সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের মৃত্যুতে শোকাহত সাংবাদিক সমাজ
মেলবোর্ন, ২৩ আগষ্ট-সাংমমবাদিক বিভুরঞ্জন স্যারের মৃত্যুর খবর যেন এক বিষাদগাথা। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে সত্যের পক্ষে লড়ে যাওয়া এই মানুষটির শেষ পরিণতি আমাদের মনে প্রশ্ন জাগায়—কেন একজন কলমযোদ্ধাকে জীবনের শেষ প্রহরে এসে লিখতে হলো, “সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়”?
এ মৃত্যু কেবল একজন সাংবাদিকের নয়, বরং আমাদের কর্মজীবনের ব্যর্থতা, সমাজ জীবনের অবহেলা এবং রাষ্ট্রজীবনের নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। তিনি হয়তো নিজের অভাব-অনটনের কথা লিখেছেন, ওষুধের টাকার চিন্তা, সন্তানের চিকিৎসার বোঝা, কিংবা প্রাপ্য সম্মান না পাওয়ার বেদনা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এই গল্প শুধুই বিভুরঞ্জন সরকারের ব্যক্তিগত নয়—এটা অসংখ্য মানুষের গল্প, যারা সততার পথে থেকে বারবার বঞ্চিত হয়েছেন, হেরে গেছেন, আর নিঃশব্দে বিলীন হয়েছেন।
বিভুরঞ্জন স্যার দীর্ঘ পেশাজীবনে ছিল অবদান, ছিল নির্ভীক কলম। কিন্তু তার অবদানকে মূল্যায়ন করা হয়নি। যে সমাজে। সুযোগসন্ধানীরা পুরস্কৃত হয়, সেখানে সত্যবাদীরা থেকে যায় অবহেলিত। যে রাষ্ট্রে মেধা আর সততা প্রাপ্য মর্যাদা পায় না, সেখানে যোগ্য মানুষরা হারিয়ে যায় নিরাশার অন্ধকারে।
তার মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—একজন মানুষ শুধু বেতন-ভাতা বা পদোন্নতির অভাবে হারিয়ে যায় না; তিনি হারিয়ে যান যখন সমাজ তাকে একা করে দেয়, রাষ্ট্র তাকে ভুলে যায়, আর সহকর্মীরা তাকে অবমূল্যায়ন করে। বিভুরঞ্জন স্যারের খোলা চিঠি যেন আমাদের সামনে আয়নার মতো তুলে ধরল—কত বিভুরঞ্জন সরকার এই দেশে আছেন, যারা নিঃশব্দে হেরে বসে আছেন, কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে, আর সমাজ তাদের কান পেতে শুনতেও চায় না।
এই মৃত্যু আমাদের শিক্ষা দেয়—সত্যবাদী মানুষকে যদি একা করে দেওয়া হয়, তবে শুধু তিনি নন, গোটাবিভুতিরঞ্জন সরকার স্যার, এখন শুধু নাম নয় — কর্মজীবন ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মজীবনে যদি সৎ মানুষদের মর্যাদা না দেওয়া হয়, তবে পুরো পেশার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র যদি অবদানকারীদের প্রাপ্য সম্মান না দেয়, তবে ভবিষ্যতে আর কেউ সাহস করে সত্য বলবে না।
বিভুরঞ্জন স্যার হয়তো নিজের ভাষায় বলেছিলেন—“দুঃখই হোক আমার জীবনের শেষ সঙ্গী।” কিন্তু তার দুঃখ শুধুই ব্যক্তিগত নয়, সেটা আমাদের ব্যর্থতার ইতিহাস। তিনি একা হারালেন না, আমরা সবাই হারালাম। কারণ এক বিভুরঞ্জন সরকারের (স্যারের) মৃত্যু মানে, সমাজে আরও শত শত বিভুরঞ্জন স্যারের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যাওয়া।
আমি তাঁর মতো এত শক্তিশালী কলমের অধিকারী নই, তাঁর মতো দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমার নেই। আমি তো ক্ষুদ্র একজন মানুষ, তাঁর বিশালতা আঁকড়ে ধরার সামর্থ্য আমার নেই। তাই তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে হল, আমি কতটুকুই বা প্রকাশ করতে পারলাম—শব্দ যেন বারবার হার মেনে যায় তাঁর কর্ম জীবনের সামনে।