মেলবোর্ন, ১১ অক্টোবর- অবশেষে গাজায় থামতে চলেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। মুক্তি পেতে যাচ্ছেন অবশিষ্ট জিম্মিরা, আর অনাহারে থাকা বাস্তুচ্যুত গাজাবাসী ফিরতে শুরু করেছেন নিজেদের ভেঙে যাওয়া ঘরের পথে। সব কিছু পরিকল্পনামতো এগোলে থামবে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণ—যা ফিলিস্তিনিদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি বয়ে আনবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ যুদ্ধের অবসানে কৃতিত্ব নিতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর উদ্যোগেই এসেছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—এটি কি সত্যিকারের শান্তির সূচনা, নাকি সাময়িক বিরতি শেষে আবারও রক্তপাত?
ট্রাম্প তার ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে একদিকে ইসরায়েলকে, অন্যদিকে কাতারের মাধ্যমে হামাসকে চাপ দিয়েছেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার ফলে অন্তত সাময়িকভাবে থেমেছে হত্যাযজ্ঞ। ইউনিসেফ জানিয়েছে, দুই বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে প্রতিদিন গড়ে ২৮টি শিশু নিহত হয়েছে গাজায়—রূপক অর্থে প্রতিদিনই হারিয়ে গেছে একটি শ্রেণিকক্ষের সমান শিশু।
তবে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প চাইলে জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফেরার পরই ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারতেন। তার পরিবর্তে তিনি এখন যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব নিচ্ছেন, যদিও তাঁর মেয়াদকালেই যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত বোমা দিয়েই গাজায় অসংখ্য শিশু নিহত হয়েছে।
ইসরায়েলের টানা বোমাবর্ষণে গাজা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ২১ লাখ মানুষের জন্য স্বাভাবিক জীবনে ফেরা এখন প্রায় অসম্ভব।
ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার জানিয়েছেন, গাজার আল-মাওয়াসি এলাকা এখন পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল, যেখানে ৮৫ শতাংশ পরিবার খোলা নর্দমা, আবর্জনা ও ইঁদুরের উপদ্রবের মধ্যে বাস করছে। তাঁর ভাষায়, “ওখানে জীবনের ন্যূনতম চাহিদাগুলোও অনুপস্থিত।”
ট্রাম্পের উদ্যোগে তৈরি ২০ দফা পরিকল্পনাতেই এসেছে এই যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এই পদক্ষেপ না নিলে যুদ্ধ আরও কয়েক মাস, এমনকি বছরও চলতে পারত।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘ যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর কট্টর-ডানপন্থী জোট চেয়েছিল, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে এলাকা দখল করতে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ট্রাম্পের দাবি—তিনি “তিন হাজার বছরের অমীমাংসিত সংঘাত মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি এনেছেন”—একটি বড়সড় অতিরঞ্জন। বাস্তবে, তিনি কেবল রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাময়িক পরিসমাপ্তি ঘটাতে পেরেছেন।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ব্রিটিশ ম্যান্ডেটভুক্ত ভূখণ্ডে দুটি রাষ্ট্র—একটি ইহুদি ও একটি আরব রাষ্ট্র—গঠনের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। আজও ১৫০টিরও বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কিন্তু দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সবচেয়ে বড় বাধা হলো হামাস ও নেতানিয়াহুর সরকার।
নেতানিয়াহুর মতে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র মানে পশ্চিম তীরের দখলকৃত অঞ্চল ছাড়তে হবে, যা তিনি মানতে রাজি নন। অপরদিকে, হামাস মনে করে, দুই রাষ্ট্র সমাধান মানে ইসরায়েলের বৈধতা স্বীকার করা—যা তাদের আদর্শের পরিপন্থী।
বর্তমানে হামাস দুর্বল এবং তাদের সামরিক শক্তি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। বোমা থেমে গেলে গাজার মানুষকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই বাঁচতে হবে। এখন দরকার দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন ও নিরাপত্তা।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একদিকে হামাসের সহিংসতা বন্ধ করাতে হবে, অন্যদিকে ইসরায়েলকে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পথে আনতে চাপ দিতে হবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, নেতানিয়াহু একা সমস্যার মূল নন। তিনি তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন, কারণ অধিকাংশ ইসরায়েলিই তাঁর নীতির সমর্থক। অর্থাৎ, ইসরায়েলের নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও নীতিগত অবস্থান খুব একটা বদলাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরায়েলের নীতিগত পরিবর্তন আনতে হলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাই হতে পারে কার্যকর উপায়। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় যেভাবে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছিল, তেমন পদক্ষেপ ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও ফলপ্রসূ হতে পারে।
ট্রাম্প এই বিষয়ে বলেছেন, “আমার কোনো অবস্থান নেই।”
তবে যদি সত্যিই তিনি দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান ঘটিয়ে ৮০ বছরের ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারেন, তাহলে নোবেল শান্তি পুরস্কারের আসল দাবিদার হয়তো তিনিই হবেন।