পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ। ছবিঃ ইকো বিসনেস
মেলবোর্ন, ৬ অক্টোবর- পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ বাংলাদেশ এবার মনোযোগ দিচ্ছে শিল্পের আরেকটি বড় সমস্যা—টেক্সটাইল বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে।
ক্লাউড-ভিত্তিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে এখন কারখানাগুলো তাদের বর্জ্য আলাদা করা, লেবেল দেওয়া, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন ও ট্র্যাক করার সুযোগ পাচ্ছে। এর ফলে বর্জ্য এক কারখানা থেকে অন্য কারখানা, সংগ্রাহক ও পুনর্ব্যবহারকারীর কাছে যাওয়ার প্রতিটি ধাপ সহজে নজরদারিতে আনা সম্ভব হচ্ছে।
‘রিভার্স রিসোর্সেস’-এর বাংলাদেশ প্রধান রিজভান হাসান বলেন, “আমরা বাংলাদেশের বর্জ্য প্রবাহকে আন্তর্জাতিক রিসাইক্লিং বাজারের সঙ্গে যুক্ত করছি, যাতে বর্জ্য সংগ্রাহকেরা ভালো ব্যবসায়িক সুযোগ এবং ন্যায্য দাম পান।”
গত বছর জার্মান উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেড ও সুইডিশ ফ্যাশন খুচরা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএম-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে উৎপাদনের আগে তৈরি হওয়া তুলা ও কটন-ইলাস্টিন বর্জ্যের মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করতে পারে। এর মধ্যে ৫ শতাংশেরও কম বর্জ্য আপসাইক্লিং করে তৈরি হয় পাটি, পুতুল বা কম্বলের মতো পণ্য। তবে ৫৫ শতাংশের বেশি বর্জ্য রপ্তানি করা হয় ভিয়েতনাম, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, ভারত ও চীনের মতো দেশে, যেখানে উন্নত রিসাইক্লিং হাব আছে। বাকিটা ব্যবহার হয় কুশন বা ম্যাট্রেসে ভরাট হিসেবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে পোড়ানো হয়, কিংবা অল্প পরিমাণে ফেলে দেওয়া হয় ল্যান্ডফিলে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে বেশি পরিমাণে টেক্সটাইল পুনর্ব্যবহার শুরু হলে তা থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় হতে পারে।
এদিকে, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সম্প্রতি নতুন আইন পাস করেছে, যাতে বলা হয়েছে ইইউতে টেক্সটাইল বিক্রি করা প্রস্তুতকারকদের টেক্সটাইল বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই ও রিসাইক্লিংয়ের খরচ বহন করতে হবে। ফলে এইচঅ্যান্ডএম-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো তাদের পণ্যে আরও বেশি রিসাইক্লিং করা উপকরণ ব্যবহার করছে, যা আগের তুলনায় কম বর্জ্য মাটিচাপা দেওয়া বা পোড়ানোর দিকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোকে এখন আরও বেশি পুনর্ব্যবহৃত ফাইবার ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এখনও দেশের বেশিরভাগ টেক্সটাইল বর্জ্য চলে যাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক চক্রের হাতে—স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের থেকে শুরু করে ছোট ওয়ার্কশপ পর্যন্ত। স্বচ্ছতা ও মানসম্মত তথ্যের অভাব দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পের টেকসই হওয়ার পথে বড় অন্তরায় হয়ে আছে বলে মনে করেন বিইউএফটি প্রো-ভিসি আয়ুব নবি খান। তিনি বলেন, “যাচাই করা তথ্যসহ ডিজিটাল ট্র্যাকিং শুধু বর্জ্য প্রবাহকে সঠিকভাবে সাজাতে সাহায্য করে না, বরং এর অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়িয়ে দেয়।”
‘রিভার্স রিসোর্সেস’ সরবরাহকারী, সংগ্রাহক, পুনর্ব্যবহারকারী ও ব্র্যান্ডকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে বর্জ্যের তথ্য সরবরাহ করে। হাসান জানান, “কারখানা থেকে যে পরিমাণ বর্জ্য বের হচ্ছে তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংগ্রাহক ও পুনর্ব্যবহারকারীর হাতে পৌঁছানো বর্জ্যের হিসাব মিলিয়ে আমরা সহজেই কোথায় গড়মিল হচ্ছে তা শনাক্ত করতে পারি।”
এভাবে বর্জ্য আলাদা করে চিহ্নিত করলে কারখানাগুলো তাদের বর্জ্য বেশি দামে বিক্রি করতে পারে, আর ব্র্যান্ডগুলোও জানতে পারে তাদের উৎপাদিত বর্জ্যের কী পরিণতি হচ্ছে। বর্তমানে ‘রিভার্স রিসোর্সেস’ ৪১০টি কারখানা ও ৬০টিরও বেশি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডকে কাভার করছে, যা মোট বাজারের মাত্র ১ শতাংশ।
‘ফ্যাশন ফর গুড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাট্রিন লে জানান, এই ধরনের প্রযুক্তি দ্রুত ব্যবসায়িক চর্চায় অন্তর্ভুক্ত করা গেলে টেক্সটাইল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে ডিজিটাল বর্জ্য ট্র্যাকিং আরও বড় আকারে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিসাইকেল র’ ২০১৯ সাল থেকে রিভার্স রিসোর্সেসের সঙ্গে কাজ করছে। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রাজ্জাক বলেন, “এই প্ল্যাটফর্ম আমাকে নির্দিষ্ট ও আলাদা করা বর্জ্যের নিশ্চয়তা দিয়েছে। এর ফলে আমি সরাসরি কারখানার সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পেরেছি, অনানুষ্ঠানিক সংগ্রাহককে পাশ কাটিয়ে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা কোন ধরণের, কোন রঙের ও কী মানের বর্জ্য রিসাইক্লিং করছি তা স্পষ্টভাবে জানতে পারি, ফলে ব্যবসা অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে।”
সুত্রঃ ইকো বিজনেস