অভিশপ্ত বিস্ফোরণে দিল্লিতে আটজনের মৃত্যু, আহত ডজনখানেক মানুষ। (রয়টার্স)
মেলবোর্ন, ১৬ নভেম্বর: দক্ষিণ এশিয়ার উপমহাদেশে গত সপ্তাহটি ছিল রক্তাক্ত ও অস্থিতিশীলতার চূড়ান্ত উদাহরণ। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সংসদ ভবন থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে বিস্ফোরণের যে ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাই তুলে ধরেনি, বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের নতুন করে উত্থানের ইঙ্গিতও দিয়েছে। একই দিনে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে আদালত চত্বরে আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং ওয়ানায় একটি সামরিক বিদ্যালয়ে জঙ্গিদের হামলা উপমহাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ভারত ও পাকিস্তানের রাজধানী দুটিতে মিলে প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়া গত দশ বছরে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার রেকর্ড স্থাপন করেছে। যদিও হামলার প্রকৃতি কিছু ক্ষেত্রে মিল রয়েছে, দুটি দেশের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইসলামাবাদে বিস্ফোরণের পরপরই পাকিস্তানি সরকার প্রতিবেশী আফগানিস্তান ও ভারতকে দায়ী করে বিবৃতি দেয়, দাবি করে যে এই দুটি দেশ পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিদের আশ্রয় দিচ্ছে বা সহায়তা করছে। দুই দেশই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে, দিল্লিতে বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়া ছিল অস্বাভাবিকভাবে নীরব। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘটনা ঘটার প্রায় দুই দিন পর এটিকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে স্বীকার করেন এবং দায় চাপান কেবল “বিরোধী শক্তি” বা “অ্যান্টি-ন্যাশনাল” গোষ্ঠীর ওপর কারও নাম উল্লেখ ছাড়াই।
এই আচরণ ভারতের সাম্প্রতিক নীতি থেকে একটি নাটকীয় বিচ্যুতি। মাত্র সাত মাস আগে পহেলগামে ২৬ ভারতীয় পর্যটক নিহত হওয়ার ঘটনায় দিল্লি সরাসরি পাকিস্তানকে দায়ী করে এবং পরদিনই পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। তখন মোদি সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল “যেকোনো ভবিষ্যৎ সন্ত্রাসী হামলাকে যুদ্ধের সমতুল্য বলে বিবেচনা করা হবে।”
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। পহেলগাম হামলার সঙ্গে পাকিস্তানি জঙ্গিদের সরাসরি যোগসূত্র ছিল। অথচ দিল্লির সাম্প্রতিক বিস্ফোরণে অভিযুক্তদের বেশিরভাগই ভারতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের, বিশেষ করে কাশ্মীরের। বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টা আগে দিল্লির উপকণ্ঠে একটি বাড়ি থেকে অস্ত্র ও প্রায় ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কাশ্মীরের সাতজন যুবক ও দুজন ডাক্তারও ছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, এদের সঙ্গে জইশ-ই-মোহাম্মদ (JeM)–এর যোগাযোগ থাকতে পারে।
ভারত সরকারের সংকট ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে জোর দিয়ে আসা নিরাপত্তা সাফল্যের বর্ণনা এই ঘটনার মধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ২০১৩ সালের পর প্রথমবার ভারতের রাজধানীতে এত বড় সন্ত্রাসী হামলা ঘটল, যা সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবেও বিব্রতকর। সম্ভবত এ কারণেই সরকার ঘটনাটিকে বড় করে দেখাতে অনিচ্ছুক।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আসামিদের সবাই ভারতীয় নাগরিক। যদিও তদন্তকারীরা পাকিস্তান-ভিত্তিক কিছু গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিচ্ছেন, কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ করেনি। ফলে ভারতের পক্ষে আগের মতো প্রকাশ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর যৌক্তিকতা তৈরি হয়নি।
তবে ভারত সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থাকবে এমন আশা করা ভুল হবে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারত প্রয়োজনে গোপনভাবে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। ১৯৯৯ সালে আইসি-৮১৪ বিমান ছিনতাইয়ের সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের বেশ কয়েকজন গত দুই-তিন বছরে রহস্যজনকভাবে পাকিস্তানের ভেতরে নিহত হয়েছে যা ভারতের গোপন প্রতিশোধ নেওয়ার সক্ষমতার একটি উদাহরণ।
ফলে বলা যায়, দিল্লি এই ঘটনায় জনসমক্ষে উগ্র প্রতিক্রিয়া না দেখালেও, ভারতের নীতিতে চরম নীরবতা মানেই কর্মহীনতা নয়। বরং তারা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে এমন পদ্ধতিতে প্রতিশোধ নিতে পারে, যা প্রকাশ্যে না এলেও লক্ষ্য পূরণ করবে।