বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
মেলবোর্ন, ২০ আগষ্ট- দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে…
মেলবোর্ন, ২৫ সেপ্টেম্বর- বাংলাদেশের ক্ষমতা হারানো ও নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও দেশের রাজনীতিতে আলোচনায় এসেছেন তার উত্তরসূরি নির্ধারণের পদক্ষেপকে ঘিরে। খবর এসেছে, ১৯৮১ সাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আসা শেখ হাসিনা এবার তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদকে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য সামনে আনতে চাইছেন।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার এ সিদ্ধান্ত ভারতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব কাঠামোর আদলে সাজানো। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগে তিনি আসলে “রাহুল-প্রিয়াঙ্কা মডেল” অনুসরণ করছেন, যেখানে ছেলে সজীব ও মেয়ে সায়মাকে পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্বে তুলে ধরা হচ্ছে।
দীর্ঘ নেতৃত্ব ও উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রশ্ন
১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেওয়ার পর থেকে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান চরিত্র হয়ে আছেন। কিন্তু এই দীর্ঘ নেতৃত্বকালেও তিনি কখনো প্রকাশ্যে উত্তরসূরি প্রসঙ্গ তোলেননি। নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার এই নীরবতা বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। ওইদিন গণবিক্ষোভের মুখে তাকে দেশ ছাড়তে হয় এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতে সীমিত পরিসরে অবস্থান করছেন। এ পরিস্থিতিতে দলের নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এখন তার জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে। এ বছর তার বয়স ৭৮ পূর্ণ হতে যাচ্ছে, আর দলের ভেতর-বাহিরে নানা চাপ তৈরি হয়েছে উত্তরসূরি প্রসঙ্গকে ঘিরে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, একাধিক দলীয় সূত্র বলছে, এই সংকট নিরসনে শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদকে শীর্ষ নেতৃত্বে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন। এর মাধ্যমে তিনি না থাকলেও দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে পরিবারের প্রভাব বজায় থাকবে।
আওয়ামী লীগে কি রাহুল–প্রিয়াঙ্কা মডেল?
শেখ হাসিনার নেতৃত্ব উত্তরাধিকার কৌশলকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে আওয়ামী লীগ। এই কৌশলটির সঙ্গে ভারতের কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্ব পদ্ধতির বিস্ময়কর মিল দেখা যাচ্ছে। সোনিয়া গান্ধী বয়স ও শারীরিক কারণে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালে রাহুল গান্ধী হয়ে উঠেছেন দলের মুখ্য নেতৃত্বের প্রতীক—তিনি সমাবেশ, প্রচারণা ও সংবাদ সম্মেলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। অন্যদিকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী থাকছেন সহায়ক ভূমিকায়, ভাইকে ছাপিয়ে নয় বরং তাকে সমর্থন দিয়ে। এই “যুগল নেতৃত্ব” মডেল—এক ভাই বা বোন প্রধান মুখ, অন্যজন বিশ্বস্ত সহযাত্রী—এখন শেখ হাসিনার কৌশলেও প্রতিফলিত হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
গান্ধী পরিবারের প্রভাব
এটি কাকতালীয় নয়। গান্ধী পরিবারের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক অনেক পুরনো, যা সাম্প্রতিক সময়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার কূটনৈতিক সম্পর্কেরও আগের। রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক পথচলা তিনি নিবিড়ভাবে অনুসরণ করেছেন, এমনকি “ভারত জোড়ো যাত্রা”র মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্যোগও নিয়েছিলেন। গান্ধী পরিবারের প্রতি দীর্ঘদিনের এই আগ্রহ নাকি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব হস্তান্তর কৌশল গঠনে প্রভাব ফেলেছে।
সজীব ওয়াজেদ: নতুন প্রজন্মের প্রকাশ্য মুখ
শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় দীর্ঘদিন ধরে প্রযুক্তি উপদেষ্টা হিসেবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে হাসিনাত্তোর সময়ে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বেড়েছে। এখন তিনি কার্যত দলের মুখপাত্রে পরিণত হয়েছেন—দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে নিয়মিত বক্তব্য দিচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় বসবাসকারী জয় প্রবাসী ও বিদেশি মহলের কাছে দলের বার্তা পৌঁছাতে একটি বিশেষ টিমও পরিচালনা করছেন। এভাবে তার উত্থান অনেকটা রাহুল গান্ধীর কংগ্রেসে প্রভাবশালী হয়ে ওঠার মতো—অদৃশ্য ভূমিকা থেকে রাজনৈতিক প্রচারণার কেন্দ্রীয় মুখে পরিণত হওয়া।
সায়মা ওয়াজেদ: ডব্লিউএইচও থেকে দলে
শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ তুলনামূলকভাবে হঠাৎ করে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেছেন। সম্প্রতি পর্যন্ত তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের জেরে গত জুলাই থেকে তিনি অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে আছেন। বর্তমানে মায়ের কাছাকাছি থাকতে তিনি দিল্লিতে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে সরাসরি আওয়ামী লীগের নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। শেখ হাসিনার অনলাইন ভাষণ লেখা, বৈঠক সমন্বয় ও সময়সূচি নির্ধারণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কংগ্রেসে প্রিয়াঙ্কার মতোই তিনি কার্যত দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পরামর্শক অবস্থানে রয়েছেন।
বিভক্ত নেতৃত্ব ও নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য
আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কাঠামো এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা অবস্থান করছেন ভারতে, ছেলে জয় যুক্তরাষ্ট্রে, আর মেয়ে সায়মা দিল্লিতে থেকে দল পরিচালনা করছেন। ফলে আওয়ামী লীগ কার্যত এক ধরনের “ত্রিমুখী নেতৃত্ব” ব্যবস্থায় চলছে। এদিকে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মতো ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বকে ক্রমশ প্রান্তিক করে দেওয়া হয়েছে।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা এখন কলকাতা থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সমন্বয় করতে আসাদুজ্জামান খান কামাল, এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাছিম ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের মতো ঘনিষ্ঠ নেতাদের ওপর নির্ভর করছেন। সায়মা তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, আর জয় তদারকি করছেন আন্তর্জাতিক প্রচারণা।
সঙ্কটের মধ্যেও ধারাবাহিকতা
৭৬ বছর বয়সী আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও শাসন ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি দল। কিন্তু এখন দলটি সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে। এই সঙ্কট মোকাবিলায় দলীয় পুনর্গঠন প্রমাণ করছে যে, সব ব্যর্থতার মাঝেও তারা “প্রথম পরিবারকেন্দ্রিক” রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে চাইছে।
ভারতের কংগ্রেস যেমন গান্ধী পরিবারকে কেন্দ্র করে টিকে আছে, ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগও হয়তো নেতৃত্বের উত্তরাধিকারকে ধরে রাখাকে পুনরুত্থানের একমাত্র উপায় হিসেবে দেখছে।
সামনে কোন দিকে পথ?
শেখ হাসিনার উত্তরসূরি পরিকল্পনা ও গান্ধী পরিবারের নেতৃত্ব মডেলের মিল অস্বীকার করার উপায় নেই। উভয় ক্ষেত্রেই নতুন প্রজন্মের হাতে ধীরে ধীরে নেতৃত্ব হস্তান্তর, ভাই-বোনের মধ্যে ভূমিকা বণ্টন এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা স্পষ্ট।
এই কৌশল আওয়ামী লীগের জন্য পুনর্জাগরণ বয়ে আনবে কিনা, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে একথা পরিষ্কার যে, বাংলাদেশের সবচেয়ে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দল ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় আবারও তার পারিবারিক শিকড়ের ওপর ভরসা করছে—যা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ঐতিহ্যেরই এক সুপরিচিত ধারা।
সুত্রঃ ফার্স্ট পোস্ট; অনুবাদঃ ওটিএন বাংলা
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au