‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগে হিন্দু যুবক আটক, বাড়িতে হামলা-মন্দিরে ভাঙচুর
মেলবোর্ন, ২৪ জুন- সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক হিন্দু যুবককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর উত্তেজিত জনতার হামলায় বাড়ি, দোকান ও একটি…
মেলবোর্ন, ২৭ সেপ্টেম্বর- ময়মনসিংহের তারাকান্দার কাশীগঞ্জ বাজারে ৭০ বছর বয়সী বাউল সাধক হালিম উদ্দিন আকন্দকে মাটিতে ফেলে কয়েকজন মিলে চেপে ধরেছিল। তাদের হাতে ছিল কাঁচি ও ক্লিপার। অপমানের মুখে অসহায় হালিম উদ্দিনের মুখ থেকে তখন বেরিয়ে আসে কয়েকটি শব্দ—“আল্লাহ, তুই দেহিস।”
এই আর্তনাদ শুধু একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি এক প্রান্তিক মানুষের শেষ আশ্রয়ের প্রতীক, যখন সমাজ ও রাষ্ট্র তাকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়।
এই দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের সমাজে বেড়ে ওঠা অসহিষ্ণুতা, বিচারহীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নির্মম আক্রমণের প্রতিচ্ছবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি যেন এক আয়না—যেখানে আমরা নিজেদের মানবিকতার ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়া রূপটি দেখতে পাই।
একজন মানুষের ৩৭ বছরের সাধনা, তার বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক—জটধরা চুল—কেটে ফেলা কেবল এক ব্যক্তির অপমান নয়, এটি আমাদের বহুত্ববাদী সমাজচেতনার কফিনে ঠোকা আরেকটি পেরেক।
সহিংসতার নতুন পণ্য: ‘ভিউ বাণিজ্য’
এই ঘটনাটির পেছনে আছে এক ভয়ংকর অর্থনীতি—‘ভিউ বাণিজ্য’। ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এখন এগুলো আয়-উপার্জনের ক্ষেত্র, যেখানে ভিউ, লাইক ও শেয়ারই মূল মুদ্রা।
বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন আয় তুলনামূলক কম হওয়ায় কনটেন্ট নির্মাতারা বেশি ভিউ পেতে যেকোনো কিছুর আশ্রয় নিচ্ছেন। সবচেয়ে সহজ পথ হলো উত্তেজনা, অপমান ও সহিংসতাকে পণ্য বানানো।
হালিম উদ্দিনের চুল কাটার ঘটনাটিও ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ভিডিওটি যে বানিয়েছে, সে জানত—এই ধরনের ভিডিওর বাজারমূল্য আছে। ভিডিওটি আপলোড হওয়ার পর কেউ প্রশংসা করেছে ‘সমাজ সংস্কারের’ নামে, কেউ সমালোচনা করেছে মানবিকতার কথা তুলে। কিন্তু দুই পক্ষই অজান্তে সেই নির্মাতার লাভ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিতর্ক যত বাড়ে, ভিডিওর এনগেজমেন্ট তত বাড়ে, ফলে অর্থও বাড়ে। অন্যের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করে অর্জিত সেই টাকা আসলে রক্তমাখা টাকা।
আরও ভয়ংকর হলো, এসব ভিডিওর পেছনে ‘মানবিকতার মুখোশ’। কিছু পেজ—যেমন “মাহবুব ক্রিয়েশন” বা “স্ট্রিট হিউম্যানিটি অব বাংলাদেশ”—বছর ধরে গৃহহীন বা জটধারী মানুষদের ধরে তাদের অনুমতি ছাড়াই চুল-দাড়ি কেটে ভিডিও তৈরি করছে। তারা একে বলে ‘মানবিক কাজ’, কিন্তু বাস্তবে এটি এক ধরনের ‘পারফরম্যাটিভ ভায়োলেন্স’—দর্শকের সামনে সহিংসতাকে প্রদর্শনের এক ব্যবসা।
দর্শক লাইক-শেয়ার করলেই সে অজান্তে সেই সহিংসতার অংশ হয়ে যায়। আর যারা ভিডিও বানায়, তারা কখনো প্রভাবশালী মানুষকে নয়—সবসময় বেছে নেয় দুর্বল ও অসহায় কাউকে।
রাষ্ট্রের নীরবতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার বলেছে, কারও চুল জোর করে কেটে দেওয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং সংবিধান লঙ্ঘন। সংবিধানের ৩১, ৩২ ও ৩৫ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকের স্বাধীনতা ও মর্যাদা রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় পুলিশ অনেক সময় দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।
হালিম উদ্দিনের ঘটনাতেও স্থানীয় পুলিশের মন্তব্য ছিল—“ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অথচ এটি দায়িত্ব এড়ানোর পরিচায়ক। জনসমক্ষে সংঘটিত অপরাধে পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলা করা উচিত ছিল।
২০২১ সালে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক ১৪ জন ছাত্রের চুল কেটে দিয়েছিলেন। তখন হাইকোর্ট গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেছিলেন। আদালত শুধু বৈধতা নয়, ক্ষতিপূরণ ও প্রতিরোধমূলক নির্দেশও দিয়েছিলেন।
কিন্তু বিচার বিভাগের এই সক্রিয়তা দেখায়—তৃণমূল পর্যায়ে আইনের প্রয়োগ কতটা দুর্বল। যদি নাগরিকের অধিকার রক্ষার জন্য প্রতিবারই উচ্চ আদালতের আশ্রয় নিতে হয়, তবে রাষ্ট্রীয় কাঠামো কতটা ভঙ্গুর, তা স্পষ্ট।
অসহিষ্ণুতার সামাজিক শেকড়
আইনের বাইরেও আমাদের তাকাতে হবে সমাজের ভেতরে। কেন একজন বাউল, একজন ভিন্ন জীবনধারার মানুষ এমন হামলার শিকার হন? কারণ তিনি ‘ভিন্ন’। সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ তার চেহারা, পোশাক বা চুলের ধরনকে ‘অস্বাভাবিক’ ভাবে দেখে।
এই ভিন্নতাকে মুছে ফেলার প্রবণতাই অসহিষ্ণুতা। চুল কেটে দেওয়া এক ধরনের প্রতীকী দমন—ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য মুছে ফেলে তাকে গোষ্ঠীর নিয়মে বাধ্য করার প্রচেষ্টা।
যারা এমন কাজ করে, তারা নিজেদের ‘নৈতিক পুলিশ’ মনে করে। তারা মনে করে, সমাজের শুদ্ধি তাদের হাতে। রাষ্ট্র যখন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হয় না, তখন সেই নীরবতাই তাদের উৎসাহ দেয়।
উত্তরণের পথ
এই সংকট থেকে বের হতে হলে প্রয়োজন তিন স্তরের উদ্যোগ।
প্রথমত, রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিযোগের অপেক্ষা না করে দ্রুত মামলা ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাদের অ্যালগরিদম যেন ঘৃণাত্মক ও অপমানজনক কনটেন্টকে পুরস্কৃত না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, সমাজে মানবিক শিক্ষা ও সহিষ্ণুতা গড়ে তুলতে হবে। পরিবার, স্কুল ও গণমাধ্যমে ভিন্নমত ও ভিন্ন জীবনধারার প্রতি শ্রদ্ধা শেখাতে হবে।
হালিম উদ্দিনের সেই আর্তনাদ—“আল্লাহ, তুই দেহিস”—আজ আমাদের বিবেকের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। আমরা কি এমন এক সমাজে বাঁচতে চাই, যেখানে ভিন্নতা মানেই শাস্তি?
এটি শুধু একজন বাউলের অপমান নয়; এটি আমাদের মানবিকতার বিচারও।
একটি সভ্য সমাজ তখনই টিকে থাকে, যখন প্রত্যেক মানুষ নিজের বিশ্বাস, পরিচয় ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বাঁচতে পারে। সেই সমাজ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।
দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত মতামতের আলোকে
তানজিল রিমন; সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক
স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au