গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন ফিলিস্তিনিরা। ছবিঃ রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১১ অক্টোবর- গাজায় শুক্রবার থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন ফিলিস্তিনিরা। দুই বছর আগে শুরু হওয়া ভয়াবহ যুদ্ধের সময় জীবন বাঁচাতে গাজার মানুষকে বারবার বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়েছিল এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল অসংখ্যবার। এখন তারা ফিরছেন, তবে হৃদয়ে রয়েছে মিশ্র অনুভূতি কেউ শান্তির জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছেন, কেউ আবার ভাবছেন, যুদ্ধ কি সত্যিই শেষ হলো?
সংবাদ সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার দক্ষিণের শহর খান ইউনিস থেকে নিজের ভাঙাচোরা এলাকায় ফিরছেন আমির আবু ইয়াদে। তিনি বলেন, “এই অবস্থার জন্য আমরা আল্লাহকে ধন্যবাদ জানাই, যদিও ক্ষতবিক্ষত আর ব্যথিত হয়ে আমরা ফিরছি আমাদের এলাকায়।”
গাজা নগরীর বাসিন্দা ৩৯ বছর বয়সী মুহাম্মদ মুর্তজাও একই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “আমি সব সময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম, যেন আমার বাড়িতে ফিরে দেখি সেটি এখনো অক্ষত আছে, ধ্বংস হয়নি।” তাঁর এখন একটাই চাওয়া “এই যুদ্ধটা যেন একেবারে শেষ হয়, যেন আর কখনো পালাতে না হয়।”

প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢোকার কথা। ছবিঃ সংগৃহীত
৫৩ বছর বয়সী আরিজ আবু সাদায়েহের কণ্ঠে পাওয়া গেল একইসঙ্গে আনন্দ ও বেদনার মিশ্র সুর। তিনি বলেন, “এই যুদ্ধবিরতি ও শান্তি ফেরায় আমি খুশি। যদিও আমি এমন এক মা, যিনি যুদ্ধে নিজের এক ছেলে ও এক মেয়েকে হারিয়েছেন। তাঁদের কথা মনে পড়লে কষ্ট হয়, তবু এই যুদ্ধবিরতি আমাদের জীবনে একটু আনন্দ ফিরিয়েছে। আমরা আবার ঘরে ফিরছি।”
মিসরের শারম আল শেখ শহরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গত বুধবার হামাস ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর শুক্রবার ভোরে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা চুক্তিটি অনুমোদন দেয় এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, গাজায় যুদ্ধবিরতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাজার নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে সেনা সরিয়ে নেবে ইসরায়েল। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামাস জীবিত সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে, আর ইসরায়েলও তাদের কারাগারে আটক প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনিকে ছেড়ে দেবে।
এই যুদ্ধবিরতিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার থেকে মিসরে হামাস, ইসরায়েল, ইসলামিক জিহাদ এবং পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএলএফপি)-এর মধ্যে বৈঠক চলে।

গাজাভিত্তিক প্রতিরোধ আন্দোলন বাহিনী হামাস। ছবিঃ রয়টার্স
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকালে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েল আংশিকভাবে গাজার কিছু অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছে। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনি গাজার উত্তর দিকে ফিরছেন যে অঞ্চলটি গত কয়েক মাসে ইসরায়েলি বিমান হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, এখন থেকে ত্রাণবাহী ট্রাকগুলো কোনো বাধা ছাড়াই গাজায় প্রবেশ করতে পারবে। প্রতিদিন প্রায় ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢোকার কথা। তবে বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গাজার মানুষদের কাছে এই যুদ্ধবিরতি তাই একই সঙ্গে আশার আলো ও অনিশ্চয়তার ছায়া একদিকে ফিরছে তারা ঘরে, অন্যদিকে ভয়ের প্রশ্ন এখনো বাতাসে ভাসছে: শান্তি কি সত্যিই ফিরেছে গাজায়?
সুত্রঃ এএফপি