ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন যে ইসরায়েল এবং হামাস গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রথম পর্যায়ে একমত হয়েছে। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১০ অক্টোবর- গাজায় “চিরস্থায়ী শান্তি”র প্রতিশ্রুতি এখন টলমল এক যুদ্ধবিরতিতে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হামাস এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ভরসা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি নয়, বরং একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি। বোমাবর্ষণ আপাতত বন্ধ থাকবে, এবং তিন দিন পর ইসরায়েলি জিম্মিদের লাল ক্রসের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তারা গাজা থেকে বের হয়ে যাবে, শেষ হবে ৭৩৮ দিনের বন্দিজীবন। পাশাপাশি গাজায় ত্রাণ প্রবাহিত হবে, যাতে ফিলিস্তিনিরা খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং আশ্রয় পায়।
তবে ইসরায়েলি সেনারা শুধু গাজার ধ্বংসস্তূপে পরিণত শহরগুলো থেকে সরে যাচ্ছে, পুরো উপত্যকা বা সীমান্ত ছাড়ছে না। এই পর্যায়টিকে বলা হচ্ছে চুক্তির “প্রথম ধাপ”। শুরুতে এটি একটি বিস্তৃত শান্তি পরিকল্পনা হিসেবে ভাবা হলেও বাস্তবে কেউই প্রস্তাবিত ২০ দফা পরিকল্পনা পুরোপুরি মানছে না।
জানুয়ারিতে হওয়া যুদ্ধবিরতির তুলনায় এই চুক্তি অনেক কম স্পষ্ট। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতিতে ইসরায়েল প্রথম ধাপের পরই যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেয়, তখনও অনেক জিম্মি গাজায় ছিল। সেই চুক্তির কৃতিত্ব নিজের নামে নিয়েছিলেন ট্রাম্প, কিন্তু পরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তাঁর প্রশাসন পরবর্তীতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে নতুন প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান বা পরিবর্তনের সুযোগ দেয়, যদিও হামাস সেগুলো মেনে নিয়েছিল।
এবার পার্থক্য হলো—এই চুক্তির পর গাজায় কোনো জিম্মি থাকবে না, আর ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর এবার চাপ প্রয়োগ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। ইরান ও হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার পর ইসরায়েল কাতারে হামাস প্রতিনিধিদের ওপর হামলার সিদ্ধান্ত নেয় যা যুক্তরাষ্ট্রের সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
দোহায় ইসরায়েলের ব্যর্থ হত্যা প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যে চাঞ্চল্য তৈরি করে। কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, তুরkiye, মিশর ও সৌদি আরব ওয়াশিংটনে কড়া প্রতিবাদ জানায়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি বুঝে ট্রাম্প সরাসরি নেতানিয়াহুর ওপর কঠোর অবস্থান নেন। কাতারের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে ও ভবিষ্যতে এমন হামলা না করার অঙ্গীকার করতে তিনি নেতানিয়াহুকে বাধ্য করেন।
হামাস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়তা দিয়েছে যে এ যুদ্ধ এখানেই শেষ। চুক্তিটি কার্যকর হয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায়, যখন হোয়াইট হাউসের শান্তি দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার আলোচনায় অংশ নেন। কাতারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা এই দুই ব্যক্তি ইসরায়েলের ওপর শর্ত প্রয়োগের নিশ্চয়তা দেন এবং পরে ইসরায়েলে গিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও যোগ দেন।
সবশেষে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, এই পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে “চিরস্থায়ী শান্তি” আনবে। হামাস এখন সেই প্রতিশ্রুতির ওপরই নির্ভর করছে। তবে এটি তাদের জন্য একটি বড় ঝুঁকি, কারণ ট্রাম্প যদি আবার আগ্রহ হারান, তাহলে পুরো উদ্যোগটি ভেস্তে যেতে পারে।
চুক্তিতে হামাস কোনো বড় ছাড় পায়নি। জনপ্রিয় ফিলিস্তিনি নেতা মারওয়ান বারঘুতিসহ অনেক বন্দিকে ইসরায়েল মুক্তি দেয়নি। হামাসের নিহত নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ও মোহাম্মদ সিনওয়ারের মৃতদেহও ফেরত দেওয়া হয়নি। এছাড়া ইসরায়েল এখনো পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করছে না, যা হামাসের অন্যতম দাবি ছিল।
অবরোধ আর আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে সংগঠনটির সামনে এখন পুনর্গঠনের সীমিত সুযোগ আছে। জিম্মিদের ফেরত আসার পর ইসরায়েল সরকারের কাছে আগ্রাসন চালানোর কারণ কমে যাবে, আর জনগণের সমর্থনও হ্রাস পাবে।
চুক্তির বিতর্কিত কিছু অংশ, যেমন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে গাজার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে রাখার প্রস্তাব, বা তাঁর ফাউন্ডেশনের কল্পিত “বিনিয়োগবান্ধব, প্রযুক্তিনির্ভর গাজা” পরিকল্পনা, এখন কার্যত বাদ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধবিরতি মূলত একটি সাময়িক বিরতি। গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন, নিরাপত্তা ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। ফলে সংঘাতের মূল কারণগুলো রয়ে গেছে অমীমাংসিত অবস্থায়।
যুদ্ধবিরতির পরও ফিলিস্তিনিরা আগের চেয়ে আরও খারাপ অবস্থায় আছে। হামাসের একমাত্র সাফল্য হলো ফিলিস্তিনের দুর্দশাকে আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। তবে যদি ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে রাজনৈতিক সমাধান না আসে, তাহলে এই শান্তির আশাও খুব দ্রুত মিলিয়ে যেতে পারে।
বোমা ও অনাহার থামানো এখন জরুরি পদক্ষেপ হলেও, এটি কেবল শুরু। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে গাজার ভবিষ্যৎ আবারও ধোঁয়াশায় হারিয়ে যাবে।
সুত্রঃ এবিসি নিউজ