নেপালের আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে ডিসকর্ড ও বিটচ্যাট। ছবি: সংগৃহীত
মেলবোর্ন, ১৫ সেপ্টেম্বর- নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন অল্প সময়েই দেশব্যাপী এক প্রবল তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এই আন্দোলন শুধু প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলিকে পদত্যাগে বাধ্য করেনি, বরং ডিজিটাল প্রযুক্তি কিভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে পারে তার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সরকার ফেসবুক, ইউটিউবসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করলে তরুণেরা রাস্তায় নামে। যদিও টিকটক ও ভাইবারের মতো স্থানীয়ভাবে নিবন্ধিত কিছু অ্যাপ চালু ছিল। রাজধানী কাঠমান্ডুসহ বড় শহরে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী প্রতিবাদে যোগ দেন।
পুলিশি দমন-পীড়নে অন্তত ১৯ জন নিহত হলে আন্দোলন আরও বিস্তার লাভ করে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, নেপালের তিন কোটিরও বেশি মানুষের অর্ধেকের বেশি অনলাইনে সক্রিয়। ফলে প্রতিবাদের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে।
‘#NepoKids’ নামে একটি হ্যাশট্যাগ ভাইরাল হয়, যেখানে রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপনকে তুলে ধরা হয়। সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, করের টাকা দিয়ে এই অভিজাত জীবনযাপন চলছে। শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও হ্যাশট্যাগটি ট্রেন্ড করেছিল।
স্থানীয় সাংবাদিক প্রণয় রানা বলেন, “প্রতিবাদ মূলত শুরু হয়েছিল অনলাইনে দুর্নীতির বিরুদ্ধে পোস্ট দেওয়ার মধ্য দিয়ে। পরে এটি সরাসরি রাজপথে ছড়িয়ে পড়ে।”
প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের পর সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নামলেও আন্দোলন থেমে যায়নি। বরং প্রতিবাদকারীরা নতুন করে সংগঠিত হন ডিসকর্ডে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই গ্রুপ-চ্যাট প্ল্যাটফর্মে এক সার্ভারে ১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি সদস্য যুক্ত হয়ে আলোচনা করছেন, অন্তর্বর্তীকালীন নেতা কে হবেন। অনেকে চাইছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কার্কিকে অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বে দেখতে।
এভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধু আন্দোলন নয়, বরং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও জনমত গঠনের প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই ডাউনলোড করেন ব্লুটুথ-ভিত্তিক মেসেজিং অ্যাপ বিটচ্যাট, যা তৈরি করেছেন টুইটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরসি।
ডরসি নিজেই এক্সে (পূর্বে টুইটার) লিখেছেন, “যখন দরকার তখনই বিটচ্যাট আপনার পাশে।” নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ায় এই অ্যাপের ডাউনলোড হঠাৎ বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে ভিপিএন ব্যবহারের হারও কয়েক হাজার শতাংশ বেড়ে গেছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক কোম্পানি প্রোটন ভিপিএন জানিয়েছে, মাত্র তিন দিনে নেপাল থেকে সাইনআপ বেড়েছে ৬ হাজার শতাংশ।
মানবাধিকারকর্মী সঞ্জীব চৌধুরী বলেন, “সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শক্তিকে মারাত্মকভাবে হালকাভাবে নিয়েছিল। ফলেই উল্টো প্রতিক্রিয়া হয়েছে।”
ডিজিটাল অধিকার সংগঠন অ্যাকসেস নাউ–এর ফেলিসিয়া অ্যান্থোনিও বলেন, সরকার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর কাছে পোস্ট মুছে দেওয়ার ক্ষমতা চেয়েছিল। কিন্তু জনগণ এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেছে।
নেপালে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন প্রমাণ করেছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কেবল সামাজিক সংযোগ নয়, বরং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও কার্যকর হাতিয়ার। ফেসবুক ও ইউটিউব বন্ধ করলেও ডিসকর্ড ও বিটচ্যাটের মতো নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের প্রাণকেন্দ্র।
সূত্র: এনডিটিভি