বাংলাদেশ

শেখ হাসিনা: উন্নয়ন ও বিতর্কের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক নেত্রী

  • 6:43 am - October 16, 2025
  • পঠিত হয়েছে:১০৭ বার
শেখ হাসিনা। ছবিঃ সংগৃহীত

মেলবোর্ন, ১৬ অক্টোবর- শেখ হাসিনার অর্জনের তালিকা যেন এক জীবন্ত ইতিহাস। ইউনেস্কোর শান্তি পুরস্কার থেকে শুরু করে জাতিসংঘের ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ সম্মাননা, এমনকি ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কারেসহ প্রতিটি পুরস্কারই তার সাহস, ত্যাগ আর দৃঢ় নেতৃত্বের স্বীকৃতি।

এই পুরস্কারগুলো কেবল ধাতব পদক নয়, এগুলো এক নেত্রীর প্রতীক যিনি প্রতিকূল সময়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন, নিপীড়িতদের আশ্রয় দিয়েছেন, গণতন্ত্র রক্ষা করেছেন এবং নারী অধিকারকে জাতীয় অগ্রগতির কেন্দ্রে এনেছেন।

তবুও এখানেই দ্বন্দ্ব। যেখানে বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠান তাকে সম্মানিত করছে, পশ্চিমা মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যম তাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে; উন্নয়ন নয়, তারা খুঁজে বেড়াচ্ছে বিতর্ক। তবু সব সমালোচনা আর ঝড় পেরিয়ে শেখ হাসিনা এখনো স্থির। প্রশংসার জন্য নয়, দেশের ভবিষ্যতের জন্য।

২০২৪ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলের সমাবেশে সভাপতি শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ছবিঃ সংগৃহীত

স্বৈরাচার নাকি স্থিতিশীলতার স্থপতি?

অনেকে তাকে একনায়ক বলেন, কিন্তু এই তকমা তার বাস্তব লড়াইয়ের গভীরতা বোঝায় না। তিনি ক্ষমতায় এসেছেন ধ্বংসস্তূপের ওপর দিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা, উগ্রবাদ আর সামরিক অভ্যুত্থানের ছাপ তখনও তাজা। যখন অনেকে পিছিয়ে গেছেন, তিনি লড়ে গেছেন।

তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শুধু টিকে থাকেনি, স্বপ্ন দেখতে শিখেছে। মাথাপিছু আয় তিনগুণ বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, সেনাবাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখা গেছে। বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের উত্থানের সময় তিনি দৃঢ় হাতে উগ্রবাদ দমন করেছেন। আইএসের প্রভাব যখন ছড়িয়ে পড়ছিল, তিনি নিশ্চিত করেছিলেন বাংলাদেশ যেন আগুনে পুড়ে না যায়।

এই অগ্রগতি এসেছে দৃঢ়তা, স্পষ্টতা আর সাহস থেকে। পদ্মা সেতু তার প্রতীক। বিশ্ব সন্দেহ করেছিল, কিন্তু তিনি মাথা নত করেননি। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত সেই সেতু এখন বাংলাদেশের আত্মনির্ভরতার প্রতীক। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, যা একসময় স্বপ্ন ছিল, তার নেতৃত্বে বাস্তব হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকা কথায় নয়, কাজে প্রমাণিত। অসংখ্য নারী আজ শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বের জায়গায়। রোহিঙ্গা সংকটে তিনি রাজনীতিক নয়, একজন মানুষ হিসেবে মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

তাকে কেউ কঠোর বলতে পারেন, আপসহীন বলতে পারেন, কিন্তু আসলে এটি এক রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব, যেখানে দৃঢ়তা ও মানবিকতা একসাথে চলে।

কূটনৈতিক প্রজ্ঞা: হাসিনার পররাষ্ট্রনীতি

বিভাজিত বিশ্বে শেখ হাসিনা এক অনন্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছেন। ইতিহাস ও ভূরাজনীতি সম্পর্কে তার গভীর উপলব্ধিই তার নীতিকে করেছে দূরদর্শী।
তার নীতি “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” এটি কেবল একটি শ্লোগান নয়, তার কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা।

ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভারসাম্যে রেখে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও অন্যান্য শক্তিধর দেশের সঙ্গেও তিনি সম্পর্ক রক্ষা করেছেন। এতে বাংলাদেশ সার্বভৌম মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সুযোগ দুই-ই অর্জন করেছে।
রোহিঙ্গা সংকটে তিনি যে মানবিক ভূমিকা রেখেছেন, তা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতেও তিনি বাংলাদেশকে ভুক্তভোগী থেকে নেতৃত্বদানকারী দেশে পরিণত করেছেন।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে জি-২০ সম্মেলনে তার উপস্থিতি ছিল ঐতিহাসিক। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বপ্নের প্রতিফলন।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

একতরফা অভিযোগ, নাকি প্রেক্ষাপটহীন প্রতিবেদন

২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু করলেও তা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন আন্দোলনকে অপরাধ হিসেবে না দেখে ছাত্রদের আদালতে সহায়তা দিতে নিজের আইনি দলকে নির্দেশ দেন। কিন্তু অভিযোগ ওঠে তিনি ছাত্রদের “রাজাকার” বলেছেন।

পরিস্থিতি সহিংস হলে সীমিত পরিসরে নিরাপত্তা বাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। হতাহতের পর বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও পশ্চিমা গণমাধ্যমে তা খুব একটা আলোচিত হয়নি। বরং যাচাইহীন অডিও ফাঁসকে ভিত্তি করে প্রতিবেদনে ভুল তথ্য প্রচার করা হয়।

বাংলাদেশে গুম ও নিখোঁজের অভিযোগ অবশ্যই উদ্বেগজনক, কিন্তু বিচার হতে হবে নিরপেক্ষভাবে। আশ্চর্যজনকভাবে, হাসিনার পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এসব তদন্তে দীর্ঘ সময় নিলেও আন্তর্জাতিক মহল তখন নীরব থাকে।

এভাবে একপেশে প্রতিবেদন বাস্তবতাকে বিকৃত করে, যেখানে বাংলাদেশের রাজনীতি কেবল “স্বৈরশাসক বনাম নিপীড়িত” আখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়।

বিচার, নিষেধাজ্ঞা ও দ্বৈত মানদণ্ড

সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান সাম্প্রতিক বিচারে গুরুতর প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কথা বলেছেনট। একই আইনজীবী নাকি শেখ হাসিনা ও অন্যান্য আসামিদের পক্ষে নিযুক্ত হয়েছেন। এটি ন্যায়বিচারের মূলনীতি লঙ্ঘন করে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের আকস্মিক অবসর, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অথচ এসব বিষয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে তেমন আলোচনা হয়নি।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আটকাবস্থায় মৃত্যুর খবর ও নির্যাতনের অভিযোগও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খুব কমই উঠে এসেছে। এ নীরবতা একধরনের দ্বিচারিতা তৈরি করছে।

শেখ হাসিনা কোনো একনায়ক নন। তিনি নির্বাচিত নেতা, যার সাফল্য যেমন বিশাল, বিতর্কও আছে। তবে সমালোচনা হতে হবে প্রমাণভিত্তিক ও প্রেক্ষাপটসম্মত।

ন্যায়বিচার যদি সর্বজনীন না হয়, তবে সেটি ন্যায়বিচারই নয়। পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান দ্বৈত মানদণ্ড কেবল তাদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করছে।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

“শক্ত নেতা” নয়, এক রূপান্তরের গল্প

শেখ হাসিনা গাদ্দাফি বা সাদ্দাম নন। তাকে সেই ছাঁচে ফেললে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকেই অস্বীকার করা হয়। দেশে নির্বাচন হয়, প্রতিবাদ হয়, বিচারব্যবস্থা টিকে আছে। প্রবাসেও তার সমর্থন অটুট।

তার নীতিগুলো অনেক সময় একক সিদ্ধান্তে গৃহীত হলেও লক্ষ্য থাকে জাতীয় স্বার্থ। পশ্চিমা গণমাধ্যমের উচিত এ বাস্তবতা বোঝা। সংবেদনশীলতা নয়, প্রেক্ষাপটের আলোয় দেখা।

আসল প্রশ্ন

শেখ হাসিনা কি সমালোচনার ঊর্ধ্বে? মোটেও না। কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়ার সমালোচনা সবসময় কি প্রেক্ষাপটনির্ভর ও ন্যায্য? সেটিও না।

তিনি এক পোস্ট-ঔপনিবেশিক, ধর্মীয় ও ভূরাজনৈতিক চাপে থাকা দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেখানে পরিপূর্ণতা নয়, স্থিতিশীলতা আর সাফল্যই ছিল তার আসল অর্জন।

তাই সমালোচনা যদি হয়, তা হোক ন্যায়ভিত্তিক, তথ্যসমৃদ্ধ এবং প্রেক্ষাপটপূর্ণ। কারণ, এখানে কেবল একজন নেত্রীর বিচার নয়। এখানে প্রশ্ন গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক ন্যায়ের বিশ্বাসযোগ্যতার।

সুত্রঃ দ্য অস্ট্রেলিয়া টুডে

এই শাখার আরও খবর

আগ্নেয়গিরির ছাইয়ে ঢেকে গেছে আকাশ, জাকার্তায় স্থগিত ৩০১ ফ্লাইট

ইন্দোনেশিয়ার আনাক ক্রাকাতাও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে বিপুল পরিমাণ ছাই। এর প্রভাবে রাজধানী জাকার্তার সুকর্ণো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আগ্নেয় ছাইয়ের…

মণিপুরে যৌথ অভিযানে দুই সশস্ত্র সদস্য নিহত, আহত দুই

মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর জেলায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ও আসাম রাইফেলসের যৌথ অভিযানে ইউনাইটেড কুকি ন্যাশনাল আর্মির (ইউকেএনএ) দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। এ সময় আরও দুজন আহত হয়েছেন…

নড়াইলে ৬ শিশুছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগ, মাদরাসাশিক্ষক গ্রেপ্তার

নড়াইল সদর উপজেলায় ছয় শিশুছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে এক মাদরাসাশিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এক ভুক্তভোগী শিশুর মায়ের করা মামলার পর গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকার গাছা থানা থেকে…

দিল্লিতে পাঁচতলা ভবন ধস, পেইং গেস্ট পড়ুয়াদের আটকে পড়ার আশঙ্কা

দিল্লির দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় হঠাৎ ধসে পড়েছে পাঁচতলা একটি আবাসিক ভবন। ধ্বংসস্তূপের নিচে বেশ কয়েকজন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে…

তিন দশক পরও সালমান শাহকে ঘিরে আগ্রহের রহস্য কী?

“আমার জীবনের একটা বড় আফসোসের জায়গা হলো সালমান শাহকে নিজের চোখে দেখতে না পারা। উনি বেঁচে থাকলে অবশ্যই গিয়ে দেখা করতাম। এতটা ভালো লাগে সালমান…

অর্থনৈতিক যুদ্ধ মোকাবিলায় টাস্কফোর্স গঠন করল ইরান

চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ টাস্কফোর্স গঠন করেছে ইরান। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে যুদ্ধের প্রভাব দ্রুত শনাক্ত করে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ…

স্বত্ব © ওটিএন বাংলা - 2026 | গোপনীয়তা নীতিমালা | ব্যবহারের নীতিমালা | সম্পাদকীয় নীতিমালা | Proudly Developed by @SSB it.au