্তি এবং ত্রাণ প্রবাহের বিষয় উঠে এসেছে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইসরায়েলের প্রতি তার “অটল সমর্থনের” জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা মানবিক প্রয়োজন মেটানো ও বন্দিদের মুক্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এই ঘোষণা আসার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডেনমার্ক, ফ্রান্স, গ্রিস, স্লোভেনিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, গাজায় ইতোমধ্যেই দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে গেছে এবং নতুন অভিযান পরিস্থিতি আরও খারাপ করবে। তারা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং ত্রাণ সরবরাহ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, স্থলপথে নিরাপদ কনভয়ের মাধ্যমে পর্যাপ্ত খাদ্য, শিশুর খাবার, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহই একমাত্র কার্যকর উপায়।
মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, অপুষ্টি ও অনাহারে প্রাণহানির সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে। এ ছাড়া, আকাশপথে ত্রাণ ফেলতে গিয়ে দুর্ঘটনায়ও প্রাণহানি ঘটছে। সর্বশেষ ঘটনায় কেন্দ্রীয় গাজার এক শরণার্থী শিবিরে আকাশ থেকে ফেলে দেওয়া খাবারের বাক্স পড়ে ১৪ বছরের এক কিশোর মারা যায়। এই ধরনের দুর্ঘটনা ত্রাণ বিতরণের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এই সংঘাতের সূত্রপাত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাস নেতৃত্বাধীন যোদ্ধারা দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে প্রায় ১,২০০ জনকে হত্যা ও ২৫১ জনকে অপহরণ করে। তখন থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বহু এলাকা। বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে এখন পর্যন্ত ৬১,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। বন্দিদের মধ্যে মাত্র সীমিত সংখ্যককে জীবিত পাওয়া গেছে, বাকি অনেকের অবস্থান অজানা।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, গাজায় আরও সৈন্য পাঠালে ইসরায়েল “ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো দীর্ঘ ও প্রাণঘাতী” পরিস্থিতিতে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সাফল্য পেলেও দীর্ঘমেয়াদে গাজা দখল ইসরায়েলকে জটিল পুনর্গঠন, তীব্র গেরিলা যুদ্ধ এবং বেসামরিক পুনর্বাসনের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক চাপের কেন্দ্রবিন্দু হলো—ত্রাণ প্রবাহ নিশ্চিত করা, অসহায় বেসামরিকদের নিরাপদে সরানো এবং বন্দিদের মুক্তি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো। কবে এবং কীভাবে এই নতুন সামরিক অভিযান চালানো হবে, তা নির্ধারণ করবে কূটনৈতিক আলোচনার ফল, সামরিক বাস্তবতা এবং মানবিক প্রয়োজনের সমন্বয়। তবে এর মানবিক ব্যয় ও রাজনৈতিক পরিণতি এখনো বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়ে গেছে।
সুত্রঃ রয়টার্স