ফিলিস্তিনিরা সংগ্রহ করছেন জরুরি ত্রাণসহায়তা। গতকাল দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে।ছবি: রয়টার্স
মেলবোর্ন, ১২ অক্টোবর- টানা প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলি হামলা থেকে বাঁচতে পালিয়ে বেড়ানো লাখো ফিলিস্তিনি আজ (শনিবার) যুদ্ধবিরতির এক দিন পার হওয়ার পর নিজেদের বিধ্বস্ত বাড়িঘরে ফিরে এসে শুধু ধ্বংসস্তূপই দেখছেন — কিন্তু তবু অনেকের মুখে আপাত স্বস্তির ছাপ।পালিয়ে বেড়ে জীবনে আপাত শান্তি ফিরে পেয়েছেন আমির আবু ইয়াদেহ।
তিনি বলেন, “দুঃখ-কষ্ট যতই হোক, অবশেষে নিজের বাড়িতে ফিরতে পেরেছি , এ জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ।” তবে এসে দেখেছেন, যা একসময় ছিল ঘর, এখন সেখানে শুধু ধ্বংসস্তূপ।
ফ্রান্ত উপত্যকায় গত শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের ২০ দফা ‘শান্তি পরিকল্পনা’-এর প্রথম ধাপ অনুসারে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর উদ্বাস্তু লাখো ফিলিস্তিনি তাঁদের বিধ্বস্ত বাড়িঘরে ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করেন; সরকারি ও বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ মানুষ উত্তর গাজায় ফিরে গেছেন। অনেকেই ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে প্লাবিত এলাকায় চলে এসেছেন এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই তাঁবু নিয়ে রাত কাটাচ্ছেন।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর ধ্বংসস্তূপ থেকে অন্তত ১৫৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে; এখনও ধ্বংসস্তূপে ১০ হাজারের বেশি মরদেহ চাপা থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জরুরি সেবার কর্মীরা ধসে পড়া ভবনগুলোতে জীবিত কিংবা মৃত মানুষের খোঁজে অভিযান চালাচ্ছেন।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আগামী সোমবার দুপুরের মধ্যে হামাসের কাছে থাকা সব জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে। চুক্তি অনুসারে ইসরায়েলি কারাগার থেকে ১,৯৫০ জন ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি পাবে বলে বলা হয়েছে। হামাসের কাছে থাকা ৪৮ জন জিম্মির মধ্যে ২০ জন জীবিত বলে হামাস নেতাদের বরাতে আল-জাজিরা জানিয়েছে; হামাস জানিয়েছে এই ২০ জনকে এক জায়গায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বলেছে, ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি প্রক্রিয়া শুরু করেছে তারা।
দুই বছরে গাজার অনেক অঞ্চল ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে গেছে-দাবি অনুসারে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং প্রথম ধাপে সেনা সরানোর পর গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। দীর্ঘ সময়ের অবরোধ ও ত্রাণ প্রবেশ সীমিত থাকার ফলে ২৩ লাখ বাসিন্দার উপত্যকায় তীব্র খাদ্যসংকট; জাতিসংঘ ও মানবতাবাদী সংস্থারা আগে থেকেই দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা জানিয়ে এসেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী প্রতিদিন গাজায় পাঠানোর কথা ছিল ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়ন এখনও আংশিক ও অনিশ্চিত বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়।
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রসেত্তো জানিয়েছেন, রাফা ক্রসিং আগামী মঙ্গলবার থেকে খুলে দেওয়ার তৎপরতা চলছে – তবে সীমান্ত খুলে ত্রাণ প্রবেশ নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৯ সেপ্টেম্বর ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন; এ বিষয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের শর্ত ,বিশেষত হামাসের অস্ত্রসমর্পণ ও ভবিষ্যত শাসন ব্যবস্থা, নিয়ে সমঝোতা হয়নি। তাই দ্বিতীয় ধাপ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প আগামীকাল (রবিবারের পরে) মধ্যপ্রাচ্যে সফর করে ইসরায়েলে পৌঁছাবেন এবং সোমবার মিসরে গাজা চুক্তির আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমমানুয়েল ম্যাক্রোঁর অফিস জানিয়েছে, ম্যাক্রোঁ একই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন; সাম্মান্যভাবে ইতালি ও স্পেনের প্রধানমন্ত্রীদের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সূত্র বলছে।
রিপোর্টগুলোতে বলা হচ্ছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় চলমান সংঘাতে প্রচ- সময়ের মধ্যে ৬৭,৬৮২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং ১ লক্ষ ৭০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন – এসব সংখ্যার প্রকৃততা ও পদ্ধতিগত বিশ্লেষণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক চলমান আছে
পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী আরিজ আবু সাদায়েহ বলেন, “ইসরায়েল আমার ছেলেমেয়েকে কেড়ে নিয়েছে-তাদের হারানোর বেদনা গভীর। তবু আমি খুশি যে যুদ্ধ থেমেছে, আমি ঘরে ফিরতে পেরেছি।”
৩৯ বছর বয়সী মুহাম্মদ মুর্তজা আশা ব্যক্ত করেছেন যে যুদ্ধ চিরতরে বন্ধ হোক, যেন আর কারো ঘর-সংসার ছেড়ে পালাতে না হয়।
যুদ্ধে বিরতি সৌভাগ্য নয়-প্রথম ধাপ কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, ত্রাণসুবিধা, বন্দি মুক্তি এবং গাজার শাসন নিয়ে অজানা বহু প্রশ্ন রয়ে গেছে। হাজার-হাজার মানুষ ধ্বংসস্তূপের মাঝে ফিরে এসেছে; এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ও নিরাপদভাবে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও জীবিত উদ্ধার এবং স্থায়ী শান্তির জন্য রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা।
সুত্রঃ রয়টার্স